মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লিনিকাল ট্রায়ালে প্রাপ্ত ফলাফল উন্মোচন
২২ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুড টেকনোলজি অ্যান্ড নিউট্রিশনাল সায়েন্স বিভাগের উদ্যোগে, সেন্টার ফর অ্যাডভান্স রিসার্স ইন সায়েন্সেস, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেমিনার কক্ষে 'ইফেক্ট অব কারকুমা বায়োকমফোর্ট (এ ফর্মূলেটেড প্রোবায়টিক ফুড প্রোডাক্ট) অন গাট হেলথ' শীর্ষক ক্লিনিকাল ট্রায়ালে প্রাপ্ত ফলাফল উন্মোচনের আয়োজন করা হয়। উক্ত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, অধ্যাপক ড. হোসাইন উদ্দিন শেখর, সভাপতি মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, অধ্যাপক ড. মোঃ আনোয়ারুল আজীম আখন্দ। এছাড়াও অনুষ্ঠানটিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, উচ্চতর বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্র (ঢাবি), বিসিএসআইআর, বিএসটিআই, বাংলাদেশ ইনিস্টিটিউশন অব ফুড প্রোফেশনালসসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্ট বিষয়ের অধ্যাপক, গবেষক, চিকিৎসক এবং সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন ।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত বিজ্ঞানীরা প্রোবায়োটিকের ইতিহাস, খাদ্য হিসেবে এর ব্যবহার, মানবস্বাস্থ্যে উপকারিতা, বাণিজ্যিক কার্যক্রমের ক্ষেত্রে দেশে এবং বহির্বিশ্বে এর আইনি ভিত্তি ইত্যাদি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন । প্রধান অতিথি অধ্যাপক হোসাইন উল্লেখ করেন যে জাপান, ইউএসএ, ইউরোপসহ সারাবিশ্বই এখন এ ধরনের বিশেষ খাদ্যের মাধ্যমে কিভাবে সুস্থ থাকা যায়, বিভিন্ন ক্রনিক স্বাস্থ্য সমস্যার ঝুঁকি কমানো যায় তা নিয়ে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। বিশিষ্ট পুষ্টি বিজ্ঞানী ডঃ জেবা মাহমুদ শিশুদের পেটের সমস্যায় প্রয়োবায়োটিক যে অনন্য সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে তা চমৎকার ভাবে তুলে ধরেন। অনুষ্ঠানের সভাপতি মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়য়ের উপাচার্য অধ্যাপক মোঃ আনোয়ারুল আজীম আখন্দ তাঁর দিক নির্দেশনা বক্তব্যে তুলে ধরেন যে, উন্নত দেশের মত আমাদের দেশেও এ জাতীয় স্বাস্থ্য সহায়ক খাদ্য নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্প কারখানার যৌথ উদ্যোগে গবেষণা, ফর্মূলেশন ও প্রক্রিয়াকরণে এগিয়ে আসা প্রয়োজন ।
অর্গানিক নিউট্রিশন লিমিটেড এর নির্বাহী পরিচালক, অরুন কুমার মন্ডল, গবেষণার পটভূমি আলোচনা করতে গিয়ে বলেন, বর্তমান কর্মব্যস্ত জীবনধারা, অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস, অতিরিক্ত ভাজাপোড়া খাবার গ্রহণ, ক্রমবর্ধমান মানসিক চাপ আমাদের অন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রমকে ব্যহত করছে। এর ফলশ্রুতিতে অ্যাসিডিটি, বদহজম, পেট ফাঁপা, গ্যাস ও কোষ্ঠকাঠিন্যের মতো সমস্যা এখন প্রায় প্রতিটি পরিবারেই সাধারণ চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর থেকে ভালো থাকতে মানুষ দিনের পর দিন বিভিন্ন ধরনের সিনথেটিক মেডিসিন ব্যবহার করে যাচ্ছেন এবং পর্যায়ক্রমে এর মাত্রাও বাড়াতে বাধ্য হচ্ছেন। এরই মধ্যে ২০১৯ সালে আমেরিকার ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব হেলথের বায়োমেডিক্যাল ও লাইফ সায়েন্সের জার্নালে প্রকাশ পায় গ্যাস্ট্রিকের এ ধরনের ঔষধ বিশেষ করে প্রোটন পাম্প ইনহিবিটর দীর্ঘ মেয়াদী সেবনের ফলে গ্যাস্ট্রিক ক্যন্সারের