দ্বিতীয় দিনে তিন জাহাজে সেন্টমার্টিন যাচ্ছেন দেড় হাজারের বেশি পর্যটক
অনুমোদনসংক্রান্ত জটিলতা কাটিয়ে চলতি মৌসুমে কক্সবাজার-সেন্টমার্টিন রুটে জাহাজ চলাচল শুরু হয়েছে। দ্বিতীয় দিনে এই রুটে যুক্ত হয়েছে আরও দুটি জাহাজ। এমভি বারো আউলিয়ার পাশাপাশি শুক্রবার (৬ নভেম্বর) থেকে চলাচল শুরু করেছে এমভি কর্ণফুলী ও এমভি টেকনাফ। তিনটি জাহাজে করে এদিন দেড় হাজারের বেশি পর্যটক সেন্টমার্টিনের উদ্দেশে রওনা হয়েছেন।
সকালে কক্সবাজার শহরের নুনিয়ারছড়া ঘাট থেকে প্রথমবারের মতো যাত্রা শুরু করে এমভি কর্ণফুলী ও এমভি টেকনাফ। এর আগে বৃহস্পতিবার ৮৩৬ জন পর্যটক নিয়ে সেন্টমার্টিনের উদ্দেশে ছেড়ে যাওয়া এমভি বারো আউলিয়া রাতেই কক্সবাজারে ফিরে আসে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার তিনটি জাহাজে মোট ১ হাজার ৫৫৪ জন পর্যটক দ্বীপটির উদ্দেশে যাত্রা করেছেন। এর মধ্যে এমভি বারো আউলিয়ায় ৬১৯ জন, এমভি কর্ণফুলীতে ৩৮৭ জন এবং এমভি টেকনাফে ৫৪৮ জন পর্যটক রয়েছেন। দুপুরের মধ্যে তাদের সেন্টমার্টিনে পৌঁছানোর কথা।
সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, গত ১ নভেম্বর থেকে পর্যটকদের জন্য সেন্টমার্টিন ভ্রমণের সুযোগ চালু হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু প্রশাসনিক অনুমোদন, নৌযান চলাচলের ছাড়পত্র এবং পরিবেশগত শর্ত পূরণ নিয়ে জটিলতার কারণে নির্ধারিত সময়ে জাহাজ চলাচল শুরু করা সম্ভব হয়নি।
সি ক্রুজ অপারেটর ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (স্কোয়াব) সাধারণ সম্পাদক হোসাইন ইসলাম বাহাদুর জানান, আগামী বছরের ১৫ মার্চ পর্যন্ত অনুমোদিত তিনটি জাহাজ নিয়মিত চলাচল করবে। এসব জাহাজে একসঙ্গে প্রায় ২ হাজার ৩০০ যাত্রী পরিবহনের সক্ষমতা রয়েছে। তবে প্রতিদিন সাড়ে ৩ হাজার পর্যটক যাওয়ার অনুমতি থাকায় প্রয়োজনে জাহাজের সংখ্যা বাড়ানো হতে পারে।
এদিকে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নুনিয়ারছড়া ঘাটে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে জেলা প্রশাসন, বিআইডব্লিউটিএ, পুলিশ ও কোস্টগার্ডসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
সমুদ্রপথে দ্বীপ ভ্রমণের সুযোগ পেয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন পর্যটকেরা। পাশাপাশি সরকারি নির্দেশনা মেনে দ্বীপের পরিবেশ রক্ষায় সহযোগিতার আশ্বাসও দিয়েছেন তারা।
চট্টগ্রাম থেকে আসা পর্যটক আল মাহমুদ বলেন, সেন্টমার্টিন দেশের গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রাকৃতিক সম্পদ। সেখানে ঘুরতে যাওয়া প্রত্যেক পর্যটকেরই দ্বীপটির পরিবেশ সংরক্ষণে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করা উচিত।
তবে ভ্রমণের আনন্দের পাশাপাশি জাহাজের টিকিটের দাম নিয়ে অসন্তোষও রয়েছে অনেকের। ঢাকার উত্তরার বাসিন্দা মোহাম্মদ আব্দুল্লাহর মতে, টিকিটের মূল্য তুলনামূলক বেশি। সাধারণ পর্যটকদের সামর্থ্য বিবেচনায় ভাড়া নির্ধারণ করা হলে আরও বেশি মানুষ ভ্রমণের সুযোগ পেতেন। এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষের পুনর্বিবেচনা চান তিনি।
এবার সেন্টমার্টিন ভ্রমণে পর্যটকদের জন্য বেশ কিছু নিয়ম বাধ্যতামূলক করেছে সরকার। প্রতিজন পর্যটককে দিতে হবে ১০০ টাকা পরিবেশ সংরক্ষণ ফি। পাশাপাশি দ্বীপে প্রবেশের জন্য সংগ্রহ করতে হবে ট্রাভেল পাস ও কিউআর কোডযুক্ত টিকিট।
পর্যটকদের যাতায়াতের তথ্য সংরক্ষণ, দ্বীপে মানুষের চাপ নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবেশ সংরক্ষণ কার্যক্রম জোরদার করতেই এসব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
পর্যটকদের জন্য দ্বীপে প্রবেশের সুযোগ চালু হলেও পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় বেশ কিছু বিধিনিষেধ বহাল রয়েছে। বিশেষ করে রাতের সময় পর্যটকদের কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে রয়েছে কড়াকড়ি।
নির্দেশনা অনুযায়ী, রাতে সৈকত ও আশপাশের এলাকায় আলো জ্বালানো, উচ্চ শব্দ করা কিংবা বারবিকিউ পার্টির আয়োজন করা যাবে না। কেয়াবনে প্রবেশ, কেয়া ফল সংগ্রহ ও কেনাবেচাও নিষিদ্ধ।
এ ছাড়া সামুদ্রিক কাছিম, পাখি, প্রবাল, শামুক, ঝিনুক, তারামাছ, রাজকাঁকড়া, সামুদ্রিক ঘাস ও শৈবালসহ দ্বীপের কোনো প্রাকৃতিক সম্পদ বা জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি করা যাবে না। সৈকতে মোটরসাইকেল, সি-বাইকসহ সব ধরনের যানবাহন চলাচলেও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, আয়তনে ছোট ও পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল হওয়ায় সেন্টমার্টিনে পর্যটকের চাপ নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। পর্যটক বাড়লে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পানির ব্যবহার, জ্বালানি ও শব্দদূষণের পাশাপাশি সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তাই শুধু পর্যটকদের প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ নয়, পরিবেশবিধি কার্যকর করা এবং নিয়মিত নজরদারিও নিশ্চিত করতে হবে।
Comments