সালমান মুক্তাদিরের ঘটনা থেকে বিএনপি সরকারের কী শিক্ষা নেওয়া উচিত?
সালমান মুক্তাদিরের ঘটনাটা যেহেতু খানিকটা থিতু হয়ে এসেছে, তাই এই ঘটনা থেকে বিএনপি সরকারের কী শিক্ষা নেওয়া উচিত, সেটা নিয়ে কিছু কথা বলতে চাই। সালমান মুক্তাদিরের পক্ষে-বিপক্ষের বিতর্কে আমি যাচ্ছি না। বরং একজন রাজনীতির ছাত্র হিসেবে পুরো ঘটনাটাকে একটু দূর থেকে দেখতে চাই।
বিএনপি সরকারের প্রায় আট মাসের অভিজ্ঞতায় এই ঘটনাটা আমার কাছে সরকার বনাম একজন সিভিলিয়ান অ্যাক্টরের গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। একজন সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার পুরো সরকারকে রীতিমতো নাকানিচুবানি খাইয়েছেন। সরকার, সরকারপন্থী অ্যাক্টিভিস্ট এবং মুখপাত্ররা মিলে প্রথম দুই দিনে তাঁর তৈরি করা ন্যারেটিভকে কার্যকরভাবে কাউন্টার করতে পারেননি। ঘটনাটা তিন দিনের বেশি সময় ধরে আলোচনায় থেকেছে।
অনেকে এটাকে সরকারের যোগাযোগব্যবস্থা কিংবা সরকারপন্থী অ্যাক্টিভিস্টদের ব্যর্থতা হিসেবে দেখবেন। কিন্তু আমি ব্যাপারটাকে সেভাবে দেখি না। সমস্যাটা আরও গভীরে, বর্তমান সময়ের ইনফরমেশন ইনফ্রাস্ট্রাকচার এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি মানুষের আস্থার সংকটে।
সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে তথ্য ও রাজনৈতিক ন্যারেটিভ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা আর সরকারের একার হাতে নেই। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো দেশে, যেখানে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর মানুষের আস্থা কম, সেখানে ক্ষমতাবানদের পক্ষ থেকে আসা বক্তব্যকে মানুষ শুরুতেই সন্দেহ করে। কেউ সরকারের পক্ষে কথা বললে তাঁর বক্তব্য সত্য কি মিথ্যা, সেটা বিবেচনার আগেই অনেক মানুষ ধরে নেন, তিনি হয়তো কোনো স্বার্থ থেকে কথা বলছেন। বিপরীতে সরকারের সমালোচনাকারীর বক্তব্য তুলনামূলক বেশি বিশ্বাসযোগ্য মনে হতে পারে।
আওয়ামী লীগের অভিজ্ঞতাও এখানে প্রাসঙ্গিক। দলটির দীর্ঘ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং প্রতিষ্ঠিত বুদ্ধিজীবী শ্রেণি থাকা সত্ত্বেও ২০১৮ সালের পর থেকে সোশ্যাল মিডিয়ায় রাজনৈতিক ন্যারেটিভের ওপর তাদের প্রভাব ক্রমেই কমেছে। বিএনপির তো সেই তুলনায় সংগঠিত সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তিও নেই। আর চাইলেই রাতারাতি সেটা তৈরি করা সম্ভব নয়। স্বাধীন ও বিশ্বাসযোগ্য বুদ্ধিজীবী শ্রেণি তৈরি করতে সময় লাগে, রাজনৈতিক উদারতা লাগে, ভিন্নমতকে জায়গা দিতে হয়। টাকা দিয়ে কিংবা দলীয় আনুগত্যের ভিত্তিতে সেটা তৈরি করা যায় না।
তাহলে বিএনপি সরকারের এখন কী করা উচিত?
