মোহাম্মদ বিন সালমানের কি সময় ফুরিয়ে আসছে?
'আল-মুকাদ্দিমা' গ্রন্থে চতুর্দশ শতাব্দীর ইতিহাসবিদ ইবনে খালদুন লিখেছিলেন, "মহান রাজবংশগুলো প্রায়ই তিন প্রজন্মের পর পতনের দিকে এগিয়ে যায়, কারণ তারা যোগ্য উত্তরসূরি তৈরি করতে ব্যর্থ হয়।" ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের শাসনামলে সৌদি আরব এখন ঠিক এই প্রশ্নের মুখোমুখি: যে রাজবংশকে আরও শক্তিশালী ও সুসংহত করার দায়িত্ব তাঁর ওপর ছিল, তিনি কি সেই রাজবংশকেই দুর্বল করে দিয়েছেন?
অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক—উভয় দিক থেকেই রাজ্যটি ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে রয়েছে। প্রিন্স মোহাম্মদের গুরুত্বপূর্ণ নীতি ও কৌশলগত বাজিগুলো একের পর এক ব্যর্থ হচ্ছে। তাঁর ধারণা ছিল, তিনি হুতিদের পরাজিত করে প্রতিবেশী ইয়েমেনে একটি অনুগত পুতুল সরকার প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন; সৌদি অর্থনীতিকে রূপান্তরিত করে তেলের ওপর নির্ভরতা কমাতে পারবেন; এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন যুক্তরাষ্ট্রকে নির্ভরযোগ্য মিত্র হিসেবে পাশে পাবেন।
কিন্তু এই তিনটি হিসাবই এখন একসঙ্গে ভুল প্রমাণিত হচ্ছে।
অনেকেই এখন মনে করছেন, সামনে এগोनোর সর্বোত্তম পথ হলো ক্ষমতা হস্তান্তর করা, প্রিন্স মোহাম্মদের পরিবর্তে একজন উপযুক্ত উত্তরসূরি নিয়োগ করা, দেশের কূটনীতি ও অর্থনৈতিক নীতিতে আমূল পরিবর্তন আনা এবং দীর্ঘদিনের প্রয়োজনীয় গণতান্ত্রিক সংস্কার বাস্তবায়ন করা। তা না হলে সৌদি আরব ভেঙে প্রতিদ্বন্দ্বী রাজপুত্রদের নিয়ন্ত্রণাধীন ছোট ছোট রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারে এবং বর্তমান সৌদি রাষ্ট্রব্যবস্থার অবসান ঘটতে পারে।
রাজ্যটির বিপুল তেল ও খনিজ সম্পদের প্রতি লোভ রয়েছে এমন বহিরাগত শক্তিগুলো দেশটিকে খণ্ডবিখণ্ড করতে দ্বিধা করবে না। এসব সম্পদের মধ্যে রয়েছে আনুমানিক ১১ কোটি ৪০ লাখ টন বিরল খনিজ ও ইউরেনিয়ামযুক্ত আকরিক, পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ জীবাশ্ম জ্বালানি।
ইরানে নিজেদের লক্ষ্য অর্জনে এখন পর্যন্ত ব্যর্থ হওয়ার পর সৌদি আরব পরবর্তী লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে—এমনকি তুলনামূলক সহজ লক্ষ্যও হতে পারে। ইয়েমেনের হুতিদের বিরুদ্ধে প্রিন্স মোহাম্মদকে সমর্থন দিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও পশ্চিমা শক্তিগুলোর অনীহা এই ধারণাকে আরও জোরালো করেছে।
ক্ষমতায় আসার পর থেকে প্রিন্স মোহাম্মদ যুক্তির বিচারে সৌদি আরবের উপকারের চেয়ে ক্ষতিই বেশি করেছেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তাঁর অসংখ্য শত্রু তৈরি হয়েছে, অথচ তিনি দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেননি। সৌদি আরব বছরে প্রায় ৮ হাজার ৩০০ কোটি মার্কিন ডলার প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় করে, যা দেশটির জিডিপির প্রায় ৬.৫ শতাংশ এবং বিশ্বের মোট সামরিক ব্যয়ের প্রায় ৩ শতাংশের সমান।
রিয়াদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ১০ অক্টোবর হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অন্তত ১৩ জন নিহত হওয়ার ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছে, সৌদি আরব কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এই হামলার ফলে আন্তর্জাতিক ভ্রমণকারীদের কাছেও দেশটি অনিরাপদ হয়ে পড়েছে।
২০১৫ সালে, যখন প্রিন্স মোহাম্মদ প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন, তখন সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা ব্যয় জিডিপির ১৩ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছিল। ওই বছর তিনি সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) সঙ্গে সমন্বয় করে ইয়েمেনে সামরিক অভিযান শুরু করেন। সেই সংঘাত আট বছর ধরে চলে। বোমাবর্ষণ ও অবরোধের ফলে খাদ্য ও ওষুধের তীব্র সংকট দেখা দেয় এবং প্রায় সাত লাখ ইয়েমেনির মৃত্যু হয়।