ঝুঁকি বাড়ে; পরবর্তীতে ২০২২ সালে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল বিশিষ্ট অধ্যাপক, চিকিৎসক উক্ত ঝুঁকির বিষয়টি সংবাদ সম্মেলন করে জনগণকে জানান। এই প্রেক্ষাপটে অর্গানিক নিউট্রিশন লিমিটেড বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত নিরাপদ ও কার্যকর বিশেষ কোন খাদ্য বা খাদ্য উপকরনের মাধ্যমে উক্ত সমস্যায় সামান্য হলেও কোন ভূমিকা রাখা যায় কিনা তা নিয়ে মনোযোগী হয়। এর ফলশ্রুতিতে জাপান আবিষ্কৃত এই তাপসহিষ্ণু প্রোবায়োটিক ব্যাসিলাস কোয়াগুল্যান্স সাঙ্ক ৭০২৫৮ নিয়ে অগ্রসর হয় এবং এটি এ অঞ্চলের মানুষদের জন্য কতটা কার্যকর তা নিয়ে মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীদের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে একটি ক্লিনিকাল ট্রায়াল সম্পাদনের উদ্যোগ নেয়।
এই ক্লিনিকাল ট্রায়ালের প্রধান গবেষক মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুড টেকনোলজি অ্যান্ড নিউট্রিশনাল সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. এ কে ওবায়দুল হক গবেষণাটির বিস্তারিত বলতে গিয়ে জানান, কারকুমা বায়োকমফোর্ট পণ্যটি প্রোবায়োটিক ব্যাসিলাস কোয়াগুল্যান্স এবং প্রিবায়োটিক ফূক্টো-অলিগোস্যাকারাইড এর সমন্বয়ে তৈরি। এখানে ব্যবহৃত প্রোবায়োটিকটি জাপানের টোকিও বিশবিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপকের আবিষ্কৃত, যা পাকস্থলির গ্যাস্ট্রিক অ্যাসিড বা pH ১.২ দ্বারা প্রভাবিত না হয়ে পেটের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সহায়ক হয় এবং উচ্চতাপমাত্রায়ও টিকে থাকতে পারে বলে তাঁদের গবেষণায় প্রমাণিত। এটি খাদ্য হিসেবে বা খাদ্য পণ্যে ব্যবহারের জন্য ইউএসএফডিএ কর্তৃক ২০১৬ সালে নিরাপদ হিসেবে স্বীকৃত হয়েছে।
তিনি উল্লেখ করেন, ক্লিনিকাল ট্রায়ালটিতে এমন ব্যক্তিদের নেয়া হয় যারা প্রতিনিয়ত GERD, IBS জনিত পেটের বিভিন্ন সমস্যা যেমন এসিডিটি, হার্টবার্ন, পেট ফাঁপা, বদহজম, কোষ্ঠকাঠিন্য, ডায়রিয়া ইত্যাদিতে ভুগছিলেন । তাদেরকে সকালে ও রাতে একটি করে ক্যাপসুল খাবার জন্য নির্দেশনা দেয়া হয় এবং তথ্য নিয়মিতভাবে সংগ্রহ করা হয় ।
গবেষণা থেকে প্রাপ্ত ফলাফল হিসেবে পাওয়া যায়, কারকুমা বায়োকমফোর্ট উল্লেখযোগ্যভাবে এসিডিটি, হার্টবার্ন, পেট ফাঁপা, বধহজম, কোষ্ঠকাঠিন্য, ডায়রিয়া ইত্যাদি সমস্যার তীব্রতা হ্রাস করার পাশাপাশি উপসর্গ দেখা দেওয়ার প্রবনতাও অনেকাংশে কমিয়ে আনে।
তিনি উল্লেখ করেন যে, বাংলাদেশের গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইএফএসটি এবং মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের এফটিএনএস বিভাগের গবেষণায় কারকুমা বায়োকমফোর্টের খাদ্য নিরাপত্তা পরীক্ষায় কোন ভারী ধাতু সিসা, আর্সেনিক, ক্রোমিয়াম, ক্যাডমিয়াম কিংবা আফলাটক্সিন বা অন্য রোগ সৃষ্টিকারী জীবানুর উপস্থিতি পাওয়া যায়নি । যার ফলে কারকুমা বায়োকমফোর্টকে নিরাপদ বলছেন গবেষকেরা। গবেষণায় ব্যবহৃত বিশেষ প্রোবায়টিক খাদ্য পন্যটি অর্গানিক নিউট্রিশন লিমিটেডের কারখানায় উৎপাদন করা হয়েছে, যেটি জিএমপি, ইউএসডিএ অর্গানিক, আইএসও সার্টিফাইড এবং ইউএসএফডিএ রেজিস্টার্ড ।
উপসংহারে গবেষকেরা মত প্রকাশ করেন যে, সামগ্রিকভাবে গবেষণার ফলাফল থেকে প্রতীয়মান হয় কারকুমা বায়োকমফোর্ট একটি নিরাপদ ও কার্যকর প্রোবায়োটিক খাদ্য পণ্য, যা গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল সমস্যার উন্নতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম।
Comments