নাইন-ইলেভেনের ২৫ বছর, স্মৃতিতে এখনো অমলিন সেই দিন
২৫ বছর পেরিয়ে গেলেও মার্কিন নাগরিকদের স্মৃতি থেকে মুছে যায়নি ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলা। নতুন এক জরিপে দেখা গেছে, নিজেদের জীবদ্দশায় ঘটে যাওয়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ঘটনাগুলোর মধ্যে এখনো নাইন-ইলেভেনকে সবার ওপরে রাখছেন প্রায় অর্ধেক মার্কিন প্রাপ্তবয়স্ক।
ইপসোসের সাম্প্রতিক জরিপে উঠে এসেছে, পরবর্তী সময়ে কোভিড-১৯ মহামারি, বারাক ওবামা ও ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়াসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটলেও ৯/১১-এর প্রভাব কমেনি।
জরিপ অনুযায়ী, হামলার খবর প্রথম শোনার সময় তারা কোথায় ছিলেন—এমন স্মৃতিও বিপুলসংখ্যক মার্কিন নাগরিকের এখনো স্পষ্ট মনে আছে। প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ আমেরিকান মনে করেন, ৯/১১ হামলা যুক্তরাষ্ট্রকে 'ব্যাপকভাবে' প্রভাবিত করেছে। গ্যালাপের আরেক জরিপে প্রায় ৩০ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক জানিয়েছেন, ওই হামলার পর তারা নিজেদের জীবনযাপনের ধরন স্থায়ীভাবে পরিবর্তন করেছেন।
তবে হামলার ব্যাপক প্রভাব থাকলেও এর ২৫তম বার্ষিকী আনুষ্ঠানিকভাবে পালন করার পরিকল্পনা রয়েছে তুলনামূলক কম মানুষের। জরিপে অংশ নেওয়া মাত্র ১০ শতাংশের মতো মার্কিন প্রাপ্তবয়স্ক জানিয়েছেন, শুক্রবার তারা নাইন-ইলেভেন স্মরণে কোনো কর্মসূচিতে অংশ নেবেন।
স্মৃতিতে এখনো সেই সকাল
নাইন-ইলেভেনের প্রত্যক্ষদর্শীদের অনেকের কাছেই সেই দিনের স্মৃতি আজও তীব্র। ৫১ বছর বয়সী কেভিন নোয়েল জানান, হামলার দিন সকালে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের কাছাকাছি কর্মস্থলে যাওয়ার জন্য সাবওয়ে স্টেশন থেকে বের হওয়ার পর তিনি বিপর্যয়ের দৃশ্য দেখতে পান।
এখনো ওই এলাকায় গেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের গন্ধ তার মনে সেই দিনের কথা ফিরিয়ে আনে। নোয়েলের কাছে ৯/১১ তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ঘটনা। তার বিশ্বাস, ভবিষ্যৎ প্রজন্মও দীর্ঘ সময় ধরে এই ঘটনাকে স্মরণ করবে।
ইপসোসের জরিপে অংশ নেওয়া মার্কিন নাগরিকদের যখন তাদের জীবদ্দশায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পাঁচটি ঐতিহাসিক ঘটনা উল্লেখ করতে বলা হয়, তখন নাইন-ইলেভেন সবচেয়ে বেশি মানুষের তালিকায় উঠে আসে। ৯/১১-এর পর দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল কোভিড-১৯ মহামারি, যেটিকে ৩১ শতাংশ উত্তরদাতা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করেন।
এ ছাড়া ওবামা ও ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন, মহাকাশ অভিযান এবং বার্লিন প্রাচীরের পতনের মতো ঘটনাকেও অনেকে নিজেদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক মুহূর্ত হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
বয়সভেদে অবশ্য গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার তালিকায় কিছুটা পার্থক্য দেখা গেছে। ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সীদের কাছে ৯/১১-এর পর সবচেয়ে বেশি উল্লেখ করা ঘটনাগুলোর মধ্যে ছিল প্রেসিডেন্ট জন এফ. কেনেডির হত্যাকাণ্ড, মহাকাশ অভিযান এবং ভিয়েতনাম যুদ্ধ।