আমার মতে, সবচেয়ে জরুরি কাজ হচ্ছে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি মানুষের আস্থা ফেরত আনা। বিশেষ করে পুলিশ, বিচার বিভাগ এবং সংবাদমাধ্যমের প্রতি।
পুলিশকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে আইন ও নিজস্ব কোড অব কন্ডাক্ট অনুযায়ী কাজ করতে দিতে হবে। মানুষকে দেখতে হবে যে সরকারের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি, বিরোধী দলের নেতা কিংবা সাধারণ নাগরিক, সবার জন্য একই আইন প্রয়োগ হচ্ছে। বিচার বিভাগের ক্ষেত্রেও একই কথা। মানুষকে বিশ্বাস করতে হবে যে বিচারকেরা রাজনৈতিক চাপের বাইরে গিয়ে আইন ও প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।
আর সংবাদমাধ্যমকে সর্বোচ্চ স্বাধীনতা দিতে হবে। তারা সরকারের সমালোচনা করবে, মন্ত্রীদের প্রশ্ন করবে, অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করবে, করুক। এতে সরকারের ভয় পাওয়ার কিছু নেই। বরং স্বাধীন সংবাদমাধ্যম সরকারের জন্য দীর্ঘমেয়াদে একটা সুরক্ষা তৈরি করতে পারে।
কারণ আগামীকাল কেউ সরকারের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তুললে মানুষ যদি জানে যে সংবাদমাধ্যম স্বাধীনভাবে সেই অভিযোগ যাচাই করতে পারবে, পুলিশ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করবে এবং আদালত স্বাধীনভাবে বিচার করবে, তাহলে সত্য-মিথ্যা নির্ধারণের জন্য তাদের শুধু একজন ইনফ্লুয়েন্সার কিংবা সরকারের মুখপাত্রের বক্তব্যের ওপর নির্ভর করতে হবে না।
কিন্তু এই প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আস্থা না থাকলে মানুষ সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যক্তিগত কণ্ঠগুলোর ওপর নির্ভর করবে। তখন যে সরকারের পক্ষে কথা বলবে, তার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হবে। ফলে সরকার সত্য বললেও মানুষ সেটা বিশ্বাস না-ও করতে পারে।
রাজনৈতিক প্রচারণা কখনোই রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতার বিকল্প হতে পারে না।
সরকার চাইলে আরও একশ জন বুদ্ধিজীবী কিংবা এক হাজার অ্যাক্টিভিস্ট মাঠে নামাতে পারে। কিন্তু পুলিশ, বিচার বিভাগ এবং সংবাদমাধ্যমের প্রতি মানুষের আস্থা না থাকলে তাঁরা সরকারের বক্তব্যকে বিশ্বাসযোগ্য করতে পারবেন না। বরং অনেক সময় অতিরিক্ত সরকারপন্থী প্রচারণা মানুষের সন্দেহ আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
এর সঙ্গে নির্ধারিত সময়ে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের নিশ্চয়তাও জরুরি। কারণ সরকার ক্ষমতা ছাড়তে প্রস্তুত কি না, সেটাও প্রাতিষ্ঠানিক আস্থার একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
বিএনপি সরকারের বোঝা উচিত, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সরকারের কাজ প্রতিটা রাজনৈতিক ন্যারেটিভে জয়লাভ করা নয়। সরকারের কাজ এমন প্রতিষ্ঠান তৈরি করা, যারা স্বাধীনভাবে সত্য-মিথ্যা যাচাই করতে পারবে এবং যাদের সিদ্ধান্ত মানুষ বিশ্বাস করবে।
সালমান মুক্তাদিরের ঘটনা থেকে বিএনপির সবচেয়ে বড় শিক্ষা এটাই হওয়া উচিত। প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি মানুষের আস্থা ফেরাতে ব্যর্থ হলে ভবিষ্যতে আরও অনেক সালমান মুক্তাদিরের মুখোমুখি হতে হবে। আর তখন সরকার সঠিক হলেও মানুষ যে তার কথা বিশ্বাস করবে, সেই নিশ্চয়তা থাকবে না। আমার কাছে সেটাই সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ঝুঁকি।
লেখক: গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
Comments