ইয়েমেন যুদ্ধ: সৌদি-তুরস্ক-পাকিস্তান প্রতিরক্ষা জোটের প্রথম বড় পরীক্ষা
ইয়েমেনে যুদ্ধ তীব্র হওয়ার মধ্যে সৌদি আরবকে সামরিকভাবে সহযোগিতা করতে এগিয়ে এসেছে তুরস্ক ও পাকিস্তান। এর ফলে আগস্টে গঠিত মক্কা প্রতিরক্ষা জোট (Mecca Alliance) প্রথমবারের মতো বাস্তব যুদ্ধে নিজেদের প্রতিরক্ষা প্রতিশ্রুতি কার্যকর করার পরীক্ষার মুখে পড়েছে।
রিয়াদে জরুরি বৈঠকের পরে তিন দেশ সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে জোটের আওতায় আগে থেকে নির্ধারিত সামরিক বাহিনী ও সক্ষমতাগুলো সৌদি আরবে দ্রুত মোতায়েনের জন্য প্রস্তুত রাখা হবে। এই সিদ্ধান্তের পেছনে রয়েছে ইয়েমেনের হুথিদের সৌদি ভূখণ্ডে হামলা।
তবে এর অর্থ এই নয় যে তুরস্ক ও পাকিস্তানের সেনারা সরাসরি ইয়েমেনে গিয়ে হুথিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে।
পাকিস্তান ও তুরস্ক কী করতে পারে? বিশেষজ্ঞদের মতে, পাকিস্তানের ভূমিকা মূলত সৌদি আরবের ভেতরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা হতে পারে। এর মধ্যে থাকতে পারে—সৌদি ভূখণ্ড ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তা, বিমান প্রতিরক্ষা, সামরিক প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ এবং জনবল সরবরাহ।
অন্যদিকে তুরস্ক দিতে পারে—গোয়েন্দা তথ্য ও নজরদারি, রাডার ও বিমান প্রতিরক্ষা, ড্রোন, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ সক্ষমতা এবং নৌ-নজরদারি।
তবে, সৌদি আরবই মূলত ইয়েমেনে সরাসরি সামরিক অভিযান চালিয়ে যাবে।
এটা কি ন্যাটোর মতো জোট? মক্কা জোটের মূল নীতি হলো—এক সদস্যের ওপর সশস্ত্র হামলাকে তিন সদস্যের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। এই কারণে অনেকেই এটিকে ন্যাটোর আর্টিক্যাল ৫-এর সঙ্গে তুলনা করছেন। তবে বিশেষজ্ঞ আন্দ্রেয়াস ক্রিগের মতে, তুলনাটি সীমিতভাবে করা উচিত। ন্যাটোর রয়েছে কয়েক দশকের সমন্বিত সামরিক কমান্ড, যৌথ পরিকল্পনা ও অভিন্ন সামরিক কাঠামো। মক্কা জোট তখনো মাত্র দুই মাসের পুরোনো।
তার ভাষায়, এটি এখনো একটি নমনীয় প্রতিরক্ষা জোট, ন্যাটোর একীভূত যুদ্ধ পরিচালনাকারী কাঠামো নয়। ইয়েমেন যুদ্ধই হচ্ছে এই জোটের প্রথম বাস্তব "অপারেশনাল পরীক্ষা"।
ইয়েমেনের যুদ্ধের ওপর এর প্রভাব কী হবে? তাৎক্ষণিকভাবে তুরস্ক ও পাকিস্তানের সহায়তা ইয়েমেনে যুদ্ধের গতিপথ খুব বেশি বদলে দেবে—এমনটা মনে করছেন না বিশেষজ্ঞরা। বরং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হতে পারে সৌদি আরবের নিজস্ব প্রতিরক্ষা শক্তিশালী হওয়া।
হুথিরা ইরানের সহযোগিতায় দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহারের সক্ষমতা বাড়িয়েছে। ফলে ইয়েমেন থেকে সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ শহর, বিমানবন্দর, তেল স্থাপনা ও অন্যান্য অবকাঠামোতে হামলার ঝুঁকি রয়েছে। তুরস্কের ড্রোন ও নজরদারি প্রযুক্তি এবং পাকিস্তানের বিমান ও স্থল প্রতিরক্ষা সক্ষমতা সৌদিকে এসব হামলা মোকাবিলায় সাহায্য করতে পারে।
এর একটি পরোক্ষ প্রভাবও থাকতে পারে। সৌদি আরব যদি নিজেদের ভূখণ্ডে হুথিদের হামলা ঠেকাতে আরও সক্ষম হয়, তাহলে তারা ইয়েমেনের হুথিবিরোধী বাহিনীকে দীর্ঘ সময় ধরে সামরিক সহায়তা দিয়ে যেতে পারবে।
পাকিস্তান কি সরাসরি হুথিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যাবে? সম্ভাবনা আপাততো কম। পাকিস্তানের সঙ্গে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। তাই ইসলামাবাদ হুথিদের বিরুদ্ধে সরাসরি আক্রমণাত্মক সামরিক অভিযান চালিয়ে ইরানের সঙ্গে উত্তেজনা বাড়াতে চাইবে না বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। তাই পাকিস্তানের ভূমিকা সম্ভবত সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা, বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও আকাশসীমা রক্ষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
তুরস্কের ক্ষেত্রেও সরাসরি ইয়েমেনে বড় সংখ্যক সেনা পাঠানোর সম্ভাবনা কম। বরং প্রযুক্তি, ড্রোন, গোয়েন্দা তথ্য ও বিমান প্রতিরক্ষা দিয়ে সৌদিকে সহায়তা করার সম্ভাবনাই বেশি।
তাহলে কি এই জোট মূলত ইরানবিরোধী? সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান জোট গঠনের সময় জোর দিয়ে বলেছিল যে এটি ইরানবিরোধী সামরিক জোট নয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বর্তমান ইয়েমেন যুদ্ধে হুথিরা ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র এবং তাদের হামলাই এই জোটকে প্রথমবার সক্রিয় করেছে।
তাই ইয়েমেন যুদ্ধ নিঃসন্দেহে জোটটির প্রথম বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞ ক্রিগের মতে, জোটটিকে শুধু "ইরানবিরোধী সুন্নি জোট" হিসেবে দেখলে বিষয়টি অতিরিক্ত সরলীকরণ হবে। সৌদি আরবের আরেকটি বড় লক্ষ্য হলো নিজেদের নিরাপত্তার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানো।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—এই জোটে তিন দেশের সক্ষমতা একে অপরের পরিপূরক:
- সৌদি আরব: অর্থনৈতিক শক্তি, রাজনৈতিক প্রভাব ও ভৌগোলিক গুরুত্ব,
- তুরস্ক: উন্নত প্রতিরক্ষা শিল্প, ড্রোন, প্রযুক্তি ও সামরিক অভিজ্ঞতা,
- পাকিস্তান: বড় ও অভিজ্ঞ সামরিক বাহিনী, জনবল এবং দীর্ঘদিনের সৌদি সামরিক সম্পর্ক।
তাই ইয়েমেন যুদ্ধ শুধু হুথিদের বিরুদ্ধে সৌদি আরবের যুদ্ধ নয়—এটি একই সঙ্গে পরীক্ষা করছে, সৌদি আরব-তুরস্ক-পাকিস্তানের নতুন প্রতিরক্ষা জোট বাস্তবে কতটা কার্যকর হতে পারে।
Comments