গাছকে ‘জীবন্ত সত্তা’ ও আইনি অধিকার দিল কানাডার শহর
বিজ্ঞানীদের বরাতে আমরা সবাই জানি—গাছের জীবন আছে। তবে এবার শুধু জীবনই নয়, মানুষের মতো গাছেরও নিজস্ব 'আইনি অধিকার' রয়েছে বলে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিল কানাডার একটি শহর। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে গাছকে 'আমাদের সবচেয়ে বড় বন্ধু' আখ্যা দিয়ে এই অনন্য উদ্যোগ নিয়েছে শহর কর্তৃপক্ষ।
কানাডার মন্ট্রিল শহর থেকে মাত্র ৪০ মাইল পশ্চিমে অবস্থিত ২ হাজার বাসিন্দার ক্ষুদ্র পৌরসভা 'তেরাস-ভদ্রেয়ঁ' ঘোষণা করেছে—গাছের 'জীবনধারণ, স্বাভাবিক বৃদ্ধি, অখণ্ডতা ও বংশবৃদ্ধির সম্পূর্ণ অধিকার' রয়েছে।
কানাডীয় সংবাদমাধ্যম সিবিসি-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ৯ জুন পৌরসভার কাউন্সিলরদের সর্বসম্মতিক্রমে এই ঐতিহাসিক প্রস্তাবটি পাস হয়। শহরের মেয়র মিশেল বুর্দো জানান, এই নতুন প্রস্তাবের আলোকেই এখন থেকে পৌরসভার সমস্ত বিদ্যমান নিয়মকানুন ও উপবিধি ঢেলে সাজানো হবে। গাছ সংরক্ষণ করা কিংবা কোনো কারণে গাছ কাটা পড়লে সেখানে বাধ্যতামূলকভাবে নতুন গাছ লাগানোর বিষয়টি নিশ্চিত করতেই এই পদক্ষেপ।
বিগত কয়েক বছরে তেরাস-ভদ্রেয়ঁ শহরটি তিনবার ভয়াবহ বন্যার কবলে পড়েছে। মেয়র বুর্দোর মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে গাছই মানুষের সবচেয়ে বড় রক্ষাকবচ। তিনি বলেন, "গাছ প্রকৃত অর্থেই সবুজ অবকাঠামো। এটি আরবান হিট আইল্যান্ড (নগরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি) হ্রাস, বাতাসের মান বৃদ্ধি, জলজ সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সরাসরি সাহায্য করে। গাছ মানুষের মতোই—সে নিশ্বাস নেয়, জীবনধারণ করে ও পানি গ্রহণ করে।"
মেয়র আরও জানান, কুইবেকের চলচ্চিত্র পরিচালক অঁদ্রে দেসরোশের-র তৈরি 'দেস আর্ব্রেস এ দেস আর্তস' নামের একটি চলচ্চিত্র দেখে স্থানীয় নাগরিকরা উদ্বুদ্ধ হন। তারা বুঝতে পারেন, গাছ শুধু স্থির কোনো বস্তু নয়, বরং একটি জীবন্ত সত্তা, যারা শিকড়ের মাধ্যমে একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগও স্থাপন করতে পারে।
পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর আন্তর্জাতিক উদ্যোগ 'ইউনিভার্সাল ডিক্ল্যারেশন অভ দ্য রাইটস অভ দ্য ট্রি' (গাছের অধিকারের সার্বজনীন ঘোষণাপত্র)-তে বিশ্বের প্রথম পৌরসভা হিসেবে স্বাক্ষর করেছে কানাডার এই শহর। 'ইন্টারন্যাশনাল অভজারভেটোরি অভ নেচার রাইটস' এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। এই আন্তর্জাতিক উদ্যোগের ৩টি মূলনীতি হলো: ১. পৃথিবীতে প্রাণের অস্তিত্ব সম্পূর্ণভাবে গাছের ওপর নির্ভরশীল। ২. গাছের সঙ্গে মানুষের 'ভ্রাতৃত্ব ও সংহতি' বজায় রাখতে হবে। ৩. গাছ একটি জীবন্ত সত্তা এবং সার্বিকভাবে মানবজাতির জন্য মঙ্গলজনক।
সংস্থাটির প্রেসিডেন্ট ইয়েনি ভেগা কার্দেনাস বলেন, "গাছের নিজস্ব মর্যাদা এবং 'বোধ' রয়েছে। এটি কোনো অন্ধ আবেগ নয়, বৈজ্ঞানিকভাবেই তাদের বোধশক্তি রয়েছে।"
তিনি আরও উল্লেখ করেন, বিশ্বজুড়ে নদী এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদকে আইনি অধিকার দেওয়ার যে আন্দোলন চলছে, গাছের এই অধিকারের বিষয়টি তারই একটি অংশ। এর আগে ২০২১ সালে কানাডার কুইবেকের 'ম্যাগপাই নদী'কে আইনিভাবে 'ব্যক্তিসত্তা'র মর্যাদা দেওয়া হয়েছিল।
Comments