মঙ্গলের উপগ্রহ থেকে পাথর আনতে জাপানের ঐতিহাসিক অভিযান
মহাকাশ গবেষণায় নতুন ইতিহাস গড়তে মঙ্গলের ছোট উপগ্রহ 'ফোবোস' থেকে মাটি ও পাথরের নমুনা সংগ্রহ করে পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনার উচ্চাভিলাষী ও ঐতিহাসিক অভিযান শুরু করেছে জাপান। বিজ্ঞানীদের প্রত্যাশা, এই অভিযানের সংগৃহীত নমুনা সৌরজগতের সৃষ্টি এবং পৃথিবীতে প্রাণের উৎপত্তি রহস্য উন্মোচনে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র এনে দেবে।
জাপানের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা 'জাক্সা' জানিয়েছে, দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের তানেগাশিমা দ্বীপ থেকে স্থানীয় সময় ভোরে এইচ-৩ (H-3) রকেটের মাধ্যমে 'মার্শিয়ান মুনস এক্সপ্লোরেশন' নামের এই মহাকাশযানটি সফলভাবে উৎক্ষেপণ করা হয়েছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, মহাকাশযানটি আগামী বছরের আগস্টে মঙ্গলের কক্ষপথে পৌঁছাবে। এরপর মঙ্গলের দুটি ছোট ও আলুর আকৃতির উপগ্রহের একটি—ফোবোসের পৃষ্ঠ থেকে অন্তত ১০ গ্রাম মাটি ও পাথরের নমুনা সংগ্রহ করবে এটি। দীর্ঘ এই ভ্রমণ শেষে সব ঠিকঠাক থাকলে ২০৩১ সালে নমুনা নিয়ে মহাকাশযানটির পৃথিবীতে ফিরে আসার কথা রয়েছে।
প্রায় ২২.৫ কিলোমিটার ব্যাসের এবং গর্তযুক্ত ফোবোস মঙ্গলের পৃষ্ঠ থেকে প্রায় ছয় হাজার কিলোমিটার ওপর থেকে দিনে তিনবার গ্রহটিকে প্রদক্ষিণ করে।
স্থানীয় সময় ভোর ৪টা ৪১ মিনিটে তানেগাশিমা মহাকাশ কেন্দ্র থেকে যখন এইচ-৩ রকেটটি অন্ধকার আকাশে ডানা মেলে, তখন উৎক্ষেপণের সরাসরি সম্প্রচার দেখতে হাজারো মানুষ গভীর রাতেও জেগেছিলেন। প্রায় এক ঘণ্টা পর মহাকাশযানটি রকেটের ওপরের ধাপ থেকে সফলভাবে বিচ্ছিন্ন হলে জাক্সার বিজ্ঞানীরা উল্লাস প্রকাশ করেন এবং অভিযান সফলভাবে শুরুর ঘোষণা দেন।
গত অর্ধশতকে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা মঙ্গলে নয়টি মহাকাশযান অবতরণ করালেও এবং চীন ২০২১ সালে মঙ্গলের পৃষ্ঠে সফল অবতরণ করলেও, মঙ্গলের ছোট উপগ্রহ ফোবোস বা ডেইমোসে অবতরণের চেষ্টা এবারই প্রথম। পাঁচটি মহাকাশ সংস্থার যৌথ প্রচেষ্টায় পাঁচ বছর মেয়াদি এই অভিযানে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার পাশাপাশি ফ্রান্স ও জার্মানিও যুক্ত রয়েছে।
প্রায় ৫৭ কোটি ৮০ লাখ ডলার ব্যয়ে নির্মিত পাঁচ টন ওজনের এই মহাকাশযানটি মঙ্গলের কক্ষপথে পৌঁছে ফোবোসের কক্ষপথের সঙ্গে নিজের অবস্থান সমন্বয় করবে। এরপর মহাকাশযানটি থেকে ফরাসি-জার্মান সহযোগিতায় তৈরি ছোট রোভার 'ইডেফিক্স' বিচ্ছিন্ন করা হবে। বিখ্যাত কমিকস 'অ্যাস্টেরিক্স'-এর একটি সাদা টেরিয়ার চরিত্রের নামানুসারে রোভারটির এই নামকরণ করা হয়েছে।