সৌদি রাজতন্ত্র প্রতিরক্ষা খাতে প্রায় ২০০ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে। তা সত্ত্বেও, এমন এক প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করতে পারেনি, যাকে তারা তুলনামূলক দুর্বল বলে বিবেচনা করে এবং যার সামরিক বাজেট আনুমানিক ৬০০ থেকে ৭০০ কোটি ডলারেরও কম বলে ধারণা করা হয়। সমালোচকদের বক্তব্য, এর কারণ হলো সামরিক ব্যয়ের একটি বড় অংশ দেশের বহিঃশত্রুর বিরুদ্ধে জাতীয় নিরাপত্তা জোরদার করার পরিবর্তে ক্রাউন প্রিন্সের শাসন টিকিয়ে রাখা ও শক্তিশালী করার পেছনে ব্যয় হয়েছে।
প্রিন্স মোহাম্মদ তাঁর উচ্চাভিলাষী অর্থনৈতিক পরিকল্পনাগুলোর পেছনেও রাজকোষের বিপুল অর্থ অপচয় করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, জীবাশ্ম জ্বালানি রপ্তানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সৌদি অর্থনীতিকে বহুমুখী করার লক্ষ্যে নেওয়া তাঁর অস্পষ্ট ও উচ্চাভিলাষী 'ভিশন ২০৩০' পরিকল্পনার প্রচার-প্রসারে পরামর্শক প্রতিষ্ঠানগুলোর পেছনে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয় করা হয়েছে।
সমালোচক সাংবাদিক জামাল খাশোগি, যিনি ইস্তাম্বুলে নিহত ও টুকরো টুকরো করে হত্যার শিকার হয়েছিলেন, তাঁর প্রতিবেদন ও মন্তব্যে সতর্ক করেছিলেন যে এসব বিশাল উন্নয়ন প্রকল্প ব্যর্থ হলে সৌদি আরব এই অঞ্চলের অন্যতম দরিদ্র দেশে পরিণত হতে পারে।
এদিকে, ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল (ডব্লিউএসজে) জানিয়েছে, ফাঁস হওয়া একটি নিরীক্ষা প্রতিবেদনে সৌদি আরবের তাবুক প্রদেশে ২০১৭ সালে শুরু হওয়া বিশাল স্মার্ট-অঞ্চল প্রকল্প 'নিওম' কার্যত দেউলিয়া হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
১৭০ কিলোমিটার দীর্ঘ পরিকল্পিত নগরী 'দ্য লাইন' বন্ধ করে দিতে সৌদি আরবের ১৬ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত ব্যয় হতে পারে। ২০৩০ সালের ওয়ার্ল্ড এক্সপো এবং ২০৩৪ সালের বিশ্বকাপের অবকাঠামো নির্মাণে অর্থ সরিয়ে নেওয়ায় প্রকল্পটির পরিসর ইতিমধ্যে সংকুচিত করা হয়েছে।
এদিকে, ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধ এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হরমুজ প্রণালির অবরোধ সৌদি আরবকে বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। একইভাবে, বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে পরবর্তী অবরোধ এবং হুতি ও ইরাকি মিলিশিয়াদের সৌদি আরবের পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইনে হামলার ফলে দেশটির তেল রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হয়েছে এবং আয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উৎসটি ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) আগে ২০২৬ সালে সৌদি অর্থনীতির ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছিল। কিন্তু এখন অর্থনীতিটি ৩.৩ শতাংশ সংকুচিত হওয়ার পথে রয়েছে।
ডব্লিউএসজির আরেকটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিভিন্ন নিরাপত্তা হুমকির মুখে প্রিন্স মোহাম্মদ প্রায়ই এক প্রাসাদ থেকে অন্য প্রাসাদে এবং বিভিন্ন বাংকারে অবস্থান পরিবর্তন করেন। ধারণা করা হচ্ছে, ড্রোন থেকে চালানো সম্ভাব্য হত্যাচেষ্টা এড়াতেই তিনি এমনটি করছেন। হুতিরা এখনো তাঁর অবস্থান শনাক্ত করতে পারেনি, তবে অভ্যন্তরীণ শত্রু ও রাজপরিবারের প্রতিদ্বন্দ্বী সদস্যরা তা করতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজাকে হত্যা করার নজির সৌদি আরবের ইতিহাসে রয়েছে। সৌদ রাজপরিবারের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শাসক হিসেবে বিবেচিত বাদশাহ ফয়সাল নিজের পরিবারেরই এক সদস্যের হাতে নিহত হয়েছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, বিদেশি শক্তির প্ররোচনায় এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছিল।
