ইসলামী ব্যাংকে নেতৃত্ব সংকট
দেশের বৃহত্তম বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোর অন্যতম ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি দীর্ঘদিন ধরে নেতৃত্ব ও পরিচালনাগত সংকটের মধ্যে রয়েছে। পূর্ণাঙ্গ পরিচালনা পর্ষদ না থাকা, স্থায়ী ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) না থাকা এবং গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে সীমাবদ্ধতার কারণে ব্যাংকটির স্বাভাবিক কার্যক্রম ও করপোরেট তদারকি ব্যাহত হচ্ছে।
জুন থেকে ইসলামী ব্যাংকে পূর্ণাঙ্গ পরিচালনা পর্ষদ নেই। এর আগে এপ্রিল থেকে ব্যাংকটি পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে। সাবেক এমডি ও সিইও মো. ওমর ফারুক খানকে এপ্রিলে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানোর পর অতিরিক্ত এমডি মো. আলতাফ হোসেন ভারপ্রাপ্ত এমডির দায়িত্ব পালন করছেন।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ জহির হোসেনকে ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সব ক্ষমতা ও দায়িত্ব পালনের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। তবে বাস্তবে তিনি মূলত রুটিন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছেন। বড় বা কৌশলগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে তার ক্ষমতা সীমিত থাকায় ব্যাংকের নীতিনির্ধারণ ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় স্থবিরতা তৈরি হয়েছে।
একক ব্যক্তির মাধ্যমে বোর্ডের কার্যক্রম পরিচালিত হওয়ায় সিদ্ধান্ত গ্রহণ অনেক ক্ষেত্রে 'হ্যাঁ' বা 'না'-ভিত্তিক হয়ে পড়ছে। ফলে পরিচালনা পর্ষদের স্বাভাবিক বৈঠকে যে ধরনের বিস্তারিত আলোচনা, বিশ্লেষণ ও মতামত বিনিময়ের সুযোগ থাকে, তা অনুপস্থিত। এর প্রভাব পড়ছে বাজেট অনুমোদন, নীতিমালা বাস্তবায়ন, করপোরেট তদারকি এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে।
সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, কোনো ব্যাংককে তিন মাসের বেশি সময় এমডি ছাড়া পরিচালনার অনুমতি দেওয়া হয় না। তবে বিশেষ বিবেচনায় ইসলামী ব্যাংককে পরবর্তী সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পরিচালনার সুযোগ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ফলে ব্যাংকটি কবে স্থায়ী এমডি ও পূর্ণাঙ্গ পরিচালনা পর্ষদ ফিরে পাবে, তা এখনো অনিশ্চিত।
একসময় দেশের ব্যাংকিং খাতের অন্যতম ভালো পারফরমার হিসেবে বিবেচিত ইসলামী ব্যাংকের আর্থিক অবস্থার অবনতি ঘটে ২০১৭ সালে এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর। অভিযোগ রয়েছে, গ্রুপটির নিয়ন্ত্রণে থাকার সময়ে ব্যাংকের মোট ঋণের বড় একটি অংশ নিজেদের কোম্পানি ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে দেওয়া হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, এ ধরনের ঋণের পরিমাণ ব্যাংকের মোট ঋণের প্রায় ৮০ শতাংশ পর্যন্ত ছিল, যা ব্যাংকিং আইন ও বিধিমালার সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
বর্তমানে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের পরিমাণও উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে। জুন পর্যন্ত ইসলামী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৯৮ হাজার ৯১৪ কোটি টাকা, যা ব্যাংকটির বিতরণ করা মোট ঋণের ৫২ দশমিক ১৫ শতাংশ।
২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ইসলামী ব্যাংক এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণমুক্ত হয়। এরপর থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের তত্ত্বাবধানে ব্যাংকটির কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। তবে আগের ব্যবস্থাপনার সময়কার আর্থিক ক্ষতি, উচ্চ খেলাপি ঋণ এবং তারল্য সংকট কাটিয়ে ওঠা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে।
