সবুজহীন রাজধানী: ঢাকার ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রার জন্য দায়ী কি বৃক্ষনিধন?
রাজধানী ঢাকা দিন দিন যেন এক উত্তপ্ত নগরীতে পরিণত হচ্ছে। গ্রীষ্মের তাপদাহ এখন আর কেবল দিনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই—রাতেও কমছে না গরমের তীব্রতা। প্রশ্ন উঠছে, এই অস্বাভাবিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির পেছনে কি কেবল জলবায়ু পরিবর্তন দায়ী, নাকি শহরের নির্বিচার বৃক্ষনিধনও বড় কারণ?
কমছে সবুজ, বাড়ছে তাপ
একসময় ঢাকা ছিল গাছপালা, খাল-বিল আর উন্মুক্ত জায়গায় ভরা এক প্রাণবন্ত শহর। কিন্তু দ্রুত নগরায়ণের চাপে সেই সবুজ এখন প্রায় বিলীন। নতুন সড়ক, ভবন ও অবকাঠামো নির্মাণের জন্য কাটা হচ্ছে অসংখ্য গাছ। ফলে শহরের প্রাকৃতিক শীতলীকরণ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে।
গাছপালা পরিবেশ থেকে তাপ শোষণ করে এবং ছায়া প্রদান করে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু গাছ কমে যাওয়ায় সূর্যের তাপ সরাসরি কংক্রিটের ওপর পড়ছে, যা তাপ শোষণ করে দীর্ঘ সময় ধরে তা ছড়িয়ে দিচ্ছে।
আরবান হিট আইল্যান্ডের প্রভাব
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকার তাপমাত্রা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ 'আরবান হিট আইল্যান্ড' প্রভাব। কংক্রিট, ইট ও পিচঢালা সড়ক দিনের বেলায় তাপ শোষণ করে এবং রাতে ধীরে ধীরে তা নিঃসরণ করে। ফলে শহরের তাপমাত্রা আশপাশের গ্রামীণ এলাকার তুলনায় অনেক বেশি থাকে।
সবুজের অভাব এই প্রভাবকে আরও তীব্র করে তুলছে। যেখানে গাছপালা নেই, সেখানে তাপমাত্রা দ্রুত বাড়ে এবং কমতেও সময় লাগে বেশি।
জলবায়ু পরিবর্তনের ভূমিকা
বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন ঢাকার তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। তাপমাত্রার সামগ্রিক বৃদ্ধি, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ শহরের পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, জলবায়ু পরিবর্তন একটি বৈশ্বিক সমস্যা হলেও ঢাকার স্থানীয় সমস্যা—বিশেষ করে বৃক্ষনিধন ও অপরিকল্পিত নগরায়ণ—এই সংকটকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
জনস্বাস্থ্য ও জীবনের ওপর প্রভাব
অতিরিক্ত তাপমাত্রা মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। হিট স্ট্রোক, পানিশূন্যতা, শ্বাসকষ্ট এবং হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ছে। শ্রমজীবী মানুষ, শিশু ও বয়স্করা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন।
এছাড়া রাতের তাপমাত্রা না কমায় মানুষের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটছে, যা দীর্ঘমেয়াদে মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
সমাধানের পথ কী?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকাকে বাসযোগ্য রাখতে হলে এখনই সবুজায়নের দিকে গুরুত্ব দিতে হবে। নতুন গাছ লাগানোর পাশাপাশি বিদ্যমান গাছ সংরক্ষণে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। নগর পরিকল্পনায় পার্ক, উন্মুক্ত স্থান এবং জলাধার সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক করতে হবে।
একই সঙ্গে পরিবেশবান্ধব নির্মাণ, ছাদ বাগান, এবং সবুজ করিডোর তৈরির মতো উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি।
ঢাকার তাপমাত্রা বৃদ্ধির পেছনে একক কোনো কারণ নেই। তবে বৃক্ষনিধন যে বড় একটি ভূমিকা রাখছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই শহর আরও বসবাসের অনুপযোগী হয়ে উঠবে।
Comments