প্রথাগতভাবে সৌদ রাজপরিবারে ক্ষমতা পিতার কাছ থেকে সরাসরি পুত্রের হাতে না গিয়ে অনুভূমিকভাবে—প্রতিষ্ঠাতা ইবনে সৌদের এক ভাইয়ের কাছ থেকে অন্য ভাইয়ের হাতে—হস্তান্তরিত হতো। কিন্তু ২০১৭ সালে নিজের পিতার সমর্থনে ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ এই প্রথা ভেঙে দেন। তিনি তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও মনোনীত উত্তরসূরি মোহাম্মদ বিন নায়েফকে ক্ষমতার পথ থেকে সরিয়ে দেন। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রাসাদে কার্যত এক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা হারানোর পর থেকে বিন নায়েফ এখনো গৃহবন্দি রয়েছেন।
প্রিন্স মোহাম্মদের সমালোচকেরা এই পদক্ষেপকে ক্ষমতা কুক্ষিগত করার নির্লজ্জ প্রচেষ্টা হিসেবে দেখেছিলেন। অনেকের ধারণা, যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন, এমনকি প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা ছাড়া এই ঘটনা ঘটানো সম্ভব হতো না।
(পরিহাসের বিষয় হলো, আটক রাজপুত্রদের বিরুদ্ধেই বিন সালমান বিদেশি শক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করে অভ্যুত্থান ঘটানোর ষড়যন্ত্রের অভিযোগ এনেছিলেন।) বিনিময়ে ক্রাউন প্রিন্স ওয়াশিংটনকে কী প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তা এখনো অজানা। তবে ওয়াশিংটন সাধারণত বিনিময়ে কিছু না পেয়ে এমন সুবিধা দেয় না।
তবে এটাও সত্য যে, ২০২১ সালে প্রিন্স মোহাম্মদ আরও বাস্তববাদী নীতি গ্রহণের কিছু ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। তিনি কাতারের ওপর থেকে অবরোধ প্রত্যাহার করেন এবং হুতিদের সঙ্গে সমঝোতার উদ্যোগ নেন। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের ইসরায়েল আক্রমণ ও তার পরবর্তী গাজা যুদ্ধ শুরুর আগে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় একটি চুক্তির সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছিল। সেই চুক্তি হলে সৌদি আরব ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দিতে পারত।
কিন্তু ইরানকে ঘিরে চলমান যুদ্ধের আগুনের মধ্যে এখন আর এমন কোনো চুক্তি নিয়ে আলোচনা শোনা যাচ্ছে না।
'ভিশন ২০৩০'-এর লক্ষ্য ছিল সৌদি আরবকে তেলের ওপর নির্ভরতা থেকে মুক্ত করা। অথচ প্রিন্স মোহাম্মদের কর্মকাণ্ড দেশের অর্থনৈতিক বোঝা ও উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে, তেল আয়ের ওপর নির্ভরতা বাড়িয়েছে এবং জাতীয় নিরাপত্তাকে দুর্বল করেছে। একসময় বিশ্বের অন্যতম ধনী দেশ হিসেবে পরিচিত সৌদি আরব এখন স্পষ্টতই—এমনকি দ্রুতগতিতেও—অবনতির দিকে এগোচ্ছে। ক্রাউন প্রিন্স দেশটিকে আরও গভীর ঋণের মধ্যে ঠেলে দিচ্ছেন।
বর্তমানে হুতিদের হামলায় সৌদি আরব যখন নজিরবিহীন আক্রমণের মুখে, তখন কোনো ইউরোপীয় বা আমেরিকান দেশই এগিয়ে এসে দেশটিকে সহায়তা করার প্রস্তাব দিচ্ছে না। এখন পর্যন্ত কেবল অন্যান্য মুসলিম দেশই এগিয়ে এসেছে। তবে ভিন্ন ভিন্ন স্বার্থ ও উদ্দেশ্য দ্বারা পরিচালিত এসব দেশ শেষ পর্যন্ত একে অপরের বিরুদ্ধে সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে। এর ফলে একটি সম্ভাব্য 'বৃহত্তর ইসরায়েল' গঠনের পথ আরও প্রশস্ত হতে পারে।
সৌদি নাগরিকদের প্রায় ৬৫ শতাংশের বয়স ২৭ বছরের নিচে বলে জানা যায়। তাঁদের এখন প্রিন্স মোহাম্মদের 'স্বাধীনতা' ও 'আধুনিকায়ন' নিয়ে মিষ্টি কথার বাইরে গিয়ে প্রশ্ন তোলা উচিত: তাঁর নীতিগুলো আসলে কার স্বার্থ রক্ষা করছে—রাজপুত্রের, নাকি জনগণের?
সৌদি আরব এর আগে কখনোই একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ ভাঙনের এত স্পষ্ট ঝুঁকি এবং বাইরের শক্তির এত প্রবল চাপের মুখে পড়েনি।
-এশিয়া টাইমস থেকে
Comments