ব্যাংকের আর্থিক পরিস্থিতি সামাল দিতে বড় ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ ব্যাংক সীমা আরোপ করেছে। বর্তমানে অর্থায়ন ও অনর্থায়ন মিলিয়ে সর্বোচ্চ ১০০ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ দেওয়ার সুযোগ রয়েছে ইসলামী ব্যাংকের।
এর ফলে বড় প্রকল্পে অর্থায়ন, ব্যবসা সম্প্রসারণ এবং ব্যাংকের স্বাভাবিক ঋণ কার্যক্রম পরিচালনায় সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। পূর্ণাঙ্গ পরিচালনা পর্ষদ না থাকায় এসব সিদ্ধান্তের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব মূল্যায়ন এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে।
নেতৃত্ব সংকটের প্রভাব পড়েছে ব্যাংকের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের চাকরির মেয়াদেও। অতিরিক্ত এমডি মোহাম্মদ জামাল উদ্দিন মজুমদার, উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) মো. মাহবুব আলম এবং সিনিয়র এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট আমিনুর রহমানের মেয়াদ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। মাহবুব আলম ও আমিনুর রহমান অবসর নেওয়ার পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর পুনর্নিয়োগ পেয়েছিলেন।
এ ছাড়া পাঁচজন ডিএমডি, মাহমুদুর রহমান, মো. রফিকুল ইসলাম, মুহাম্মদ সাঈদ উল্লাহ, কে এম মুনিরুল আলম আল-মামুন এবং মো. মাকসুদুর রহমানের মেয়াদ অক্টোবরে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। পূর্ণাঙ্গ পরিচালনা পর্ষদ না থাকায় তাদের মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়টিও ঝুলে আছে। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে আবেদন করলেও এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
ইসলামী ব্যাংকের আগের পরিচালনা পর্ষদকে ঘিরে বিতর্ক থাকায় নতুন বোর্ড গঠনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। মে মাসে বাংলাদেশ ব্যাংক সাবেক ডেপুটি গভর্নর মো. খুরশীদ আলমকে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান নিয়োগ দেয়। এর কয়েক ঘণ্টা আগে আগের চেয়ারম্যান পদত্যাগ করেছিলেন।
তবে খুরশীদ আলমের নিয়োগকে ঘিরেও বিতর্ক তৈরি হয়। ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট বাংলাদেশ ব্যাংকের শতাধিক বিক্ষুব্ধ কর্মকর্তা তাকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ছাড়তে বাধ্য করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে তার পদত্যাগের দাবিতে 'কনশাস কাস্টমার্স ফোরাম' নামের একটি সংগঠন ইসলামী ব্যাংকের মতিঝিল প্রধান কার্যালয়ের সামনে আন্দোলন শুরু করে।
এসব বিক্ষোভ ও অস্থিরতার প্রভাব ব্যাংকের কার্যক্রমেও পড়ে এবং তারল্য সংকট আরও তীব্র হয়। সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ ব্যাংক ইসলামী ব্যাংককে ১৭ হাজার কোটি টাকা সহায়তা দেয়। তবে ওই সহায়তার পরও পরিস্থিতির প্রত্যাশিত উন্নতি না হওয়ায় ১৪ জুন পুরো পরিচালনা পর্ষদ বিলুপ্ত করা হয়।
ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান সংকট কেবল পরিচালনা পর্ষদ বা এমডির পদ শূন্য থাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। উচ্চ খেলাপি ঋণ, তারল্য সংকট, বড় ঋণ বিতরণে নিয়ন্ত্রণ, জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের চাকরির মেয়াদ নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং আগের পরিচালনা পর্ষদকে ঘিরে বিতর্ক—সব মিলিয়ে ব্যাংকটির সামনে একাধিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
পূর্ণাঙ্গ ও কার্যকর পরিচালনা পর্ষদ গঠন এবং স্থায়ী ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগের পাশাপাশি ব্যাংকের আর্থিক অবস্থার পুনর্গঠন, খেলাপি ঋণ আদায় এবং করপোরেট সুশাসন নিশ্চিত করা এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তবে এসব পদক্ষেপ কবে এবং কীভাবে বাস্তবায়িত হবে, সে বিষয়ে এখনো স্পষ্ট সময়সীমা নেই। ফলে ইসলামী ব্যাংকের নেতৃত্ব সংকটের পাশাপাশি পরিচালনাগত স্থবিরতাও অব্যাহত রয়েছে।
Comments