বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটে ফ্রিজে খাবার সংরক্ষণেও প্রয়োজন বাড়তি সতর্কতা
গরমের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দেশে বেড়েছে বিদ্যুতের চাহিদা। এর সঙ্গে গ্যাস ও এলএনজি সরবরাহের সংকটে ব্যাহত হচ্ছে বিদ্যুৎ উৎপাদন। ফলে দেশের বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘ সময় ধরে লোডশেডিংয়ের মুখে পড়ছেন মানুষ। কোথাও কোথাও দিনে কয়েক ঘণ্টা, আবার কোনো কোনো এলাকায় আরও বেশি সময় বিদ্যুৎ থাকছে না।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার একটি বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে ঘরের ফ্রিজ। কারণ বিদ্যুৎ চলে গেলে শুধু আলো বা ফ্যানই বন্ধ হয় না, ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে ফ্রিজের ভেতরের তাপমাত্রাও। ফলে নষ্ট হতে পারে মাছ, মাংস, দুধ, ডিম, রান্না করা খাবারসহ নানা ধরনের দ্রুত পচনশীল খাদ্য।
এখন প্রশ্ন হলো, বিদ্যুৎ না থাকলে ফ্রিজে খাবার আসলে কতক্ষণ নিরাপদ থাকে?
সাধারণ ফ্রিজে সর্বোচ্চ প্রায় ৪ ঘণ্টা
যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য নিরাপত্তা ও পরিদর্শন সংস্থা ইউএসডি-এর নির্দেশনা অনুযায়ী, দরজা বন্ধ রাখা হলে একটি সাধারণ রেফ্রিজারেটর বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পর প্রায় ৪ ঘণ্টা পর্যন্ত খাবার নিরাপদ তাপমাত্রায় রাখতে পারে। তবে এই সময়ের মধ্যে বারবার ফ্রিজের দরজা খোলা হলে ভেতরের ঠান্ডা দ্রুত বেরিয়ে যায় এবং খাবার আরও দ্রুত উষ্ণ হয়ে উঠতে পারে।
তাই লোডশেডিং শুরু হলে সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো, অপ্রয়োজনে ফ্রিজের দরজা না খোলা। বিশেষ করে বিদ্যুৎ কখন আসবে, তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত ফ্রিজের দরজা একদমই খোলা যাবে না।
ফ্রিজার তুলনামূলকভাবে বেশি সময় ঠান্ডা থাকে
রেফ্রিজারেটরের তুলনায় ফ্রিজারের ভেতরের খাবার বেশি সময় নিরাপদ থাকতে পারে। দরজা বন্ধ রাখা হলে একটি পূর্ণ ফ্রিজার প্রায় ৪৮ ঘণ্টা এবং অর্ধেক ভর্তি ফ্রিজার প্রায় ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত ঠান্ডা থাকতে পারে বলে ইউএসডি জানিয়েছে।
তবে এটি নির্দিষ্ট কোনো নিশ্চয়তা নয়। ফ্রিজারের আকার, খাবারের পরিমাণ, বাইরের তাপমাত্রা, কতবার দরজা খোলা হচ্ছে এবং বিদ্যুৎ যাওয়ার আগে ভেতরের তাপমাত্রা সবকিছুর ওপর সময়টি নির্ভর করে।
গন্ধ ঠিক থাকলেই কি খাবার নিরাপদ?
এখানেই সবচেয়ে বড় ভুল করেন অনেকে। অনেক সময় নষ্ট খাবারের গন্ধ বা চেহারায় তাৎক্ষণিক পরিবর্তন দেখা যায় না। তাই শুধু খাবারের গন্ধ, রং বা স্বাদ দেখে নিরাপদ কি না সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়। ইউএসডি স্পষ্টভাবে খাবারের নিরাপত্তা যাচাই করতে স্বাদ নিয়ে দেখতেও নিষেধ করেছে। অর্থাৎ, 'গন্ধ তো ঠিকই আছে' এমন যুক্তিতে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎহীন থাকা খাবার খাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
বিদ্যুৎ আসা-যাওয়ার মধ্যে কী করবেন?
বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে অনেক বাড়িতেই একটানা কয়েক ঘণ্টার বদলে বারবার বিদ্যুৎ আসা-যাওয়া করছে। এমন পরিস্থিতিতে কিছু অভ্যাস খাবার নিরাপদ রাখতে সাহায্য করতে পারে।
প্রথমত, ফ্রিজের দরজা যতটা সম্ভব বন্ধ রাখুন। বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পর ফ্রিজ খুলে খাবার দেখা বা ঠান্ডা আছে কি না পরীক্ষা করা থেকে বিরত থাকুন।
দ্বিতীয়ত, ফ্রিজার অতিরিক্ত খালি রাখবেন না। ফ্রিজারে খাবার পরস্পরের কাছাকাছি থাকলে ঠান্ডা ধরে রাখতে সুবিধা হয়। খালি জায়গায় আগে থেকে জমিয়ে রাখা পানির বোতল বা আইস প্যাক রাখা যেতে পারে।
তৃতীয়ত, দীর্ঘ লোডশেডিংয়ের আশঙ্কা থাকলে কুলার ও বরফ প্রস্তুত রাখুন। ৪ ঘণ্টার বেশি বিদ্যুৎ না থাকলে বরফ বা ফ্রোজেন জেল প্যাকসহ ইনসুলেটেড কুলারে পচনশীল খাবার রাখা যেতে পারে। তবে খাবারকে নিরাপদ রাখতে কুলারের তাপমাত্রা প্রায় ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার নিচে রাখা জরুরি।
রান্নার ক্ষেত্রেও চাই পরিকল্পনা
লোডশেডিংয়ের পাশাপাশি গ্যাসের চাপ কম থাকলে রান্না করাও অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। তাই এমন পরিস্থিতিতে একসঙ্গে অনেক খাবার রান্না করে দীর্ঘ সময় ফ্রিজে রাখার বদলে প্রয়োজন অনুযায়ী অল্প অল্প করে রান্না করা তুলনামূলকভাবে নিরাপদ।
যেসব খাবার সহজে সংরক্ষণ করা যায় না, সেগুলো আগে রান্না করে দীর্ঘ সময় রেখে না দিয়ে যত দ্রুত সম্ভব খেয়ে ফেলা ভালো। পাশাপাশি যেসব খাবার ফ্রিজ ছাড়া তুলনামূলকভাবে নিরাপদে রাখা যায় যেমন শুকনো খাবার, কিছু প্যাকেটজাত বা ক্যানজাত খাবার সেগুলোর মজুত রাখা যেতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি নিয়ম
লোডশেডিংয়ের এই সময়ে ফ্রিজের খাবার নিয়ে কয়েকটি বিষয় মনে রাখা জরুরি-
৪ ঘণ্টা- দরজা না খুললে সাধারণ ফ্রিজে খাবার প্রায় ৪ ঘণ্টা পর্যন্ত নিরাপদ থাকতে পারে।
২৪ ঘণ্টা- অর্ধেক ভর্তি ফ্রিজার প্রায় ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত ঠান্ডা রাখতে পারে।
৪৮ ঘণ্টা- পূর্ণ ফ্রিজার দরজা বন্ধ থাকলে প্রায় ৪৮ ঘণ্টা পর্যন্ত ঠান্ডা থাকতে পারে।
৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস-রেফ্রিজারেটরের নিরাপদ তাপমাত্রা ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার নিচে রাখা উচিত।
দরজা বন্ধ-লোডশেডিংয়ের সময় সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ হলো ফ্রিজের দরজা বন্ধ রাখা।
সন্দেহ হলে ফেলে দিন-খাবার নিরাপদ কি না নিশ্চিত না হলে ঝুঁকি না নেওয়াই ভালো।
লোডশেডিং এখন শুধু ভোগান্তির বিষয় নয়, এটি ঘরের খাবারের নিরাপত্তার সঙ্গেও জড়িত। বিশেষ করে গরমের সময়ে দীর্ঘ বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতায় ফ্রিজের ভেতরের তাপমাত্রা দ্রুত বাড়তে পারে। তাই বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ফ্রিজের দরজা বন্ধ রাখা, ফ্রিজারে খাবার গুছিয়ে রাখা, প্রয়োজনে বরফ বা কুলারের ব্যবস্থা করা এবং দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকলে পচনশীল খাবার নিয়ে ঝুঁকি না নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
গ্যাসের সংকট সরাসরি ফ্রিজের ভেতরের খাবার নষ্ট করে না। কিন্তু গ্যাস সংকট থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হলে এবং তার ফলে লোডশেডিং বাড়লে খাবার সংরক্ষণের ঝুঁকি বেড়ে যায়।
সাম্প্রতিক সময়ে গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে চাপ তৈরি হয়েছে এবং বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতার খবর পাওয়া যাচ্ছে। ফলে এখন শুধু 'বিদ্যুৎ কখন যাবে' নয়, 'কতক্ষণ থাকবে না' এই বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
Comments