অ্যালার্ম নয়, সকালের ঘুম ভাঙতে কাজে লাগান ‘বডি ক্লক’
প্রতিদিন সকালে অ্যালার্মের শব্দে ঘুম ভাঙার পরও অনেকের চোখ খুলতে চায় না। একের পর এক 'স্নুজ' বাটন চাপতে গিয়ে বিছানায় কাটে আরও কিছু সময়। এতে ঘুমের ঘাটতি তো পূরণ হয়ই না, বরং দিনের শুরুতেই দেখা দিতে পারে ক্লান্তি ও বিরক্তি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সকালে সতেজভাবে ঘুম থেকে ওঠার বিষয়টি শুধু কত ঘণ্টা ঘুমানো হচ্ছে, তার ওপর নির্ভর করে না। কখন ঘুমাতে যাওয়া হচ্ছে, কখন ঘুম থেকে ওঠা হচ্ছে এবং প্রতিদিনের ঘুমের রুটিন কতটা নিয়মিত এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।
শরীরের নিজস্ব একটি জৈবিক ঘড়ি রয়েছে, যাকে বলা হয় 'বডি ক্লক'। নিয়মিত জীবনযাপনের মাধ্যমে এই ঘড়ির সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে উঠতে পারলে একসময় অ্যালার্ম ছাড়াও নির্দিষ্ট সময়ে ঘুম ভাঙার অভ্যাস তৈরি হতে পারে।
শরীরের বডি ক্লক কীভাবে কাজ করে?
মানুষের শরীরে প্রায় ২৪ ঘণ্টার একটি স্বাভাবিক জৈবিক ছন্দ রয়েছে। এই ছন্দ ঘুম ও জাগরণ, শরীরের তাপমাত্রা এবং বিভিন্ন হরমোনের কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পর্কিত।
প্রতিদিন একই সময়ের কাছাকাছি ঘুমাতে যাওয়া এবং ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস তৈরি করলে শরীর ধীরে ধীরে সেই সময়সূচির সঙ্গে মানিয়ে নিতে শুরু করে।
পর্যাপ্ত ঘুম সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
অ্যালার্ম ছাড়া ঘুম থেকে ওঠার জন্য প্রথম শর্তই হলো পর্যাপ্ত ঘুম। সাধারণভাবে একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রতি রাতে প্রায় ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন হতে পারে। তবে বয়স, শারীরিক অবস্থা ও ব্যক্তিগত প্রয়োজন অনুযায়ী ঘুমের সময় কিছুটা কমবেশি হতে পারে। তাই রাতে দেরি করে ঘুমিয়ে সকালে অ্যালার্ম বন্ধ করে দিলে শরীর স্বাভাবিকভাবে জেগে উঠবে এমনটা আশা করা ঠিক নয়।
সকালে আলোতে থাকুন
বডি ক্লকের ছন্দ ঠিক রাখতে দিনের আলোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর যত দ্রুত সম্ভব প্রাকৃতিক আলোতে কিছু সময় কাটানো শরীরকে দিন শুরুর সংকেত দিতে সাহায্য করে। এ জন্য ঘুম থেকে উঠে জানালার পর্দা খুলে দেওয়া, জানালার পাশে কিছুক্ষণ থাকা কিংবা বাইরে অল্প সময় হাঁটাহাঁটি করা যেতে পারে।
রাতে উজ্জ্বল আলো ও স্ক্রিন কমান
ঘুমানোর আগে অতিরিক্ত উজ্জ্বল আলো এবং দীর্ঘ সময় মোবাইল বা অন্যান্য স্ক্রিন ব্যবহার ঘুমের স্বাভাবিক প্রস্তুতিতে বাধা দিতে পারে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দীর্ঘ সময় স্ক্রল করা বা একের পর এক নোটিফিকেশন দেখা মস্তিষ্ককে সক্রিয় রাখে। তাই ঘুমাতে যাওয়ার আগে কিছুটা সময় মোবাইল ফোন থেকে দূরে থাকা, অপ্রয়োজনীয় নোটিফিকেশন বন্ধ রাখা এবং ঘরের আলো কমিয়ে আনার অভ্যাস ঘুমের জন্য সহায়ক হতে পারে।
ছুটির দিনেও রুটিন ঠিক রাখুন
অনেকেই কর্মদিবসে কম ঘুমিয়ে ছুটির দিনে দীর্ঘ সময় ঘুমান। এতে সপ্তাহজুড়ে ঘুম ও জাগরণের সময়ের বড় ধরনের পরিবর্তন হতে পারে, যা শরীরের স্বাভাবিক ছন্দে প্রভাব ফেলতে পারে। অ্যালার্মের ওপর নির্ভরতা কমাতে চাইলে সপ্তাহের প্রতিটি দিন কাছাকাছি সময়ে ঘুমানো এবং ঘুম থেকে ওঠার চেষ্টা করা ভালো।
খাবার ও ক্যাফেইনের সময়ও গুরুত্বপূর্ণ
রাতে ঘুমানোর একেবারে কাছাকাছি সময়ে ভারী খাবার খাওয়ার অভ্যাস ঘুমে অস্বস্তি তৈরি করতে পারে। একইভাবে বিকেল বা সন্ধ্যার পর অতিরিক্ত চা, কফি কিংবা অন্যান্য ক্যাফেইনযুক্ত পানীয় গ্রহণ ঘুম আসতে দেরি করাতে পারে। তাই রাতে হালকা খাবার খাওয়া এবং দিনের শেষভাগে ক্যাফেইন গ্রহণের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করা ঘুমের রুটিন ঠিক রাখতে সহায়ক হতে পারে।
একদিনে পরিবর্তন হবে না
শরীরের ঘুম ও জাগরণের অভ্যাস পরিবর্তন করতে সময় লাগে। নিয়মিত একই সময়ে ঘুমানো ও ওঠার অভ্যাস কয়েক দিন বা তারও বেশি সময় ধরে চালিয়ে গেলে শরীর ধীরে ধীরে নতুন সময়সূচির সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে। তাই অ্যালার্ম বাদ দেওয়ার আগে পর্যাপ্ত ঘুম এবং নিয়মিত রুটিন নিশ্চিত করা জরুরি।
তবে পর্যাপ্ত সময় ঘুমানোর পরও যদি নিয়মিতভাবে অতিরিক্ত নাক ডাকা, রাতে বারবার ঘুম ভেঙে যাওয়া কিংবা দিনের বেলায় অস্বাভাবিক ঘুম ঘুম ভাব থাকে, তাহলে বিষয়টি অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
Comments