শানের হাফেজী ডিগ্রি অর্জন ও বাবা-মায়ের আত্মতৃপ্তির হাসি
জীবন ও জীবিকার তাগিদে দেশান্তরি হয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে বসবাস শুরু করে ধীরে ধীরে প্রবাসীর তালিকায় যুক্ত হতে থাকে বাংলাদেশীদের নাম। সময়ের অমোঘ নিয়মে অনেকেই স্হায়ী ভাবে বসবাস শুরু করেন। আবার কেউ যৌবনের শেষ প্রান্তে এসে ফিরে যান দেশের মাটিতে বিশেষ করে যারা মধ্যপ্রাচ্যের অভিবাসী। ইউরোপ,আমেরিকা,কানাডা সহ অন্যান্য দেশ গুলোতে পরিবার পরিজন নিয়ে স্হায়ীভাবে নোঙর গেড়েছে অনেকে এদের সংখ্যা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘ।
ইউরোপের দেশ গুলোতে মুসলমানদের ধর্মীয় ব্যপারে অনেকটাই প্রতিকুল পরিবেশ। বিশেষ করে বাচ্চাদের ধর্মীয় শিক্ষার ক্ষেত্রে অনেক বাধা-বিপত্তি ডিঙিয়ে এগুতে হয়। তবে মা, বাবার আন্তরিক প্রচেষ্টা ও অক্লান্ত পরিশ্রম আর ত্যাগ স্বীকারের মাধ্যমে সন্তানদেরকে ধর্মীয় ও নিজস্ব সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে গড়ে তুলতে সক্ষম হয় তাদের সংখ্যা নেহাত কম নয়।
যদিও যুক্তরাজ্যে ইসলামি পরিবেশে বাচ্চাদের বেড়ে ওঠার অনেকটা সুযোগ রয়েছে এর কারণ এখানে বিশেষ করে পাকিস্তানী এবং বাংলাদেশী কমিউনিটির অনেক বড় ভূমিকা পালন করে আসছে এবং যুগের পর যুগ ধরে কমিউনিটির বসবাস এখানে।
তেমনি একজন প্রবাসীর কথকতা নিয়ে আজকের এই লেখা। জীবন ও জীবিকার তাগিদে যৌবনের সোনালী ক্ষণে বাংলাদেশ থেকে ইউরোপের স্বর্গরাজ্য খ্যাত দেশ সুইজারল্যান্ডে ১৯৮৯ সালে পাড়ি জমান আব্দুল কাদের। কর্মসূত্রে কখনও প্যারিস, লুক্সেমবার্গ, বেলজিয়াম আবার কখনও ইতালির ভেরোনা শহরে যেখানে ইতিহাস সমৃদ্ধ শেক্সপিয়ারের রোমিও জুলিয়েটের স্মৃতিচিহ্ন এখনও জ্বলজ্বল করে আছে।
১৯৯০ সাল থেকে স্হায়ীভাবে ভেরোনা শহরে বসবাস শুরু করেন আব্দুল কাদের। অভিবাসীর তালিকায় যোগ হয় আরোও একটি নাম। ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন একজন রেমিটেন্স যোদ্ধা। জমতে থাকে প্রবাস জীবনের দু:খ, কষ্ট, স্বপ্ন, প্রত্যাশা জীবন যুদ্ধে টিকে থাকার লড়াই ও সংগ্রামের নানা অভিজ্ঞতা।
এই যুদ্ধে সামিল হয় সহধর্মিণী ইশরাত জাহান। বহতা নদীর মতই সময় তাঁর আপন গতিতে ছুটতে থাকে। এই চলার পথে নতুন স্বপ্ন বুননে ২০০৮ সালে ইশরাত জাহানের কোল জুড়ে আসে প্রথম সন্তান শমসের আরেফিন শান।
এবার তাঁর নতুন যুদ্ধ! সন্তানকে মানুষের মত মানুষ করতে হবে। এই ভাবনায় কেটে যায় চারটি বছর। একদিকে ধর্মীয় অনুশাসন ও নিজস্ব সংস্কৃতির অনুপস্হিতি। অন্যদিকে ইতালিয়ান ভাষায় পড়ালেখা ও ভবিষ্যতের দিক নির্দেশনা। মাথায় কেবলই ঘুরপাক খেতে থাকে কিভাবে ইসলামিক আকিদা ও নিজস্ব সংস্কৃতির মধ্যে সন্তান বেড়ে উঠতে পারে।
এবার তার আরেক যাত্রা যুক্তরাজ্যের উদ্দেশ্যে। এর একটাই কারণ এখানে একদিকে ইংরেজি ভাষা অন্যদিকে ইসলামিক পরিবেশে বেড়ে ওঠার অপার সম্ভাবনা। তাইতো স্কটল্যান্ডের রাজধানী এডিনবড়ায় ২০১২ সালে স্বপরিবারে চলে আসেন এবং স্হায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। ছেলে শান ভর্তি হয় স্হানীয় একটি স্কুলে পাশাপাশি ব্লাকহল ইসলামিক কমিউনিটি সেন্টার মাদ্রাসায় আরবী শিক্ষাও গ্রহণ করেন।
সময়ের ধারাবাহিকতায় পড়াশুনার পাশাপাশি খেলাধূলাসহ বিভিন্ন ইভেন্টে অংশ গ্রহণের মাধ্যমে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন, তন্মধ্যে (যুক্তরাজ্যের জাতীয় একাডেমিক প্রতিযোগিতা), ইউকে কেমিস্ট্রি অলিম্পিয়াড -২০২৫, (যুক্তরাজ্যের জাতীয় একাডেমিক প্রতিযোগিতা), ফ্রেজার স্টডার্ট প্রাইজ -২০২৫, (গবেষণা প্রকল্প), ইয়ং এন্টারপ্রাইজ -২০২৪-২০২৫, একটি অলাভজনক সংস্থা উদ্যোগ গড়ে তোলা-২০২৫, ইএসএমএস,ক্যালিসথেনিকস কোচিং-২০২৬, স্কুলের বাইরের জিম সহ বিভিন্ন কার্যক্রমের মাধ্যমে অল্প বয়সেই বহুমুখী প্রতিভার তিলক ফুটে উঠেছে ললাটে। বর্তমানে স্টুয়ার্ড মেলবোর্ন কলেজে এ লেভেলে অধ্যায়নরত আছেন।
এ বছর রমজান মাসে ব্লাকহল ইসলামিক একাডেমী থেকে কোরআনের হাফেজ ডিগ্রী অর্জন করেন। সন্তানের এই সাফল্যে বাবা আব্দুল কাদের ও মা ইসরাত জাহানের চোখে মুখে ফুটে ওঠে আত্মতৃপ্তি ও ত্যাগ স্বীকারের এক সাফল্যের হাসি। বুকের গভীরে লালায়িত স্বপ্ন যেন আজ পূরণ হয়েছে। যেন এই দিনটির জন্যই অপেক্ষায় ছিলেন এত কাল। আব্দুল কাদেরের দুটি ছেলে, একটি মেয়ে এবং সহধর্মিণী ইশরাত জাহানের ছোট্ট এই জগতে পরিশ্রম, আত্মত্যাগ এবং স্বপ্ন বাস্তবায়নের আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে প্রবাস জীবনের স্বার্থকতাই যেন উঁকি দিচ্ছে অনাগত দিনগুলোর আকাশে।
Comments