বন্ধ দরজার ওপারে; রাত যত গভীর হয় ভয় তত সন্নিকটে
সন্ধ্যা নামলেই অন্য সব শহরের মতো নবাবগঞ্জের ব্যস্ততা ধীরে ধীরে কমতে থাকে। দোকানের শাটার নামে, রাস্তায় মানুষের চলাচল কমে আসে। অথচ কোথাও কোথাও তখনও জেগে থাকে ছোট ছোট মুখ। কেউ ধর্মীয় পাঠ নেয়, কেউ কোরআন পড়ে, কেউ আবার বাবা-মায়ের কাছ থেকে দূরে আবাসিক ব্যবস্থায় রাত কাটায়। সন্তানকে ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠানোর পেছনে অভিভাবকের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা; সন্তান ভালো মানুষ হবে, নৈতিকতা শিখবে এবং নিরাপদ থাকবে। কিন্তু পরিবারের চোখের আড়ালে থাকা সেই শিশুটি কতটা নিরাপদ? এই প্রশ্ন কোনো ধর্মের বিরুদ্ধে নয়। কোনো মাদরাসা, মন্দির কিংবা ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে অভিযুক্ত করাও নয়। বরং প্রশ্নটি শিশু সুরক্ষার। কারণ শিশু নির্যাতনের ঝুঁকি কোনো একটি ধর্ম, প্রতিষ্ঠান বা সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। যেখানে শিশু দীর্ঘ সময় পরিবারের বাইরে থাকে, সেখানে নিরাপত্তা, নজরদারি, অভিযোগ জানানোর সুযোগ এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।
একটি শিশুর নীরবতা
গালিমপুর এহসানিয়া আবাসিক ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়ত ১২ বছরের ছোট্ট শিশু। প্রতিবেদনের স্বার্থে তার নাম দেওয়া হলো 'রিফাত' (ছদ্মনাম)। রিফাতের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানে থাকার সময় সে এমন একটি পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়, যা তাকে ভয় ও অস্বস্তির মধ্যে ফেলে দেয়।
ভুক্তভোগী শিশু রিফাত বলছিলো....
প্রায় রাতে হুজুর আমার লগে খারাপ কাজ করতো। প্রথম প্রথম দুই রানে এসব করতো। পরে আমার পায়খানার রাস্তায়ও করতো। আমাকে ভয় দেখাতো যাতে এসব কথা কাউরে না কই। কইলে আমারে মারবে। যেদিন প্রথম আমার পায়খানার রাস্তায় হুজুর খারাপ কাজ করে সেদিন অনেক রক্ত বের হইছে। ব্যথায় কানছি। পরে হুজুর ঔষধের দোকান দিয়ে ব্যাথার ঔষধ আইনা দিছে। আর কইছে এই সপ্তাহে বাড়ি যাওন বন্ধ। যতদিন পায়খানার রাস্তার ঘাঁ শুকায়নি ততদিন তার পুরুষাঙ্গ মুখে দিয়ে করাইতো। আরও কয়েকজনের লগে এগুলো করছে। আমি দেখেছি। পরে তারাও এসে সুযোগ নিতে চাইতো।
আর যাইতে মন চায় না। তাই পড়ালেখা ছাইড়া দিছি। এহন কাম কাইজ করি।
রিফাত আর কিছু বলতে পারেনি। একটি শিশুর মুখ থেকে বের হওয়া কয়েকটি শব্দের পেছনে কখনো কখনো লুকিয়ে থাকে এমন এক অভিজ্ঞতা, যা সে হয়তো কাউকে বলতে পারেনি বহুদিন। ভয়, লজ্জা, সামাজিক চাপ কিংবা অভিযুক্ত ব্যক্তির প্রভাব সবকিছু মিলিয়ে শিশু অনেক সময় নীরব থাকে। কিন্তু শিশুর এই নীরবতা কখনোই সম্মতি হতে পারে না।
বাড়িতে বলতে ভয় পেয়েছিল
