তবুও ক্রিকেট

চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে যাওয়ার আগে বাংলাদেশ দলের আধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত বলেছিলেন, 'দল চ্যাম্পিয়ন হওয়ার জন্যই যাচ্ছে'। চ্যাম্পিয়ন তো দূরের কথা, বাংলাদেশ দলের খেলায় কোন ঝলকই ছিল না। দুই ম্যাচের দুটিতেই হেরে ঝুলিতে শূন্য পয়েন্ট নিয়ে বিদায় নিয়েছে টাইগার বাহিনী।
এক অভিনেত্রী ফেসবুকে লিখেছেন তিনি প্রেম করা এবং বাংলাদেশ ক্রিকেট দলে খেলা দেখা ছেড়ে দিয়েছেন। তাঁর এই কথার ব্যাপক প্রতিক্রিয়া হচ্ছে। অনেকেই বলছেন, বাংলাদেশ দলের খেলা আর দেখা যায় না। কিন্তু বাস্তবতা হলো তবুও বাংলাদেশ ক্রিকেট খেলে এবং খেলেও যাবে।
গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পরিবর্তন এসেছে দেশের ক্রিকেটাঙ্গনে। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড নতুন সভাপতি পেয়েছে, নতুন করে বোর্ড সাজানো হয়েছে এবং এর মধ্যে ঘরোয়াভাবে বিপিএল আয়োজনও সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের খেলায় কোন পরিবর্তন নেই।
তবে এই পরিবর্তিত সময়ের শুরুতে কিছুটা ঝলকে উঠেছিল বাংলাদেশ। সেপ্টেম্বরে পাকিস্তানে যায় টাইগাররা। দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজে ঘরের মাঠের দলটিকে হোয়াইটওয়াশ করে তারা। যে দলের বিপক্ষে কখনও টেস্ট জয়-ই ছিল না, তাদের বিপক্ষে এমন সাফল্যে সবাই আনন্দে আত্মহারা হয়ে যায়। কিন্তু বাস্তবতা বুঝতে সময় লাগেনি। এর পরপরই ভারত সফরে যান বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা। টেস্ট সিরিজের মতো টি-টোয়েন্টিতেও হোয়াইটওয়াশ হয় বাংলাদেশ।
এরপর নিজেদের মাঠেও সেই ম্লান পারফরম্যান্স। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে সিরিজ শুরুর আগে ২-০ ব্যবধানে জেতার স্বপ্নের কথা জানানো হলেও হয়েছে একেবারে বিপরীত। দুই দিনে বা আড়াই দিনেই টেস্ট হেরে আবারও হোয়াইটওয়াশ বাংলাদেশ। প্রিয় ফরম্যাট ওয়ানডেতেও দুর্দশা চলমান, আফগানিস্তানের বিপক্ষে ২-১ ব্যবধানে সিরিজ হারে দল। ভিন্ন ভিন্ন ফরম্যাটের কোনটিতেই ব্যাটিং বা বোলিংয়ে কোন উৎকর্ষতা চোখে পড়েনি।
তাহলে কীসের ভরসায় টাইগার অধিনায়ক খেলতে যাওয়ার আগে বলেছিলেন, চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে চ্যাম্পিয়ন হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ? এগুলো শুধুই কথার কথা? নাকি দলটি আসলে অতি সাধারণ,কিন্তু আমাদের সংবাদ মাধ্যমে এর ভাবমূর্তি তৈরি করা হয়েছে অনেক বড় করে?
মাঝে মধ্যে দু-একটি ম্যাচ জিতে গেলে যেভাবে বাংলাদেশের গণমাধ্যম প্রশংসার সাগরে ভাসিয়ে দেয়, সরকার থেকে বিশাল বিশাল উপহার দেয়, তাতে করে জনমনে এবং ক্রিকেটারদের মনোজগতে বড় প্রত্যাশা তৈরি হয়ে যায়। এবং তখন যখন আর পারেনা, তখন বড় হতাশা তৈরি হয়। প্রকৃত অর্থে শক্তি-সামর্থ্য বিবেচনায় বাংলাদেশের পারফরম্যান্স কখনোই আহামরি ছিল না। বরাবর একটি মধ্যম মানের দল। হঠাৎ করে পাকিস্তান বা নিউজিল্যান্ড-কে হারানো যায়, কিন্তু আমাদের সক্ষমতা তলানীতেই পড়ে আছে। সক্ষমতার অভাব নিয়ে অতি বেশি স্বপ্নে বিভোর হলে যা হয় তা-ই হয়েছে বাংলাদেশ দলের। বাংলাদেশের আসল সামর্থ্যকে তথ্য সমৃদ্ধ বিশ্লেষণ করার যে প্রয়োজনীয়তা সেটাও করেনি আমাদের গণমাধ্যম এবং ক্রিকেট কর্তারা।
টেস্ট মর্যাদা পাওয়ার দুই যুগ পার হয়েছে। এখন আবেগে ভাসার চেয়ে বস্তনিষ্ঠ বিশ্লেষণ বেশি প্রয়োজন আমাদের। অবস্থা এতটা খারাপ যে আফগানিস্তানের সাথে খেলতেও এখন ভয় করে। এই দীর্ঘ সময়ে টাইগার দলের ব্যাটিং লাইন আপে টপ অর্ডার ঠিক হলো না। একটা আস্থাশীল ওপেনিং জুটি দেখা গেল না। বোলিং-এও একই অবস্থা। একজন দু'জন কখনও কখনও ভাল বল করেন, কিন্তু প্রতিপক্ষকে ধসিয়ে দেয়ার মতো বোলার আমরা দেখিনি।
টেস্ট মর্যাদা পাওয়ার দুই যুগ পরে এসে সততার সাথে এই বিশ্লেষণগুলো প্রয়োজন। বিশ্বের এখনকার ক্রিকেট মানের সাথে তুলনা করলে আমরা কোথায় আছি, কেমন আছি এবং আছি তার নির্মোহ মূল্যায়ন না হলে এভাবেই চলবে আগামী দিনগুলোতেও।
বাংলাদেশের ক্রিকেটে আর্থিক ব্যাপক বিনিয়োগ। অন্য সব খেলার চাই নেই। বরং একেবারে উল্টো। সেই আকরাম খানদের সময় থেকে দেশের খেলাধুলার ক্ষেত্রে ক্রিকেট সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়ে আসছে। সবচেয়ে বেশি অর্থ বরাদ্দ পেয়ে আসছে দেশের ক্রিকেট। সেই বিনিয়োগ কতটা রিটার্ন দিয়েছে, কতটা স্পোর্টিং স্পিরিট আনতে পেরেছে সেটা বের করে আনা প্রয়োজন।
Comments