সরকারকে নয়, এবার ১৮ কোটি মানুষকে সহযোগিতা করব: জামায়াত আমির
সরকারের পতন নয়, বরং সরকার সফল হোক এমনটাই চেয়েছিল বিরোধী দল। তবে সরকার বিরোধীদের কাছ থেকে সহযোগিতা নিতে ব্যর্থ হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, এত দিন সরকারকে সহযোগিতার কথা বললেও এখন তাঁরা দেশের ১৮ কোটি মানুষের পাশে দাঁড়াবেন।
রোববার (১৮ অক্টোবর) দুপুরে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির শফিকুল কবির মিলনায়তনে এক মুক্ত আলোচনা সভায় এসব কথা বলেন তিনি। 'জুলাই সনদের এক বছর: প্রতিশ্রুতি ও প্রত্যাশার সালতামামি' শীর্ষক এ সভার আয়োজন করে আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি)।
শফিকুর রহমান অভিযোগ করেন, ৫ আগস্ট দুপুরের আগপর্যন্ত বিএনপি নির্যাতিত অবস্থানে ছিল। কিন্তু নির্বাচনের পর শপথ গ্রহণের দিন থেকেই দলটি জাতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা ও ষড়যন্ত্রে জড়িয়েছে। তাঁর দাবি, সেই প্রবণতা এখনো অব্যাহত রয়েছে।
বিএনপি বিরোধী দলের আন্দোলন নিয়ে প্রশ্ন তুলছে উল্লেখ করে জামায়াত আমির বলেন, জনগণের দেওয়া ভোটের যথাযথ মূল্যায়ন করা হলে বিরোধী দলকে সংসদের বাইরে আন্দোলনে যেতে হতো না। বরং সরকারের কর্মকাণ্ডই তাদের আন্দোলনের পথে ঠেলে দিয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
পিএসসি কোনো মন্ত্রীর পারিবারিক প্রতিষ্ঠান নয়
সরকার সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে হস্তক্ষেপ করছে বলে অভিযোগ করেন শফিকুর রহমান। তাঁর দাবি, মেধার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করেছিলেন। কিন্তু একের পর এক প্রতিষ্ঠানের পর এবার সরকারি কর্ম কমিশনকে (পিএসসি) প্রভাবিত করার চেষ্টা চলছে।
কয়েকজন মন্ত্রী পিএসসির সদস্যদের ডেকে পদত্যাগ করতে বলছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি। শফিকুর রহমান বলেন, পিএসসি একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান; এটি কোনো মন্ত্রীর পারিবারিক প্রতিষ্ঠান বা ব্যবসা নয়। সেখানে দলীয় লোক নিয়োগের উদ্দেশ্যে এমন পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
চিফ হুইপের সাম্প্রতিক বক্তব্যের সমালোচনা করে জামায়াত আমির বলেন, রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অর্থ জনগণের অর্থ, কোনো রাজনৈতিক দলের তহবিলের টাকা নয়। তাই এ অর্থ নিয়ে বক্তব্য দেওয়ার ক্ষেত্রে দায়িত্বশীলতা থাকা প্রয়োজন।
সরকারি দলের সংসদ সদস্যদের ২০৮টি আসনে বিশেষ বরাদ্দ দেওয়া হলেও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের তা দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, এ ধরনের রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তনের প্রত্যাশাতেই ২০২৪ সালে গণ-অভ্যুত্থান হয়েছিল।
পটুয়াখালীর বাউফলে সরকারি খাসজমিতে মহিষের ঘাস খাওয়ানো নিয়ে চাঁদা আদায়ের অভিযোগের প্রসঙ্গ তুলে শফিকুর রহমান বলেন, পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে মহিষকে ঘাস খাওয়াতেও টাকা দিতে হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠছে। টাকা না দিলে বিষ প্রয়োগ করে মহিষ মেরে ফেলার হুমকির কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
'বিরোধী দল বসে থাকবে না'
সরকার সাত মাসে রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে বলে অভিযোগ করেন শফিকুর রহমান। তাঁর মতে, আগের স্বৈরাচারী সরকারের পথেই বর্তমান সরকার এগোচ্ছে।