শিশুর ওপর যৌন নির্যাতনের ঘটনায় পরিবার অনেক সময় প্রথম প্রতিরোধের জায়গা হতে পারে। কিন্তু অনেক শিশু পরিবারের কাছেও বিষয়টি বলতে ভয় পায়। ঠিক যেমনটি পেয়েছিলো রিফাত। কখনো সে ভাবে তাকে বিশ্বাস করা হবে না। কখনো ভয় থাকে তাকে দোষ দেওয়া হবে। আবার কখনো প্রতিষ্ঠানের সম্মান বা সামাজিক প্রতিক্রিয়ার কথা ভেবে পরিবারও ঘটনাটি গোপন রাখে। রিফাতের বাবা পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে বলেন—
কোনো সুস্থ্য মস্তিষ্কের মানুষের দ্বারা কখনো সম্ভব এগুলো করা? ছেলেডারে হাফেজ বানানের জন্য মাদ্রাসায় দিছিলাম পড়তে। এইটুকু পোলা আমার। পোলাডারে আধমরা বানাইয়া তারপর নিয়ে আসলাম। ওয় কখনো কিছু কয়নাই। যেদিন প্রথম কইলো আমি ওরে ধমক দিছি। পরে ওয় একদিন আমারে পায়খানার রাস্তা দেখায়। তা দেখে আর সহ্য করার মতো ছিলো না। পরে ওরে আমরা মাদরাসা থেকে নিয়া আসি। আর কোনো মাদরাসায় দেইও নাই। পড়ালেখা বন্ধ। এখন আমার লগে কাজকাইম করে। মাইনষের ভয়ে কাউরে কিছু কইতেও পারিনাই। আপনেই কন, এগুলো কি কওনের মতো কিছু?
তার প্রশ্নের উত্তর আমার কাছে জানা ছিলো না। না আছে এই সভ্য সমাজের কাছে। তবে এই নীরবতার কারণ অনুসন্ধান করাও জরুরি। কারণ একটি শিশু নির্যাতনের শিকার হওয়ার পর যদি সাহায্য চাওয়ার পরিবর্তে আরও বেশি ভয় পায়, তাহলে সুরক্ষা ব্যবস্থার কোথাও না কোথাও ঘাটতি রয়েছে। ঘাটতি রয়েছে তাদের বোঝাপড়ার ক্ষেত্রেও।
নবাবগঞ্জ উপজেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী উপজেলায় রয়েছে একাধিক মাদরাসা। তবে অনেক মাদরাসা এই তালিকায় নেই। প্রশাসন বলছে ব্যাঙের ছাতার মতো এসব মদরাসা কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করে রুম ভাড়া করে গজিয়ে উঠছে। তবে কোনো প্রতিষ্ঠানের সরকারি তালিকায় থাকা মানেই সেখানে আবাসিক ব্যবস্থা রয়েছে এমন নয়। আবার আবাসিক ব্যবস্থা থাকলেই প্রতিষ্ঠানটি অনিরাপদ এমন সিদ্ধান্তেও পৌঁছানো যায় না। তবে কোনো অভিযোগ পেলে আমরা তা খতিয়ে দেখি। এর বাইরে প্রশাসনও কিছু করার ক্ষমতা রাখে না।
আমরা প্রশাসনের কাছে জানতে চাইলাম
কোন প্রতিষ্ঠানে আবাসিক ব্যবস্থা আছে? কত শিশু সেখানে থাকে? রাতে তাদের দায়িত্বে কে থাকেন?কর্মীদের পরিচয় ও অতীত যাচাই করা হয় কি না? শিশুর অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ব্যবস্থা আছে কি? নিয়মিত পরিদর্শন হয় কি?
কিছু কিছু প্রতিষ্ঠানের তথ্য থাকলেও অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের তথ্যই তাদের কাছে নেই। তাই এসব প্রশ্নের খোলাসা কোনো উত্তর তাদের কাছে নেই। এর প্রধান কারণ মাদ্রাসা করার বা পাঠদানের তেমন কোনো নিয়ম এখনো চালু হয়নি। যা প্রশাসনের আওতায় নেই বললেই চলে। তবে কোনো কোনো শিশু বা তার পরিবার অভিযোগ করার সাপেক্ষে পদক্ষেপ নিতে পারে বলে জানিয়েছেন।
অনুমোদনহীন প্রতিষ্ঠান: ঝুঁকি কোথায়?
নবাবগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় স্থানীয় উদ্যোগে ধর্মীয় শিক্ষাকেন্দ্র গড়ে ওঠে। কিছু প্রতিষ্ঠান সরকারি বা বোর্ডের স্বীকৃত কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত হয়, আবার কিছু প্রতিষ্ঠান স্থানীয়ভাবে ধর্মীয় শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে। কোনো প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন বা স্বীকৃতি না থাকলেই সেখানে শিশু নির্যাতন হয় এমন দাবি করার সুযোগ নেই। তবে আবাসিকভাবে শিশু রাখার ক্ষেত্রে প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ একটি শিশুকে পরিবারের কাছ থেকে দূরে রেখে রাতযাপন করানো হলে প্রতিষ্ঠানের ওপর বাড়তি দায়িত্ব তৈরি হয়। তবে প্রতিষ্ঠান কতৃপক্ষ বা যারা একজন শিশুকে শিক্ষিত করবে তারাই যদি অমানবিক নির্যাতন করে তাহলে শিশু কোথায় যাবে? রক্ষকই যখন ভক্ষক হয় তখন একটি শিশুর অসহায় হয়ে পড়ারই কথা।
শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজন
* দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের পরিচয় যাচাই
* পর্যাপ্ত তদারকি
* শিশু সুরক্ষা নীতিমালা
* নিরাপদ অভিযোগ ব্যবস্থা
* অভিভাবকের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ
* জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত ব্যবস্থা
* নিয়মিত সরকারি/প্রাতিষ্ঠানিক পরিদর্শন।
শুধু একটি ভবন, কয়েকজন শিক্ষক এবং ধর্মীয় পাঠ থাকলেই আবাসিক শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। এর জন্য অবশ্যই নিয়মিত ফলোআপ বা শিশুকে বলতে দেয়ার স্বাধীনতা থাকা দরকার।
একটি শিশু নির্যাতনের কথা বলতে চাইলেও তার সামনে থাকে অসংখ্য ভয়-ভীতি। একটি শিশু ভাবে! আমাকে বিশ্বাস করবে তো? আমাকেই কি দোষ দেবে? বাড়িতে জানলে কী হবে? প্রতিষ্ঠান থেকে আমাকে বের করে দেবে না তো? মানুষ কী বলবে? সহপাঠীদের সাথেও কি এসব হয়? তাদেরকে কি বলবো? এসব প্রশ্ন একটি শিশুকে নীরব করে দিতে পারে। আর এই নীরবতাই অনেক সময় নির্যাতনকারীর সবচেয়ে বড় ঢাল হয়ে দাঁড়ায়। তারা এরই ফায়দা নিয়ে শিশুদের সাথে পাশবিক নির্যাতন চালায়। করতে থাকে একের পর এক অন্যায়। পরবর্তীতে ঝরে পড়ে একটি শিশুর শৈশব।
শিশুর আচরণে হঠাৎ পরিবর্তন; অতিরিক্ত ভয়, নির্দিষ্ট কারও সামনে অস্বস্তি, প্রতিষ্ঠানে যেতে অনীহা, চুপচাপ হয়ে যাওয়া, ঘুমের সমস্যা বা হঠাৎ পড়াশোনায় অনাগ্রহ এসব লক্ষণকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। তবে এসব আচরণ দেখেই যৌন নির্যাতনের সিদ্ধান্তে পৌঁছানোও ঠিক নয়। সবার আগে শিশুকে নিরাপদ পরিবেশে কথা বলার সুযোগ দিতে হবে এবং প্রয়োজন হলে শিশু সুরক্ষা বিশেষজ্ঞ, চিকিৎসক, সমাজসেবা কর্মকর্তা বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তা নিতে হবে। একজন অভিভাবকে তার শিশুর সুরক্ষায় সবচেয়ে বেশি সচেতন থাকা জরুরি। শিশুর সাথে যতটা সম্ভব বেশি বেশি কথা বলা দরকার।
ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের বিশ্বাস দীর্ঘদিনের।মাদরাসায় সন্তানকে পাঠানো অভিভাবক যেমন বিশ্বাস করেন সন্তান ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা পাবে, তেমনি ধর্মীয় পরিবেশে পরিচালিত অন্য আবাসিক শিক্ষাকেন্দ্রেও অভিভাবকের প্রত্যাশা থাকে নিরাপদ পরিবেশ। সেই বিশ্বাসকে আরও শক্তিশালী করতে প্রয়োজন স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি। কোনো মাদরাসা বা মন্দিরকে শুধুমাত্র ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে সন্দেহ করা যেমন অন্যায়, তেমনি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আবেগকে ব্যবহার করে শিশু সুরক্ষার প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়াও গ্রহণযোগ্য নয়। শিশুর নিরাপত্তা কোনো ধর্মীয় বিতর্ক নয়। এটি একটি শিশুর অধিকার।
নীরবতার আরেক নাম সামাজিক লজ্জা। যৌন নির্যাতনের ঘটনায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় শিশুটি। যেমন হয়েছে শিশু রিফাত। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক প্রতিক্রিয়ার ভয়েও পরিবার নীরব থাকে। পরিবার ভাবে মানুষ কী বলবে? সন্তানের ভবিষ্যৎ নষ্ট হবে না তো? বিয়ে হবে কীভাবে? প্রতিষ্ঠানের সম্মান নষ্ট হবে। এই চিন্তাগুলো শিশুকে আরও একা করে দেয়। শিশুরা পড়ে একটা দোটানায়। অথচ অপরাধের দায় কি শিশুর? না! না! না! এই অপরাধের দায় কোনো শিশুর নয়। শিশুকে লজ্জা দেওয়া নয়, তাকে নিরাপদ করা প্রয়োজন। তাকে সাহস দেয়া প্রয়োজন। তাকে অভয় দেয়া প্রয়োজন।
বাংলাদেশে শিশুদের জন্য চাইল্ড হেল্পলাইন ১০৯৮ রয়েছে। শিশু নির্যাতন, সহিংসতা, শোষণসহ বিভিন্ন শিশু অধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় শিশু নিজে অথবা অন্য কেউ এই নম্বরে সহায়তা চাইতে পারে। এটা তার সম্পূর্ণ অধিকার। একটি শিশু যখন কাউকে বলতে ভয় পায়, তখন একটি হেল্পলাইন তার জন্য প্রথম নিরাপদ যোগাযোগের পথ হতে পারে। তবে শিশুরা সে পর্যন্ত কি আদৌও পৌঁছাতে পারে? প্রশ্ন কিন্তু থেকেই যায়। তাই শুধু হেল্পলাইন থাকলেই হবে না। শিশুকে জানতে হবে সে কোথায় সাহায্য চাইবে। অভিভাবককে জানতে হবে কীভাবে সন্তানের কথা শুনতে হবে। প্রতিষ্ঠানকে জানতে হবে অভিযোগ এলে কীভাবে শিশুকে সুরক্ষিত রাখতে হবে। এসব জানার মাধ্যমেই একটি শিশু অনেকাংশেই সুরক্ষিত থাকতে পারে।
এসব থেকে উত্তরণের পথ কোথায়? দেশের সকল আবাসিক মাদ্রাসা,মন্দির বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি সমন্বিত তালিকা করতে হবে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে সমানভাবে যাচাই করা প্রয়োজন-
১. প্রতিষ্ঠানের বৈধতা ও স্বীকৃতি
প্রতিষ্ঠানটি কোন কর্তৃপক্ষের অধীনে এবং তার শিক্ষাকার্যক্রমের অনুমোদন বা স্বীকৃতির অবস্থা কী? কি কি পাঠদান করাবেন।
২. আবাসিক ব্যবস্থার তথ্য
কতজন শিশু থাকে, তারা কোথায় ঘুমায় এবং রাতে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি কে? সে শিশুদের জন্য নিরাপদ কি না। সিসিটিভি ক্যামেরা আছে কি না।
