গ্যাস ও বিদ্যুতের ঘাটতি ও অর্থনীতি
আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা, দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রের মজুদ হ্রাস এবং আমদানিনির্ভর জ্বালানি নীতি—এসবের সমন্বিত প্রভাবেই আজকের সংকট তৈরি হয়েছে। বিগত সরকারের অবদান ও অবকাঠামোগত ভিত্তি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বর্তমান সংকট সত্ত্বেও স্বীকার করতে হবে যে, ২০০৯ সালে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে শেখ হাসিনার সরকার দেশজুড়ে জ্বালানি অবকাঠামো রূপান্তরে অভূতপূর্ব ভূমিকা রেখেছিল। ২০০৯ সালে যেখানে দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ছিল মাত্র ৪,৯৪২ মেগাওয়াট, সেখানে গত দেড় দশকে শতভাগ ডিজিটালাইজেশন ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের মাধ্যমে তা ২৫,০০০ মেগাওয়াটের ওপরে উন্নীত করা হয়।
বিদ্যুৎ উৎপাদন ও গ্রিড সংযোগ: দেশের গ্রামীণ ও দুর্গম অঞ্চলগুলোকে জাতীয় গ্রিড ও সোলার প্যানেলের মাধ্যমে বিদ্যুতায়নের আওতায় এনে প্রায় শতভাগ মানুষের কাছে বিদ্যুৎ সুবিধা পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল।
মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন: দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র 'রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র' স্থাপন (২,৪০০ মেগাওয়াট), পায়রা ও মাতারবাড়ির গভীর সমুদ্রবন্দরকেন্দ্রিক বিশাল কয়লাভিত্তিক আল্ট্রা-সুপারক্রিটিক্যাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ ছিল দীর্ঘমেয়াদী চাহিদার কথা চিন্তা করে।
এলএনজি ও অবকাঠামো নীতি: নিজস্ব গ্যাসের ঘাটতি মোকাবেলায় মহেশখালীতে ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (FSRU) নির্মাণ এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার ভিত্তিতে ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানির প্রক্রিয়া শুরু হয় শেখ হাসিনা সরকারের আমলেই।
সংকটের বর্তমান চিত্র
তবে সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা এবং প্রয়োজনীয় সংস্কারের অভাবে তৈরি পোশাক, সিরামিক, টেক্সটাইলসহ প্রধান শিল্পকারখানাগুলো চরম সংকটে পড়েছে। নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি না পাওয়ায় উৎপাদনের গতি কমে গেছে এবং বিকল্প হিসেবে ব্যয়বহুল জ্বালানি ব্যবহার করায় উৎপাদন খরচ বহুগুণ বেড়ে গেছে। চাহিদার তুলনায় গ্যাসের যোগান কম থাকায় অনেক বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র পুরোপুরি সচল রাখা সম্ভব হচ্ছে না, যার প্রভাবে শহর ও গ্রাম অঞ্চলে ঘন ঘন লোডশেডিং হচ্ছে। পাশাপাশি বাসাবাড়িতে সঠিক চাপে গ্যাস না পাওয়া এবং সিএনজি স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ সময় লাইন লেগে থাকা জনজীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলেছে।
সংকট নিরসনে করণীয়
স্বল্পমেয়াদী পদক্ষেপ: দ্রুত সংকট নিয়ন্ত্রণে আনতে প্রথমেই গ্যাস ও বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনে অপচয়, কারিগরি ত্রুটি এবং অবৈধ সংযোগগুলো কঠোরভাবে বন্ধ করতে হবে। পিক-আওয়ারে বিদ্যুৎ ব্যবহারে সচেতনতা বাড়ানো এবং সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে শক্তির অপচয় রোধ করা জরুরি। এছাড়া স্পট মার্কেট ও দীর্ঘমেয়াদী এলএনজি চুক্তির মধ্যে সঠিক ভারসাম্য রাখা প্রয়োজন।
মধ্যমেয়াদী পদক্ষেপ: আমদানিনির্ভরতা কমাতে স্থলভাগ এবং গভীর সমুদ্রে নতুন গ্যাস কূপ অনুসন্ধান ও খনন কাজ দ্রুত জোরদার করতে হবে। পাশাপাশি বিদ্যমান পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রগুলোতে ওয়ার্কওভার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পুনরায় গ্যাসের প্রবাহ বাড়াতে হবে।
দীর্ঘমেয়াদী পদক্ষেপ: স্থায়ী সমাধানের জন্য মেগা প্রকল্পগুলোর (যেমন রূপপুর ও মাতারবাড়ি) পূর্ণাঙ্গ ও সময়মতো বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। একই সাথে সৌর ও বায়ুর মতো নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার ব্যাপকভাবে সম্প্রসারণ করে একটি সুষম বহুমুখী জ্বালানি নীতি (Fuel Mix) বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন, যাতে কোনো নির্দিষ্ট উৎসের ওপর দীর্ঘস্থায়ী নির্ভরতা তৈরি না হয়।
বিগত সরকারের অবকাঠামোগত ভিত্তিকে সঠিকভাবে কাজে লাগিয়ে নতুন কুপ অনুসন্ধান এবং আধুনিক ও নবায়নযোগ্য শক্তির প্রসারণই কেবল এই সংকটের টেকসই সমাধান এনে দিতে পারে। পাশাপাশি রাজনৈতিক সহবস্থান না হওয়া পর্যন্ত অস্থিরতা এনে দিচ্ছে গোটা সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থায়।
দেশাত্মবোধ এবং দেশকে যদি আমরা ভালোবাসি তাহলে সকলের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় আবারও ঘুরে দাড়ানো সম্ভব। সুশাসন নিশ্চিতে পরমতসহিষ্ণুতা, আলোচনার পথ উন্মুক্ত রাখা এবং নাগরিকদের মৌলিক অধিকারের দিকে যে সরকার সহনশীল থাকবে সেই সরকারই রাষ্ট্র পরিচালনায় যোগ্যতার দৃষ্টান্ত রাখতে পারবে।
লেখক: আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
Comments