বন্ডের কাপড় আবাসিক ভবনে, চট্টগ্রামের জিন্সমিথের কোটি টাকার পণ্য জব্দ
রপ্তানি আদেশের পণ্য বাতিল কিংবা পরিবর্তনের চটজলদি অজুহাত। তার আড়ালে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের শত শত কার্টন শীতের ভেস্ট জ্যাকেট ও জিন্স প্যান্ট মজুদ করে চট্টগ্রাম শহরের খোলা বাজারে বিক্রি করাই ছিল মূল উদ্দেশ্য। তবে শেষ রক্ষা হয়নি। কাস্টমসের চোরাচালান ও শুল্ক ফাঁকি নিরোধক টিমের নজরদারিতে ভেস্তে গেছে সম্পূর্ণ পরিকল্পনা।
চট্টগ্রামের বায়েজিদ বোস্তামী থানার ওয়াপদা গেট সংলগ্ন কুলগাঁও এলাকার তৈরি পোশাক কারখানা 'জিন্সমিথ লিমিটেড' এর অবৈধ বন্ডেড পণ্য ও কাঁচামালের বিপুল চালান জব্দ করেছে চট্টগ্রাম কাস্টমস এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট।
গোপন সংবাদের ভিত্তিতে চট্টগ্রাম কাস্টমস এর একটি বিশেষ গোয়েন্দা দল নগরীর রহমাননগর আবাসিক এলাকার 'বি' ব্লকের একটি আবাসিক ভবনে ঝটিকা অভিযান পরিচালনা করে। ওই ভবনের ভেতরের ফ্ল্যাট থেকে ৩৩২ রোল বন্ড সুবিধার শুল্কমুক্ত কাঁচামাল (কাপড়), ১,১৫৭টি কার্টনে মোট ১১ হাজার পিস রপ্তানিযোগ্য শীতের ভেস্ট জ্যাকেট এবং আরও ৩৩২ কার্টন জিন্স প্যান্ট উদ্ধার করা হয়।
অভিযান সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, জিন্সমিথ লিমিটেডের স্বত্বাধিকারী নোয়াফেল বিন রেজা দীর্ঘদিন ধরেই এই বন্ড জালিয়াতির সঙ্গে যুক্ত। বন্ড সুবিধার (Duty-Free) আওতায় আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য শুল্কমুক্ত সুবিধায় আমদানি করা কাঁচামাল নিয়ম অনুযায়ী কারখানার গুদামে নেওয়ার কথা থাকলেও, তিনি সরাসরি তা কাস্টমসের নজর এড়িয়ে নিজস্ব আবাসিক ভবনে মজুত করতেন। পরবর্তী সময়ে বন্ডের এসব কাপড় ও উৎপাদিত পোশাক চট্টগ্রাম শহরের ছোট ছোট স্থানীয় পোশাক কারখানা ও খোলা বাজারে বেআইনিভাবে বিক্রি করা হতো।
আইন অনুযায়ী, বন্ড সুবিধাপ্রাপ্ত কাঁচামাল ও তৈরি পোশাক কাস্টমসের অনুমোদিত ওয়্যারহাউস ছাড়া অন্য কোথাও রাখা সম্পূর্ণ বেআইনি। কাস্টমস আইন, ২০২৩-এর ধারা ১২(২) ও ১১৮ এবং ওয়্যারহাউস লাইসেন্সিং বিধিমালা, ২০২৪-এর শর্ত ভঙ্গ করায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বন্ডেড ওয়্যারহাউস লাইসেন্স স্থগিত বা বাতিলসহ কঠোর আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
প্রাথমিক অডিট ও ইনভেন্টরি শেষে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এই চালানের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি অন্তত ৭৪ লাখ ১২ হাজার ৭৬৬ টাকা রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছে। কাস্টমস আইন, ২০২৩-এর ১২৬ ধারা অনুযায়ী এই রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যে ইতোমধ্যে দাবিনামা জারির প্রক্রিয়া চলছে। একই সঙ্গে বিধি অনুযায়ী বন্ড রেজিস্টার সংরক্ষণ না করায় প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কারণ দর্শানো নোটিশ এবং ৩ থেকে ৭ বছরের কারাদণ্ডসহ অর্থদণ্ডের আইনি আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
তৈরি পোশাক খাতের ব্যবসায়ীরা বলছেন, এ ধরনের জালিয়াতি দেশের ভাবমূর্তি ও পোশাক খাতের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের ওপর বড় ধরনের আঘাত আনে। বিদেশি বায়ার বা আন্তর্জাতিক নামিদামি ব্র্যান্ডের এক্সক্লুসিভ ডিজাইনের পোশাক যখন বাজারজাতকরণের আগেই স্থানীয় খোলা বাজারে নামমাত্র মূল্যে বিক্রি হতে দেখা যায়, তখন ব্র্যান্ডগুলো কপিরাইট লঙ্ঘন ও নিরাপত্তা শঙ্কার কারণে ওই দেশকে কালো তালিকাভুক্ত করার ঝুঁকিতে পড়ে।
চট্টগ্রাম কাস্টমস কমিশনারেট জানিয়েছে, ঘটনার পেছনের মূল হোতাদের শনাক্ত করতে এবং রাজস্ব ফাঁকির প্রকৃত পরিমাণ চূড়ান্ত করতে অডিট কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। পাশাপাশি শীর্ষ বাণিজ্যিক সংগঠন বিজিএমইএ (BGMEA) থেকেও উক্ত প্রতিষ্ঠানের সদস্যপদ বাতিলের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
Comments