৩. কর্মী যাচাই
শিক্ষক, কর্মচারী ও আবাসিক দায়িত্বশীলদের পরিচয় ও পূর্ববর্তী রেকর্ড যাচাই করা হয় কি না। তাছাড়া তাদের অবশ্যই নজরদারির আওতায় আনতে হবে।
৪. শিশু সুরক্ষা নীতিমালা
প্রতিষ্ঠানে লিখিত শিশু সুরক্ষানীতি বা শিশু হেফাজত নীতি আছে কি না। থাকলে তা পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
৫. অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা
শিশু যাতে ভয় ছাড়াই অভিযোগ করতে পারে, এমন স্বাধীন ও নিরাপদ ব্যবস্থা আছে কি না। যাকে অভিযোগ জানাবে সেও একই কাজে লিপ্ত কিনা।
৬. অভিভাবকের সঙ্গে যোগাযোগ
শিশু ঘন ঘন পরিবারের সঙ্গে কথা বলে এবং অভিভাবক নিয়মিত সন্তানকে দেখতে পারেন কি না। অভিভাবকদের সাথে সাক্ষাৎকারে কোনো বাধা আসে কি না। বা মাসে কতবার দেখা করতে পারে।
৭. সরকারি তদারকি
স্থানীয় প্রশাসন, শিক্ষা কর্তৃপক্ষ বা সংশ্লিষ্ট সংস্থা নিয়মিত প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করে কি না।
শিশুদের বলাৎকার: ইউনিসেফ কী বলছে?
শিশুর প্রতি বলাৎকার যৌন সহিংসতার গুরুতর একটি রূপ এবং এটি শিশুর অধিকার ও মর্যাদার লঙ্ঘন। ইউনিসেফের মতে, শিশুদের প্রতি যৌন সহিংসতা শুধু শারীরিক নির্যাতনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; অনাকাঙ্ক্ষিত যৌন স্পর্শ, জবরদস্তি এবং যৌন উদ্দেশ্যে শিশুকে শোষণ করাও এর অন্তর্ভুক্ত। এ ধরনের নির্যাতন শিশুর শারীরিক স্বাস্থ্যের পাশাপাশি মানসিক বিকাশ, আত্মবিশ্বাস ও সামাজিক সম্পর্কের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। ইউনিসেফের ২০২৪ সালের বৈশ্বিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে জীবিত আনুমানিক ৪১–৫৩ কোটি পুরুষ ও ছেলে শৈশবে কোনো না কোনো ধরনের যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে প্রায় ২৪–৩১ কোটি শৈশবে ধর্ষণ বা যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছ।
অপরদিকে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) মতে, বলাৎকারসহ যৌন নির্যাতন শিশুর শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি করতে পারে। এর ফলে উদ্বেগ, বিষণ্নতা, মানসিক আঘাত ও সামাজিক বিকাশে সমস্যা দেখা দিতে পারে। ডাব্লিউএইচও শিশুদের সুরক্ষায় সচেতনতা বৃদ্ধি, কার্যকর আইন প্রয়োগ, নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং নির্যাতনের শিকার শিশুকে চিকিৎসা ও মানসিক সহায়তা দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।
শিশুকে বলতে শেখাতে হবে এবং বড়দের শুনতে হবে। শিশু সুরক্ষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হলো সচেতনতা। শিশুকে তার শরীরের ব্যক্তিগত সীমা সম্পর্কে বয়স উপযোগী ধারণা দিতে হবে। কেউ ভয় দেখালে, গোপন রাখতে বললে, অস্বস্তিকরভাবে স্পর্শ করলে কিংবা কোনো আচরণে ভয় পেলে যেন সে নিরাপদ কোনো বড় মানুষকে বলতে পারে এই শিক্ষা পরিবার ও প্রতিষ্ঠান দু'জায়গাতেই দিতে হবে। নয়তো একটি শিশু কোনো কিছু ভয়বিহীন ভাবে কিছুই বলতে পারবে না। দিনের পর দিন ঘটতে থাকবে পাশবিক নির্যাতন। আর শিশুটি যখন কথা বলবে, তখন প্রথম প্রতিক্রিয়া হওয়া উচিত তুমি অপরাধী বা দোষী নও।
