স্বামীকে নতুন জীবন দিতে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ দান, স্ত্রীর নিঃস্বার্থ ভালোবাসা
১৪ ফেব্রুয়ারি বিশ্ব ভালোবাসা দিবস। কেউ ফুল দিয়ে ভালোবাসা জানায়, কেউ উপহার দিয়ে। কিন্তু ভালোবাসার প্রকৃত অর্থ কি শুধুই কিছু মুহূর্তের আনন্দ? নাকি প্রিয় মানুষকে বাঁচাতে নিজের জীবনের ঝুঁকি নেওয়ার নামই সত্যিকারের ভালোবাসা? মৃত্যুর দুয়ারে দাঁড়িয়ে থাকা স্বামীর সংকট মুহূর্তে হাত ছাড়েননি তার জীবনসঙ্গী। নিজের শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ দান করে স্বামীকে নতুন জীবন দিয়ে ভালোবাসার প্রমাণ দিয়েছেন একজন স্ত্রী। ভালোবাসা তো এমনই হওয়া উচিত।
হাসপাতালের বিছানায় মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছিলেন বরিশাল নগরীর বাসিন্দা আবদুর রহমান। তার দুটি কিডনিই অচল হয়ে গেছে। হাসপাতালের করিডোরে তখন অনিশ্চয়তার ভারী বাতাস। ডাক্তাররা জানিয়ে দেন রহমানকে বাঁচাতে হলে জরুরি ভিত্তিতে কিডনি প্রতিস্থাপন প্রয়োজন।
চিকিৎসার জন্য জীবনের উপার্জিত অর্থ তুলেদেন ভাইয়ের হাতে। কিন্তু সেই ভাই পরিবার রক্তের বন্ধনকে ছিন্ন করে লোভে পড়ে অর্থ নিয়ে চলে যান।
সে সময় দিশেহারা রহমানের স্ত্রী মেসাম্মাত তানজিলা, অসুস্থ স্বামীকে নিয়ে নিরুপায়। কি করে বাঁচাবে তার স্বামীকে। এক পর্যায়ে সিদ্ধান্ত নেন নিজের একটি কিডনি দিয়ে তার প্রিয় জীবনসঙ্গীকে ফিরিয়ে আনবেন তার ভালোবাসার সংসারে। ছোট ছোট দুটি সন্তান মায়ের কাছে রেখে সুদূর ভারতের ভেলোরে দীর্ঘ ৮ মাস একাই জীবন-মরণ যুদ্ধে লড়াই করে ভোলাবাসার মানুষকে নিয়ে ফেরেন দেশে। করুন এই ভালোবাসার কথা যেন স্মরণীয় হয়ে থাকে চিরকাল। তাই আজও রহমান ও তানজিলা সংসার কাটছে অফুরন্ত ভালোবাসায়।
গৃহিনী তানজিলা বলেন, এই সংসারে যখন বউ হয়ে আসেন তখন থেকেই ছিলেন অবহেলিত। শ্বশুরবাড়ির ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত ছিলেন তিনি। স্বামী ছিলেন পরিবারের ভক্তি-শ্রদ্ধার পাত্র। স্ত্রীর মর্যাদায়ও ছিল অসংগতি। যখন আবদুর রহমান অসুস্থ হন, তখন তার পরিবার কিছু সময়ের জন্য পাশে থাকলেও এই অসুখ জেনে মৃত্যু নিশ্চিত ভেবে তার কাছ থেকে দূরে সরে যায়। আমি কখনো ভাবিনি এমনটি হবে। শুধু ভেবেছিলাম ছোট ছোট দুটি সন্তান এতিম হয়ে যাবে। স্বামী যদি অসুস্থ ঘরে পড়েও থাকে, তারপরও সে বেঁচে আছে, তাকে নিয়ে দু-মুঠো ডাল ভাত খেয়ে থাকাটাও একটি ভরসা।
তানজিলা আরও বলেন, তার রক্তের সঙ্গে স্বামীর রক্তের মিল ছিল না। নিজের কিডনি দিয়ে যে স্বামীকে বাঁচাতে পারবে, সেটাও কখনো ভাবিনি। ডাক্তারের পরামর্শে খবর পান যে ভারতের চেন্নাইয়ে এই চিকিৎসা করানো যায়। তখন সিদ্ধান্ত নেন তার স্বামীকে বাঁচাতে হবে। তাকে নিয়ে পাড়ি দেন সেই দূর দেশে। দীর্ঘ আট মাস সেখানে থেকে স্বামীকে সুস্থ করে দেশে ফিরিয়ে নিয়ে আসে। এখন তারা দুজনেই ভালো আছেন।
এদিকে আবদুর রহমান বলেন, ২০১৯ সালে তার স্ত্রীর দেওয়া কিডনি স্থাপন করা হয়। দীর্ঘ ছয় বছর পরও তারা সুস্থ আছেন, করছেন স্বাভাবিক জীবনযাপন। স্ত্রীর প্রতি অবহেলার কথা স্বীকার করে রহমান আরও বলেন, আমি নতুন জীবন পেয়েছি আমার স্ত্রীর কারণে। সে না থাকলে আজ আমি বেঁচে থাকতাম না। আমি তার কাছে সারাজীবন ঋণী।
ভালোবাসার জন্য এত বড় ত্যাগ চিরকাল অম্লান থাকে। তাই তো ভালোবাসা সবসমই সুন্দর।
Comments