ফোবোসের মাধ্যাকর্ষণ পৃথিবীর মাত্র এক হাজার ভাগের এক ভাগ হওয়ায় চার চাকার এই রোভারটি উপগ্রহের পৃষ্ঠে কয়েক মিনিট লাফিয়ে লাফিয়ে এগিয়ে একসময় থামবে। এরপর প্রায় ১০০ দিন ধরে পৃষ্ঠ পর্যবেক্ষণ করবে এটি। মূল মহাকাশযানের অবতরণের জন্য নিরাপদ স্থান ও নমুনা সংগ্রহের উপযুক্ত জায়গা খুঁজে বের করাই হবে এর প্রধান কাজ।
অন্যদিকে, মূল মহাকাশযানের চার পা-যুক্ত স্থির অবতরণযানটি ফোবোসে মাত্র দুই ঘণ্টা অবস্থান করবে। এই সংক্ষিপ্ত সময়ে খননযন্ত্র ও শোষণপ্রযুক্তি ব্যবহার করে মাটি ও পাথর সংগ্রহ করে ফের মহাকাশে ফিরে যাবে সেটি। তা ছাড়া মঙ্গলের কক্ষপথ ছাড়ার আগে মহাকাশযানটি একাধিকবার দ্বিতীয় উপগ্রহ 'ডেইমোস'-এর পাশ দিয়ে উড়ে সেটিকেও পর্যবেক্ষণ করবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩০ সালের নভেম্বরে এটি মঙ্গলের কক্ষপথ ত্যাগ করবে।
জার্মান মহাকাশ সংস্থার রোভারবিষয়ক প্রধান মার্কুস গ্রেবেনস্টাইন এই অভিযানকে 'জীবনে একবারই আসার মতো সুযোগ' হিসেবে অভিহিত করেছেন।
বিজ্ঞানীদের ধারণা, সংগৃহীত নমুনা বিশ্লেষণ করে ফোবোস ও ডেইমোস কীভাবে সৃষ্টি হয়েছিল, তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। উপগ্রহ দুটির উৎপত্তি নিয়ে প্রধানত দুটি তত্ত্ব রয়েছে—প্রথমত, 'বৃহৎ সংঘর্ষ' তত্ত্ব, যার মতে কোনো মহাজাগতিক বস্তু মঙ্গলে আঘাত হানার পর ছিটকে যাওয়া পদার্থ থেকেই উপগ্রহ দুটির সৃষ্টি হয়েছে। দ্বিতীয়ত, 'মহাকর্ষে বন্দি' হওয়ার তত্ত্ব, অর্থাৎ উপগ্রহ দুটি মূলত মহাকর্ষের টানে আটকা পড়া গ্রহাণু। জাক্সার মতে, কোন তত্ত্বটি সঠিক তা জানা গেলে পৃথিবীসহ সূর্যের কাছের পাথুরে গ্রহগুলোতে প্রাণের উপযোগী পরিবেশের সৃষ্টি কীভাবে হয়েছিল, সে সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।
নাসার মতে, এই অভিযানের ফলাফল ভবিষ্যতের মঙ্গল অভিযান এবং মানুষ পাঠানোর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাতেও সহায়ক হবে।
এদিকে মঙ্গলপৃষ্ঠ থেকে পাথরের নমুনা পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যেও তীব্র প্রতিযোগিতা চলছে। নাসার 'পারসিভিয়ারেন্স' রোভার দীর্ঘদিন ধরে মঙ্গল থেকে নমুনা সংগ্রহ করে রাখলেও মার্কিন রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কারণে তা ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া বর্তমানে স্থগিত রয়েছে। অন্যদিকে, চীনের 'তিয়ানওয়েন-৩' মহাকাশযান ২০২৮ সালের দিকে উৎক্ষেপণের পরিকল্পনা রয়েছে, যার মাধ্যমে ২০৩১ সালের মধ্যেই মঙ্গলের নমুনা পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হতে পারে। ফলে জাপানের উপগ্রহ অভিযান পৃথিবীতে ফেরার আগেই চীনের মঙ্গল অভিযান নমুনা নিয়ে ফিরে আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
Comments