তিনশ' বছরের ঐতিহ্য বহন করছে পাঁচগাও "লাল দুর্গা"
সনাতনী ধর্মাবলম্বীদের আনন্দ, উল্লাস আর ভক্তির বর্ণিল আবহে যখন সারাদেশে দুর্গাপূজা পালিত হয় একরকম চেনা রূপে, ঠিক তখনই মৌলভীবাজারের রাজনগরের পাঁচগাঁও গ্রামে প্রতি বছর উদ্ভাসিত হয় এক ব্যতিক্রমী আয়োজন-লালে রাঙা দেবী দুর্গার পূজা।
চোঁখে পড়ার মতো লাল রঙের প্রতিমা, যা ভক্তিমিশ্রিত বিস্ময়ে আবেগতাড়িত হয়ে বিমুগ্ধ করে ভক্তদের। সাধক স্বর্গীয় সর্বানন্দ দাসের ঘর থেকেই এই ব্যতিক্রমী পুজার শুরু। তার আধ্যাত্মিক দর্শনের প্রভাবে এ পূজা হয়ে উঠেছে ভক্তি, শিল্প ও সংস্কৃতির এক অতুলনীয় সংমিশ্রণ।
সপ্তমী থেকে নবমী পর্যন্ত চলা এই উৎসবে মণ্ডপের চারপাশ হয়ে ওঠে আলো, ধূপ, ঢাক ও শঙ্খধ্বনির মিলনে এক আধ্যাত্মিকতা মাখানো নাট্যশালা। প্রতিমার রঙ যেমন রক্তিম, তেমনি ভক্তদের চোখে-মুখে যেন জ্বলজ্বলে আশ্চর্য অনুভুতি।
পাঁচগাঁওয়ের এই পূজা তাই নিছকই কোনো ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়, এ যেন লোকায়িত আধ্যাত্মিকতার নিঃশব্দ এক বিস্ফোরণ, যা প্রতি বছরই মনে করিয়ে দেয়-ভক্তিরও রঙ আছে, আর তা নিঃসন্দেহে রক্তে রাঙানো'লাল'।
পূজার আয়োজকরা বলেন, লাল প্রতিমার অস্তিত্ব দেশের আর কোথাও না থাকায় এই পূজা ঘিরে রয়েছে এক ধরনের রহস্য ও আকর্ষণ। শুধু বৃহত্তর সিলেট নয়, দেশের নানা প্রান্ত থেকে এমনকি ভারত থেকেও ভক্তরা ছুটে আসেন।
পাঁচগাঁও গ্রামের দেবীদুর্গার লালবর্ণের মূর্তির পেছনে আছে এক অলৌকিক কাহিনি। প্রচলিত রয়েছে, স্বর্গীয় সাধক সর্বানন্দ দাস আসামের কামাক্ষ্যায় পূজার জন্য এক শিশু কন্যা লাভ করেন। ধীরে ধীরে সেই কন্যার শরীর লাল রঙ ধারণ করলে তিনি বুঝতে পারেন, কন্যার মধ্যে স্বয়ং দেবীর ছায়া রুপের ধারণ করেছেন। দেবী তখন সাধককে বর দিতে বলেন। সাধক রাজনগরের পাঁচগাঁওয়ে দেবীর আবির্ভাব চান। দেবী তখন জানান, এখানে তার প্রতিমার রঙ হবে লাল। সেই থেকে পাঁচগাঁওয়ে লাল রঙের প্রতিমায় দেবীপূজা চলে আসছে।
লোককথা মতামতে, দেবী একসময় তার উপস্থিতির প্রমাণস্বরূপ কাঁচাঘরের বেড়ায় পাঁচ আঙুলের লাল ছাপ রেখে যান ও নিজের স্বর্ণের গয়না রেখে যান। এখনও সেই গয়নাগুলো পূজার সময় প্রতিমাকে পরানো হয়।
স্থানীয় লোকজন জানিয়েছেন, প্রতি বছর উৎসবমুখর পরিবেশে দেশ-বিদেশ থেকে লক্ষাধিক ভক্ত ও দর্শনার্থী আসেন পাঁচগাঁও দুর্গাপূজায়। পূজার সপ্তমী থেকে নবমী পর্যন্ত নানা মনস্কামনা নিয়ে ছুটে আসা ভক্তরা দেন পশুবলি, করেন বস্ত্র ও অলঙ্কার নিবেদন। কয়েকটি মহিষ, হাজারখানেক পাঁঠা, হাঁস ও কবুতর বলি দেওয়া হয় দেবীর আরাধনার উদ্দেশ্যে। অনেকেই হোমযজ্ঞ, প্রদীপ ও আগরবাতি প্রজ্বালন করে পূর্ণ করেন তাদের ব্রত।
পাঁচগাঁও দুর্গাপূজার পরিচালক সঞ্জয় দাস সর্বানন্দ দাসের ষষ্ঠ উত্তরপুরুষ। সঞ্জয় দাস জানান, তাদের পরিবারেই ৩০০ বছরের বেশি সময় ধরে লাল বর্ণের দেবীর ব্যতিক্রমী পূজা হয়ে আসছে। এটি মূলত পারিবারিক পূজা হলেও দেবীর জাগ্রত উপস্থিতির বিশ্বাসে লাখো দর্শনার্থীর ভিড় হয়। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় একবার পূজায় ছেদ পড়ে, সেবার ঘট পূজা হয়।
তিনি বলেন, পূজার কয়েকদিন পরিবার ও প্রতিবেশীদের হিমশিম খেতে হয় দর্শনার্থীর ভিড়ে। তবে কোনো সমস্যা হয় না। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসন সার্বিক সহযোগিতা করে থাকে। এবারও স্থানীয় ও জেলা পর্যায়ের প্রশাসন থেকে খোঁজখবর নেওয়া হয়েছে।
মৌলভীবাজার জেলা পূজা উদযাপন কমিটির সূত্রের বরাতে জানা যায়, জেলায় এবার সার্বজনীন ৮৯৮টি এবং ব্যক্তিগত ১২৪টি সহ মোট ১ হাজার ২২টি পূজামণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এর মধ্যে সদরে ১১১টি, বড়লেখায় ১৪৬টি, জুড়িতে ৭৬টি, কুলাউড়ায় ২২৭টি, রাজনগরে ১৩৬টি, কমলগঞ্জে ১৫৪টি ও শ্রীমঙ্গলে ১৭২টি দুর্গাপূজা হচ্ছে।
মৌলভীবাজার পুলিশ সুপার মো. মনিরুল ইসলাম বলেন, জেলার সব মণ্ডপে সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। প্রতিটি মণ্ডপে পুলিশ ও আনসারের সমন্বয়ে বিশেষ নিরাপত্তার বলয়ে ব্যবস্থা তৈরি করা রয়েছে।
Comments