সুব্রত বাইনদের গ্রেফতার কি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাবে?
রাজধানীর মগবাজারে চকচকে চাপাতি হাতে দিনে দুপুরে ছিনতাই, মীরপুরে জনাকীর্ণ সড়কে প্রকাশ্যে গুলি করে ব্যবসায়ীর ২২ লাখ টাকা ছিনিয়ে নেয়া, বাড্ডায় বাজারের মধ্যে চা পান রত বিএনপি নেতাকে অংসংখ্য মানুষের সামনে মাথায় গুলি করে হত্যা করে বীর দর্পে খুনির চলে যাওয়া সিনেমার দৃশ্যকেও হার মানায়।
ঘটনা অবশ্য এই তিনটি মাত্র নয়। প্রতিদিন প্রায় প্রতিটি জনপদে মানুষের জীবন আজ অনিরাপদ। অপরাধীদের স্বর্গ রাজ্য হয়ে উঠেছে এই রাজধানী তথা পুরো দেশ। মাঠে পুলিশ আছে, র্যাব আছে, আছে সেনাবাহিনীও। তবুও কেন এমন অবস্থা? গত প্রায় দশ মাসে পরিস্থিতি এমন জায়গায় গেছে যে এখন আইনশৃঙ্খলার কোন খারাপ খবরেই মানুষ বিস্মিত হয়না। সবকিছু স্বাভাবিক বলেই ধরে নেয়া হচ্ছে। খুন, জখম, হামলা, ছিনতাই, দখল, চাঁদাবাজিসহ এমন কোন অপরাধ নেই যা হচ্ছে না।
বলা হচ্ছে পুলিশ নাকি কাজ করছে না। কথাটি অতি সরলীকরণ। কিন্তু তবু বলতে হবে যে অভিযোগটি চিন্তায় ফেলবার মতো। এত গুরুতর পরিস্থিতিতেও যদি পুলিশ 'কাজ না করে',তবে যে আইনশৃঙ্খলার আরও দ্রুত অবনতি হবে,সেটাই স্বাভাবিক। বিষয়টি নিয়ে গভীর কোন ভাবনা বা উদ্যোগ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দিক থেকে দৃশ্যমান নয়। তিনি অবশ্য কথা বলেন,হুমকি ধামকি দেন। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়না। কয়দিন আগে বললেন আর মব চলতে দেয়া হবে না। তার মানে কি - এতদিন চলতে দেয়া হয়েছিল? বলা বাহুল্য, তার এই হুমকির পরেও সারাদেশে মব উল্লাস দেখা যাচ্ছে।
পুলিশের কাজ করতে না পারার বড় কারণ তাদের নৈতিক মনোবল ভেঙ্গে পড়েছিল জুলাই অভ্যুত্থানের সময়। হাসিনা সরকারের পেটোয়া বাহিনী হিসেবে সারাদেশের পুলিশের উপর হামলা, থানায় থানায় আগুন, অস্ত্র লুটের কারণে পরিবর্তনের পর সময় লেগেছে তাদের স্বাভাবিক হতে। কিন্তু এক বছর হতে চলল,অথচ পরিস্থিতি বদলানো না – এটাই জন-আক্ষেপের কারণ। একটি বড় কারণ মব সংস্কৃতি। আন্দোলনের কর্মী পরিচয় দিয়ে ছাত্র নামে,রাজনৈতিক কর্মীঅ পরিচয়ে মানুষকে পথে ঘাটে আক্রমণ করছে,ধরে পুলিশের কাছে দিয়ে আসছে। এভাবে আইন বিরুদ্ধ কাজ নিয়ে প্রশ্ন তুরলে এসব তরুণ ও রাজনৈতিক কর্মী পুলিশের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হচ্ছে।
তবে কি এই প্রশ্ন উঠে না যে অভ্যুত্থানের কর্মীদের অনেকে এখনও অকারণ জেদ করছে,আইন নিজের হাত তুলে নিচ্ছে,পুলিশের কাজে বাধা দিচ্ছে?
এর বাইরে আরেকটি বড় কারণ রাজধানী সহ সারাদেশে আবার সক্রিয় হয়েছে শীর্ষ সন্ত্রাসীরা। অপরাধ জগতের নিয়ন্ত্রণ নিতে তারা নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষে জড়াচ্ছে। কোথাও কোথাও রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের সাথে আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ে নেমেছে।
এর মধ্যেই সেনাবাহিনী গ্রেফতার করেছে সুব্রত বাইন,মোল্লা মাসুদ সহ তিন জন শীর্ষ সন্ত্রাসীকে। এটি একটি বড় সাফল্য। সেনাবাহিনী সহ পুলিশ, র্যাব জানে কারা ঢাকা শহরে চাঁদাবাজি,সন্ত্রাস,মব সহিংসতা,টেন্ডারবাজি,অপহরণ এবং খুনের ঘটনা ঘটাচ্ছে। গত প্রায় ১০ মাসে যে সর্বনাশ হয়েছে এখন তার রাশ টেনে ধরার সময়।
ঢাকা এখন আতংকের নগরী। কবে শান্তি ফিরবে? উন্নতি হবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির? এমন নানা প্রশ্নই ঘুরছে মানুষের মনে। প্রায় প্রতি দিনই কোনও না কোনও ঘটনায় উত্তাল হচ্ছে দেশ। এমন এক সময়ে সেনাবাহিনীর এই সাফল্য কিছুটা হলেও স্বস্তি আনবে বলে ধরে নেয়া হচ্ছে। সেনাবাহিণি, পুলিশ র্যাবকে সচেতন থাকতে হবে। কিন্তু যে রাজনৈতিক কর্মীরা নিজেরাই বিচার করে ফেলছেন, তাদের সচেতন হতে হবে বেশি। কারণ ঝুঁকি যেখানে বিরাট,সেখানে সামান্য গাফিলতি বা আলস্য বা অক্ষমতারও সুযোগ নেই।
Comments