শিশু নিরাপত্তায় মেটার বড় সমঝোতা, দিতে হবে ১,৮০০ কোটি ডলার
শিশু ও কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের নিরাপত্তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে চলমান একটি মামলায় বড় ধরনের সমঝোতায় পৌঁছেছে ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের মালিক প্রতিষ্ঠান মেটা।
সমঝোতা অনুযায়ী, আগামী ১০ বছরে প্রতিষ্ঠানটিকে মোট ১ হাজার ৮০০ কোটি ডলার পরিশোধ করতে হবে। পাশাপাশি শিশু-কিশোরদের জন্য প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারে বেশ কিছু নতুন বিধিনিষেধ চালু করতে হবে।
বুধবার (২৬ আগস্ট) মেটা এবং যুক্তরাষ্ট্রের ৫২ জন অ্যাটর্নি জেনারেলের একটি জোটের মধ্যে এ সমঝোতা হয়। তবে সমঝোতায় পৌঁছালেও মেটা কোনো আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ স্বীকার করেনি।
বড় অঙ্কের অর্থের কথা বলা হলেও একসঙ্গে পুরো অর্থ পরিশোধ করতে হবে না মেটাকে। ১০ বছর ধরে ধাপে ধাপে অর্থ দেওয়ার ব্যবস্থা থাকায় তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিষ্ঠানের ওপর বড় আর্থিক চাপ পড়ার সম্ভাবনা কম। ২০২৫ সালে মেটার মোট আয় ২০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি ছিল।
তবে সমঝোতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে দেখা হচ্ছে শিশু ও কিশোরদের জন্য প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারে নতুন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, শিশুদের অ্যাপ ব্যবহারের ক্ষেত্রে দৈনিক সর্বোচ্চ দুই ঘণ্টা সময়সীমা নির্ধারণ করা হবে। পাশাপাশি প্রতি ১৫ মিনিট পর ব্যবহারকারীদের বিরতি নেওয়ার কথা মনে করিয়ে দেওয়া হবে।
কোনো অ্যাকাউন্ট অপ্রাপ্তবয়স্ক ব্যবহারকারীর বলে শনাক্ত হলে রাত ১২টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত সেটি ডিফল্টভাবে বন্ধ রাখার ব্যবস্থা থাকবে। স্কুলের সময় অর্থাৎ সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত বিজ্ঞপ্তিও বন্ধ রাখা হবে।
কিশোরদের পোস্টে লাইকসংক্রান্ত দৃশ্যমানতাতেও পরিবর্তন আসবে। নতুন ব্যবস্থায় নিজের বা অন্যের পোস্টে কতটি লাইক পড়েছে, তা ডিফল্টভাবে দেখা যাবে না।
তবে এসব ব্যবস্থা কার্যকর করার ক্ষেত্রে বয়স শনাক্তকরণ প্রযুক্তি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। ব্যবহারকারী শিশু নাকি প্রাপ্তবয়স্ক, তা নির্ভুলভাবে নির্ধারণ করতে মেটাকে বিভিন্ন প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করতে হবে।
বর্তমানে বয়স যাচাইয়ে মুখের ছবি বিশ্লেষণ, সরকারি পরিচয়পত্র যাচাই এবং ব্যবহারকারীর অনলাইন আচরণ বিশ্লেষণের মতো পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। কিন্তু প্রতিটিরই সীমাবদ্ধতা রয়েছে। আচরণ বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে ভুলভাবে কোনো প্রাপ্তবয়স্ককে শিশু বা শিশুকে প্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে শনাক্ত করার আশঙ্কা রয়েছে।
সিরাকিউজ বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগবিষয়ক অধ্যাপক অ্যালেক্সিস ইংবারের মতে, শিশুদের সুরক্ষার পাশাপাশি তাদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বয়স যাচাইয়ের বর্তমান প্রযুক্তি এখনো পুরোপুরি নির্ভুল হয়ে ওঠেনি।
অন্যদিকে আইনজীবী ফিলিপ ইয়ানেলার মতে, গত কয়েক বছরে বয়স যাচাই প্রযুক্তির যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে। ব্যক্তিগত তথ্য স্থায়ীভাবে সংরক্ষণ না করেও বয়স যাচাইয়ের ব্যবস্থা তৈরি করা সম্ভব হতে পারে।
এ ধরনের ব্যবস্থায় ব্যবহারকারীর বয়স যাচাই করে একটি সংকেত তৈরি করা যেতে পারে। পরবর্তী সময়ে সেই সংকেতের মাধ্যমে ব্যবহারকারী নির্দিষ্ট বয়সসীমার নিচে কি না, তা শনাক্ত করা সম্ভব হবে। এতে ব্যক্তিগত পরিচয়সংক্রান্ত মূল তথ্য সংরক্ষণের প্রয়োজন কমতে পারে।
তবে বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, তথ্য সংরক্ষণ না করলেও সংবেদনশীল পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য অনলাইনে আদান-প্রদানের সময় নিরাপত্তা ঝুঁকি থেকে যায়। শিশুদের পরিচয়পত্র বা মুখের ছবি ফাঁস হলে পরিচয় চুরির মতো গুরুতর ঘটনা ঘটতে পারে।
শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ বাড়ার মধ্যেই মেটার সঙ্গে এই সমঝোতা হলো। বিভিন্ন দেশ এরই মধ্যে শিশু ও কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে নতুন আইন ও নীতিমালা গ্রহণ করছে।
সমঝোতার পর মেটা নিজেদের শিশু নিরাপত্তা উদ্যোগের কথা তুলে ধরার পাশাপাশি টিকটক ও ইউটিউবকেও একই ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
তবে নতুন নিয়মগুলো বাস্তবে কতটা কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা যায়, সেটিই এখন মেটার সামনে বড় পরীক্ষা। শিশুদের ব্যবহারের সময়সীমা নির্ধারণ, নির্দিষ্ট সময়ে অ্যাপ বন্ধ রাখা কিংবা অন্যান্য নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কার্যকর করতে হলে প্রথমেই বয়স নির্ভুলভাবে শনাক্ত করা প্রয়োজন। ফলে এই সমঝোতার বড় প্রশ্ন শুধু বিপুল অর্থ পরিশোধ নয়—শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা কতটা সুরক্ষিত রাখা সম্ভব হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
Comments