দরজার ওপারে যে শিশুটি আছে। তারও নিরাপদ ও নিশ্চিন্তে রাত কাটানোর কথা। অথচ রাত গভীর হলে আবাসিক মাদ্রাসায় থাকা একটি কক্ষে হয়তো একটি শিশু মায়ের কথা মনে করে। হয়তো সে বাড়ি যেতে চায়। হয়তো তার মনে কোনো ভয় জমে আছে। চুপসে আছে বিছানার এক কোনে। হয়তো সে কাউকে কিছু বলতে চায়। কিন্তু সাহস পাচ্ছে না। মনে মনে ভাবছে রাত না হলেই ভালো। রাতের অন্ধকার তার জীবন পিষে নিচ্ছে। আমরা জানি না সেই শিশুটি কে। হয়তো রিফাতের মতোই কেউ। তবে জানা দরকারও নেই। কেননা তার নাম জানার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। তার ছবি প্রকাশ করার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো তার পাশে দাঁড়ানো। তার পরিচয় খুঁজে বের করার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো তার কথা নিরাপদে শোনা। কারণ একটি শিশুর ওপর নির্যাতন শুধু একটি ঘটনার নাম নয়। এটি তার শৈশব, বিশ্বাস এবং নিরাপত্তাবোধে আঘাত। বড় হয়ে এই শিশু কখনোই নিজেকে ক্ষমা করতে পারবে না। পারবেনা পরিবার, শিক্ষক বা এসব কাজে জড়িত কাউকেই।
ধর্মীয় শিক্ষা শিশুকে শিক্ষিত ও নৈতিকতা শেখানোর কথা। বানানোর কথা একজন হাফেজ কিংবা আলেম অথবা পন্ডিত বা পুরোহিত। সেই নৈতিকতার প্রথম শর্তই হোক শিশুর প্রতি কোনো নির্যাতন নয়। মাদরাসা , মন্দির ,স্কুল কিংবা অন্য কোনো আবাসিক প্রতিষ্ঠান যাই হোক। শিশুর জন্য প্রতিটি দরজা নিরাপদ হতে হবে। শিশুর প্রতিটি রাত ভয়হীন হতে হবে। কারণ কোনো প্রতিষ্ঠানের সুনাম, কোনো সামাজিক সম্মান বা কোনো ধর্মীয় পরিচয় একটি শিশুর নিরাপত্তার চেয়ে বড় হতে পারে না। তাই শিশু সুরক্ষায় আমাদের পদক্ষেপ নিতে হবে আরও জোড়ালো ও শক্তিশালী। তবেই বলাৎকার ও শিশু সহিংসতা থেকে রক্ষা পাবে আজকের শিশু।
আমাদের মনে রাখা দরকার। বলাৎকার প্রতিরোধে নীরবতা নয়, প্রয়োজন সম্মিলিত প্রতিরোধ। শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও সমাজের প্রতিটি স্তরে সচেতনতা বাড়াতে হবে। শিশুদের শরীরের ব্যক্তিগত সীমানা, অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শ এবং বিপদে বিশ্বস্ত ব্যক্তির সাহায্য চাওয়ার শিক্ষা দিতে হবে। অভিযোগ জানালে শিশুকে দোষারোপ বা লজ্জিত না করে তার কথা গুরুত্বসহকারে শুনতে হবে। ভুক্তভোগীর পরিচয় গোপন রেখে দ্রুত চিকিৎসা, মানসিক সহায়তা ও আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি। অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং অপরাধীর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। সর্বোপরি, শিশুবান্ধব অভিযোগব্যবস্থা, নিয়মিত তদারকি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করেই গড়ে তুলতে হবে শিশুর জন্য নিরাপদ পরিবেশ।
Comments