অন্যদিকে, ৩৫ বছরের কম বয়সী মার্কিন নাগরিকদের কাছে কোভিড-১৯ মহামারির গুরুত্ব বেশি। এই বয়সী প্রায় অর্ধেক মানুষ মহামারিকে নিজেদের জীবনের অন্যতম প্রভাবশালী ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। বিপরীতে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ নাইন-ইলেভেনের কথা বলেছেন।
এর অন্যতম কারণ, তরুণদের একটি বড় অংশ ২০০১ সালে হয় জন্মগ্রহণ করেনি, অথবা হামলার সময় এতটাই ছোট ছিল যে ঘটনাটি নিজেরা স্মরণ করার মতো বয়সে পৌঁছায়নি।
পিউ রিসার্চ সেন্টারের আগস্টের এক জরিপেও দেখা গেছে, ৯/১১-এর পর জন্ম নেওয়া প্রাপ্তবয়স্কদের প্রায় ৬০ শতাংশ প্রথমবার স্কুল বা ক্লাসের মাধ্যমে এই হামলা সম্পর্কে জানতে পেরেছেন।
যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্বে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব
মার্কিন নাগরিকদের বড় একটি অংশ মনে করেন, ৯/১১ শুধু যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেই নয়, বিশ্বব্যাপীও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলেছে। ইপসোসের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৯০ শতাংশ আমেরিকান মনে করেন, হামলাটি যুক্তরাষ্ট্রকে 'ব্যাপকভাবে' অথবা 'বেশ ভালোভাবে' প্রভাবিত করেছে।
প্রায় ৭০ শতাংশ মনে করেন, হামলার প্রভাব বিশ্বের ওপরও উল্লেখযোগ্য ছিল। আর প্রায় ৬০ শতাংশের মতে, তাদের প্রজন্মের ওপর নাইন-ইলেভেনের বড় ধরনের প্রভাব রয়েছে। প্রায় ৩০ শতাংশ বলেছেন, হামলাটি তাদের ব্যক্তিগত জীবন বা পরিবারকেও প্রভাবিত করেছে।
যারা এবার ৯/১১ স্মরণে কোনো কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার পরিকল্পনা করেছেন, তাদের মধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশ এক মিনিট নীরবতা পালনের কথা জানিয়েছেন। আর ৫৬ শতাংশ মার্কিন নাগরিক জাতীয় পতাকা প্রদর্শনের পরিকল্পনার কথা বলেছেন।
সন্ত্রাসবাদ নিয়ে আস্থায় পরিবর্তন
নাইন-ইলেভেনের ২৫ বছর পরও সন্ত্রাসবাদ থেকে যুক্তরাষ্ট্র কতটা নিরাপদ—এ নিয়ে মার্কিন নাগরিকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। ইপসোসের জরিপে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ মনে করেন, ২০০১ সালের তুলনায় দেশ এখন বেশি নিরাপদ। প্রায় একইসংখ্যক মানুষ মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র বরং কম নিরাপদ। আরেক-তৃতীয়াংশের মতে, নিরাপত্তার পরিস্থিতিতে বড় কোনো পরিবর্তন হয়নি।
গ্যালাপের সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, ৫৫ শতাংশ মার্কিন প্রাপ্তবয়স্ক ভবিষ্যৎ সন্ত্রাসী হামলা থেকে নাগরিকদের সুরক্ষা দেওয়ার বিষয়ে সরকারের ওপর 'অনেক' বা 'ন্যায্য পরিমাণ' আস্থা রাখেন।
তবে নাইন-ইলেভেনের পরপরই এই আস্থার হার ছিল ৮৮ শতাংশ। ২৫ বছরের ব্যবধানে তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। বর্তমান হার গ্যালাপের পরিমাপ করা সর্বনিম্ন পর্যায়গুলোর কাছাকাছি।
এদিকে, প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মার্কিন নাগরিক জানিয়েছেন, তারা নিজেরা কিংবা পরিবারের কোনো সদস্য ভবিষ্যতে সন্ত্রাসী হামলার শিকার হতে পারেন—এমন আশঙ্কা 'খুব' অথবা 'কিছুটা' রয়েছে। তবে ২০০১ সালের হামলার পরপরই এ ধরনের উদ্বেগ প্রকাশকারীর হার ছিল প্রায় ৬০ শতাংশ।
সূত্র: এপি
Comments