আজ থেকে আমানত ফেরত দেবে ন্যাশনাল ব্যাংক
আর্থিক সংকট কাটিয়ে স্বাভাবিক ব্যাংকিং কার্যক্রমে ফেরার উদ্যোগ নিয়েছে ন্যাশনাল ব্যাংক। বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) থেকে গ্রাহকদের চাহিদা অনুযায়ী আমানতের টাকা ফেরত দেওয়া শুরু করছে ব্যাংকটি। প্রথম পর্যায়ে গত ১১ থেকে ১৪ অক্টোবর পর্যন্ত টাকা তোলার আবেদন করা গ্রাহকেরা অগ্রাধিকার পাবেন।
ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, গ্রাহকদের আমানত ফেরত দিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের গ্যারান্টির বিপরীতে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক থেকে ৭ হাজার কোটি টাকা ঋণসহায়তা পেয়েছে ন্যাশনাল ব্যাংক। এই অর্থ ব্যবহারের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বেশ কিছু শর্ত আরোপ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে, ঋণসহায়তার টাকা দিয়ে ব্যাংকটির সাবেক বা বর্তমান কোনো পরিচালকের আমানত ফেরত দেওয়া যাবে না। একই অর্থ থেকে নতুন ঋণ বিতরণও নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, এই ঋণসহায়তার সুদহার ১০ শতাংশ এবং মেয়াদ তিন মাস। অর্থ ব্যবহারের হিসাব প্রতি সপ্তাহে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে জানাতে হবে। পাশাপাশি ঋণসহায়তার অর্থ পরিশোধ না হওয়া পর্যন্ত নগদ লভ্যাংশ দিতে পারবে না ন্যাশনাল ব্যাংক।
ন্যাশনাল ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আবু জাফর জানিয়েছেন, ব্যাংকের পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তনের পর গ্রাহকদের টাকা তোলার চাপ কমেছে। একই সঙ্গে আমদানি কার্যক্রমও বাড়ছে। বর্তমানে ব্যাংকে জমা ও উত্তোলনের মধ্যে ব্যবধান খুব বেশি নেই। তাই বৃহস্পতিবার থেকে গ্রাহকদের চাহিদা অনুযায়ী টাকা ফেরত দেওয়া হবে।
ব্যাংক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গত চার দিনে প্রায় ১১ হাজার গ্রাহক মোট ২ হাজার কোটি টাকা উত্তোলনের আবেদন করেছেন। শাখাগুলো থেকে পাওয়া চাহিদার ভিত্তিতে প্রধান কার্যালয় প্রয়োজনীয় অর্থ সরবরাহ করেছে। প্রথম দিকে আবেদনকারী গ্রাহকদের চলতি ও সঞ্চয়ী হিসাবের টাকা ফেরত দেওয়া হবে। পরে ধাপে ধাপে অন্য গ্রাহকদের আমানতও পরিশোধ করা হবে।
তবে ঋণসহায়তার অর্থ ব্যবহারে কঠোর বিধিনিষেধ রয়েছে। এই টাকা দিয়ে পরিচালকদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে ঋণ বা বিনিয়োগ, বিদ্যমান ঋণের পরিমাণ বাড়ানো কিংবা আগে অনুমোদিত কিন্তু বিতরণ না হওয়া ঋণ ছাড় করা যাবে না। আন্তব্যাংক দায় পরিশোধ, অন্য ব্যাংকের ঋণ অধিগ্রহণ কিংবা অন্য ব্যাংকে আমানত হিসেবেও এই অর্থ রাখা নিষিদ্ধ।
এ ছাড়া ব্যাংকটির পরিচালন ব্যয় আগের বছরের তুলনায় ৫ শতাংশের বেশি বাড়ানো যাবে না। গ্যারান্টির অর্থ পরিচালন ব্যয়েও ব্যবহার করা যাবে না। নতুন করে সংগৃহীত আমানত তারল্য পরিস্থিতির উন্নতি এবং সাধারণ আমানতকারীদের পাওনা পরিশোধে কাজে লাগাতে হবে।
ন্যাশনাল ব্যাংকের আর্থিক অবস্থার চিত্রও উদ্বেগজনক। ব্যাংকটির তথ্য অনুযায়ী, গত ১২ অক্টোবর পর্যন্ত আমানতের পরিমাণ ছিল ৩৩ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা। বিপরীতে ঋণের স্থিতি দাঁড়ায় ৪৩ হাজার ২৩০ কোটি টাকা। ফলে ঋণ ও আমানতের অনুপাত বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩২ শতাংশে। অথচ বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী, প্রতি ১০০ টাকা আমানতের বিপরীতে সর্বোচ্চ ৮৭ টাকা ঋণ দিতে পারে একটি ব্যাংক।
এর ওপর গত জুন শেষে ন্যাশনাল ব্যাংকের বিতরণ করা ঋণের প্রায় ৬৬ শতাংশই খেলাপি হয়ে পড়ে। বাংলাদেশ ব্যাংক, অন্যান্য ব্যাংক এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গ্যারান্টির বিপরীতে নেওয়া ঋণ মিলিয়ে ব্যাংকটির ধার প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকা।
২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত সিকদার গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে ছিল ন্যাশনাল ব্যাংক। ওই সময়ে বিভিন্ন আর্থিক অনিয়মের কারণে ব্যাংকটি বড় ধরনের লোকসান ও তারল্যসংকটে পড়ে। এখন নতুন করে গ্রাহকদের আমানত ফেরত দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হলেও ব্যাংকটির আর্থিক পরিস্থিতি কতটা স্থিতিশীল হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
Comments