মাল্টিটাস্কিং: স্মার্ট অভ্যাস নয়, মস্তিষ্কের ওপর চাপ
প্রথমেই একটি প্রচলিত ভুল ধারণা ভাঙা দরকার—আমাদের মস্তিষ্ক কোনো সুপারকম্পিউটার নয়, যে একসঙ্গে সমান্তরালে একাধিক কাজ করতে পারে। বাস্তবে আমরা মাল্টিটাস্কিং করি না, করি টাস্ক-সুইচিং। নেচার নিউরোসায়েন্সে প্রকাশিত গবেষণায় দেখা গেছে, একাধিক কাজ সামলানোর সময় মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট কিছু অংশ সক্রিয় হয়, বিশেষ করে প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স, যাকে মস্তিষ্কের "সিইও" বলা যায়। আপনি যখন ই-মেইল লেখা বাদ দিয়ে গান শোনেন, তখন এই অংশই নির্দেশ দেয় এক কাজ বন্ধ করে অন্য কাজে মনোযোগ দিতে। কিন্তু এই কাজ বদলানোর মাঝখানে তৈরি হয় মানসিক চাপ, অনেকটা যানজটের মতো। এতে শক্তি বেশি খরচ হয়, কাজের গতি কমে যায় এবং ভুলের ঝুঁকি বাড়ে।
তাহলে প্রশ্ন আসে, আমরা গাড়ি চালাতে চালাতে কথা বলি কীভাবে? এখানে কাজ করে ওয়ার্কিং মেমোরি, যা কম্পিউটারের র্যামের মতো সাময়িকভাবে তথ্য ধরে রাখে। টাস্ক-সুইচিংয়ের সময় মস্তিষ্ককে আগের কাজের নিয়ম সরিয়ে নতুন কাজের নিয়ম বসাতে হয়। যেমন অঙ্ক করতে করতে হঠাৎ বাজারের হিসাব ধরলে, অঙ্কের সূত্র সরিয়ে নতুন তথ্য বসাতে হয়। এই লোড-আনলোড প্রক্রিয়াই আমাদের দ্রুত ক্লান্ত করে। যাঁদের ওয়ার্কিং মেমোরি শক্তিশালী, তাঁরা তুলনামূলক ভালোভাবে কাজ বদলাতে পারেন; দুর্বল হলে মনোযোগ সহজেই ছুটে যায়।
আমাদের মনোযোগ অনেকটা স্পটলাইটের মতো, যা এক সময়ে এক জায়গায় পড়ে। গবেষণায় দেখা গেছে, মনোযোগ সবসময় বাইরের জগৎ ও ভেতরের চিন্তার মধ্যে আসা-যাওয়া করে। যেমন ক্লাসে লেকচার শুনতে শুনতে দুপুরে কী খাবেন তা ভাবা—এটাই মনোযোগের শিফটিং। এই নিয়ন্ত্রণকে বলা হয় কগনিটিভ কন্ট্রোল। যাঁরা এই নিয়ন্ত্রণ ভালোভাবে করতে পারেন, তাঁরা বেশি ফোকাসড থাকতে সক্ষম হন।
সমাধানও রয়েছে। বিজ্ঞানীরা ডুয়াল এন-ব্যাক নামে একটি মগজ-ব্যায়াম নিয়ে গবেষণা করেছেন, যা মনোযোগ ও ওয়ার্কিং মেমোরি বাড়াতে সাহায্য করে। এটি এমন এক ধরনের অনুশীলন, যেখানে একই সঙ্গে শব্দ ও অবস্থান মনে রাখতে হয়—অর্থাৎ অডিও ও ভিজ্যুয়াল তথ্য একসঙ্গে ধরে রাখতে হয়। নিয়মিত অনুশীলনে মনোযোগের গভীরতা বাড়ে, ওয়ার্কিং মেমোরি শক্তিশালী হয় এবং মানসিক সহনশীলতা বৃদ্ধি পায়।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যে মনোযোগ কমে যাওয়া বা ভুলে যাওয়ার প্রবণতা দেখা যায়, তাকে বলা হয় কগনিটিভ ডিক্লাইন। গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, এ ধরনের মেমোরি ট্রেইনিং প্রবীণদের বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা ধরে রাখতে সাহায্য করতে পারে, এমনকি নতুন নিউরাল পাথওয়ে তৈরি করে মস্তিষ্ককে সক্রিয় রাখে। তাই "মাল্টিটাস্কিং" শব্দটি যতই আকর্ষণীয় শোনাক না কেন, বাস্তবে এটি মস্তিষ্কের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করে। বুদ্ধিমানের কাজ হলো একসঙ্গে অনেক কিছু না করে এক সময়ে একটি কাজে পূর্ণ মনোযোগ দেওয়া
Comments