তিনি বলেন, বিরোধী দল নীরব দর্শক হয়ে থাকবে না। তাদের ৮৯ জন সংসদ সদস্য দেশের ১৮ কোটি মানুষের অধিকার রক্ষায় কাজ করবেন। বিএনপি অবস্থান পরিবর্তন করলেও বিরোধী দল নিজেদের অবস্থান থেকে সরে আসবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়ে শফিকুর রহমান বলেন, কোনো ধরনের হুমকি বা চাপের কাছে তাঁরা নতি স্বীকার করবেন না। তাঁর দাবি, আন্দোলন হবে শান্তিপূর্ণ; এতে জ্বালাও-পোড়াওয়ের কোনো স্থান থাকবে না।
বিএনপির 'সবার আগে বাংলাদেশ' স্লোগানের সমালোচনা করে তিনি অভিযোগ করেন, দলটি নিজেদের ও পরিবারের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর হাতে দেশের স্বার্থ তুলে দেওয়া যাবে না বলেও মন্তব্য করেন জামায়াত আমির।
জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না হলে আন্দোলনের হুঁশিয়ারি
আলোচনা সভায় বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হক অভিযোগ করেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় রাজপথে গড়ে ওঠা ঐক্যে বিএনপি বিভেদ তৈরি করছে। তাঁর দাবি, ইসলামপন্থীদের লক্ষ্যবস্তু করে আধিপত্যবাদী শক্তির সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে চায় দলটি।
মামুনুল হক বলেন, গত ৫০ বছর ধরে ইসলামপন্থীরা বিএনপিকে সহযোগিতা করে আসছেন। তাঁদের প্রত্যাশা ছিল, বিএনপি দেশের ওপর আধিপত্যবাদী প্রভাবের বিরুদ্ধে ভূমিকা রাখবে। কিন্তু এখন দলটি রাষ্ট্র সংস্কারের পরিবর্তে আধিপত্যবাদীদের সঙ্গে আপস করতে চাইছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
তিনি আরও বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট জুলাই বিপ্লবের প্রথম ধাপ সম্পন্ন হয়েছে। জুলাই সনদ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার করা না হলে তাঁরা সংবিধান পুনর্লিখনের দাবিতে এগিয়ে যাবেন। এ নিয়ে আন্দোলন অব্যাহত থাকলে তা আগের গণ-অভ্যুত্থানের চেয়েও ব্যাপক হতে পারে বলে হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
মামুনুল হকের অভিযোগ, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ধীরে ধীরে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পথ অনুসরণ করছেন। সংবিধান সংশোধনের বিষয়ে সরকারের উদ্যোগকে তিনি বিরোধী দলকে বিভ্রান্ত করার প্রচেষ্টা হিসেবে বর্ণনা করেন।
আলেম সমাজের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, রাজনৈতিক কোনো দলের স্বার্থ রক্ষায় সন্তানদের আত্মত্যাগের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা উচিত হবে না।
সরকারকে নিয়ে প্রশ্ন তুললেন অন্য নেতারাও
সভায় লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বলেন, জাতীয় নির্বাচনের আগে বিভিন্ন কার্ড বিতরণের ঘোষণা দিয়েছিল সরকার, যা তাঁর মতে নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের একটি উপায়। স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হলে তা নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
অলি আহমদ বলেন, সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরানোর মতো কোনো পদক্ষেপ এখন পর্যন্ত বিরোধী দল নেয়নি। তাঁরা জনমত তৈরি এবং জনগণের দাবি আদায়ের জন্য কাজ করছেন।
সভাপতির বক্তব্যে এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, সরকার জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসছে—এমন ধারণায় মানুষ হতাশ হচ্ছে। সরকারের উচিত অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা।
এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান ফুয়াদ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক বিভিন্ন স্থান পরিদর্শনের প্রসঙ্গ তুলে কিছু নির্দিষ্ট স্থানে না যাওয়ার কারণ জানতে চান।
আলোচনা সভায় জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহসহ অন্যান্য নেতারাও বক্তব্য দেন।
Comments