সুন্দরবন ঘেঁষে গড়ে ওঠা ২৪ রিসোর্ট বন্ধের নির্দেশ
সুন্দরবনের প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় অবৈধভাবে গড়ে ওঠা ২৪টি রিসোর্ট ও কটেজের কার্যক্রম অবিলম্বে বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর। একই সঙ্গে আগামী ৩০ দিনের মধ্যে এসব স্থাপনা সম্পূর্ণ সরিয়ে নিতে বলা হয়েছে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের খুলনা বিভাগীয় কার্যালয়ের পরিচালক খোন্দকার মোতাহের হোসেন জানান, পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় বাণিজ্যিক রিসোর্ট পরিচালনার কোনো আইনি সুযোগ নেই। নিয়মানুযায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্তৃপক্ষকে ইতিপূর্বে নোটিশ দেওয়া হলেও তারা কোনো সন্তোষজনক জবাব দিতে পারেনি। এ কারণেই জনস্বার্থে ও বনের সুরক্ষায় এই কড়া পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
নির্দেশনা অনুযায়ী, বন্ধের তালিকায় থাকা ২৪টি রিসোর্টের মধ্যে খুলনায় ১৮টি, বাগেরহাটে দুটি এবং সাতক্ষীরায় চারটি রিসোর্ট রয়েছে। খুলনার ১৮টি রিসোর্টের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো— অরণ্যছায়া, অরণ্যবাড়ী, কেওড়াবন, মায়াবন, গহন, দ্য ফরেস্ট রিট্রিট, নিকুঞ্জ ভ্যালি, লা সিলভা কটেজ, বনবিবি,ন্দরী, ইরাবতী, বনমালী, গোলকানন, পিয়ালী, ম্যানগ্রোভ, জঙ্গলবাড়ী, বনবাস ও বনলতা ইকো কটেজ।
বন্যপ্রাণী ও বাস্তুতন্ত্রের ওপর তীব্র চাপ
পরিবেশ ও বন বিশেষজ্ঞদের মতে, সুন্দরবনের ঠিক পাশেই একের পর এক রিসোর্ট গড়ে ওঠায় এবং সেখানে পর্যটকদের অতিরিক্ত ভিড় বাড়ায় বনের সংবেদনশীল প্রতিবেশব্যবস্থা মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আবদুল্লাহ হারুন চৌধুরী মনে করেন, সেন্টমার্টিনের চেয়েও সুন্দরবনের বাস্তুসংস্থান অনেক বেশি স্পর্শকাতর ও জটিল। রিসোর্টগুলোর উচ্চ শব্দ, রাতে অতিরিক্ত আলোর ঝলকানি এবং অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কারণে বন্যপ্রাণীরা তাদের স্বাভাবিক আবাসস্থল হারাচ্ছে।
খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ জানান, রিসোর্টগুলো সুন্দরবনের সীমানার বাইরে ব্যক্তিমালিকানাধীন জমিতে হওয়ায় সরাসরি বন বিভাগের এখতিয়ার সীমিত। তবে পর্যটকদের অননুমোদিতভাবে বনে প্রবেশ এবং পরিবেশ দূষণের নেতিবাচক প্রভাব প্রতিনিয়ত বাড়ছে বলে স্বীকার করেন তিনি।
পরিবেশ অধিদপ্তরের এই সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে 'রিসোর্ট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব সুন্দরবন'। সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক জাকারিয়া হোসাইন শাওন দাবি করেন, এসব রিসোর্ট সুন্দরবনের ভেতরে নয়, বরং বনের বাইরে স্থানীয় জনবসতিপূর্ণ এলাকায় ব্যক্তিমালিকানাধীন জমিতে গড়ে উঠেছে।
তাঁর মতে, পর্যটকেরা সুন্দরবনে প্রবেশ না করে স্থানীয় জনপদে অবস্থান করে মানুষের জীবনযাত্রা ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হন। স্থানীয় মানুষের উদ্যোগে গড়ে ওঠা এই কমিউনিটি ট্যুরিজম সুন্দরবনের পরিবেশ ধ্বংসের কারণ হিসেবে উপস্থাপন করা একপাক্ষিক ও বাস্তবতাবিবর্জিত। তিনি দীর্ঘদিনের দাবি অনুযায়ী সরকারের পক্ষ থেকে একটি সুস্পষ্ট ও সমন্বিত পর্যটন নীতিমালা প্রণয়নের আহ্বান জানান।
সুন্দরবন একাডেমি এবং খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেস্ট্রি অ্যান্ড উড টেকনোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. ওয়াসিউল ইসলামের মতে, সুন্দরবনকে ঘিরে পর্যটন শিল্পের প্রসার প্রয়োজন, তবে তা হতে হবে বন ও বন্যপ্রাণী সুরক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে। রিসোর্টগুলোর মাধ্যমে বনজীবীদের বিকল্প কর্মসংস্থান ও স্থানীয় অর্থনীতির বিকাশ ঘটলেও, পরিবেশের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব মূল্যায়ন করে কঠোর নীতিমালার আওতায় এগুলো পরিচালনা করা উচিত।
উল্লেখ্য, ২০০৯ সালে সাতক্ষীরার মুন্সীগঞ্জে 'টাইগার পয়েন্ট' নামের একটি রিসোর্ট নির্মাণের মধ্য দিয়ে সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকায় বাণিজ্যিক রিসোর্টের যাত্রা শুরু হয়েছিল। দীর্ঘ দেড় দশকে তা বিস্তৃত হয়ে আজ বড় ধরনের পরিবেশগত সংকটের জন্ম দিয়েছে।
Comments