সাত বছর পর ভারত সফরে শি জিনপিং, মোদির সঙ্গে বৈঠকে গুরুত্ব পাবে সীমান্ত ও বাণিজ্য
দীর্ঘ সাত বছর পর ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিতে ভারত সফরে আসছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। নয়াদিল্লিতে এই সম্মেলনের ফাঁকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে তাঁর দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের কথা রয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, এই বৈঠকের মাধ্যমে দুই দেশের শীতল সম্পর্কে বরফ গলে নতুন গতির সৃষ্টি হতে পারে।
আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর ভারতে এই ব্রিকস সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। গত বছর প্রধানমন্ত্রী মোদির চীন সফরের পর থেকেই দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগে দৃশ্যমান গতি এসেছে। এছাড়া চলতি মাসে কিরগিজস্তানে একটি আঞ্চলিক সম্মেলনের ফাঁকেও মোদি ও শি জিনপিংয়ের সংক্ষিপ্ত সাক্ষাৎ হয়েছিল।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানিয়েছে, দুই নেতাই মনে করেন ভারত ও চীন পরস্পরের 'প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং অংশীদার'। পাশাপাশি, দুই দেশ একে অপরের উন্নয়নের জন্য কোনো হুমকি নয়, বরং পারস্পরিক সুযোগ তৈরি করে বলে তারা বিশ্বাস করেন।
ভারতে নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত বিক্রম দোরাইস্বামীও দুই দেশের সম্পর্কের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম গ্লোবাল টাইমসে প্রকাশিত এক নিবন্ধে উল্লেখ করেছেন যে, বিশ্বের দুই বৃহৎ উদীয়মান অর্থনীতির স্থিতিশীল ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ২৮০ কোটি মানুষের স্বার্থের সঙ্গে জড়িত। এ সম্পর্ক এশিয়া ও বৃহত্তর বিশ্বের শান্তি, স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধির জন্যও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
মোদি-শি বৈঠকে দুই দেশের অমীমাংসিত সীমান্ত পরিস্থিতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ডা হিসেবে স্থান পেতে পারে। নয়াদিল্লির কঠোর অবস্থান হলো, সীমান্তে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখা ছাড়া ভারত-চীন দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সামগ্রিক উন্নয়ন অসম্ভব।
২০২০ সালে পূর্ব লাদাখে ভারত ও চীনের সেনাদের মধ্যকার সংঘর্ষের পর দুই দেশের সম্পর্কে বড় ধরনের টানাপোড়েন শুরু হয়। পরবর্তীতে কাজানে উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ পুনরায় শুরুর বিষয়ে সমঝোতা হয় এবং পূর্ব লাদাখে সেনা প্রত্যাহার ও বিরোধপূর্ণ কিছু বিষয়ের সুরাহার মাধ্যমে সম্পর্ক ধীরে ধীরে স্বাভাবিকতার পথে এগোতে থাকে। সীমান্ত এলাকায় শান্তি বজায় রাখতে এবং একটি ন্যায্য ও পারস্পরিক গ্রহণযোগ্য সমাধান খুঁজতে দুই দেশের বিশেষ প্রতিনিধিরা কাজ করে যাচ্ছেন। এর আগে গত মাসে বেইজিংয়ে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল ও চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ইর বৈঠকেও উচ্চপর্যায়ের এই যোগাযোগের ইতিবাচক প্রভাব নিয়ে আলোচনা হয়।
চীনের সঙ্গে ভারতের সামগ্রিক বাণিজ্যিক সম্পর্ক বৃদ্ধি পেলেও বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি নিয়ে নয়াদিল্লির দীর্ঘদিনের উদ্বেগ রয়েছে। প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের এই সফরে বিষয়টি গুরুত্ব পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
২০২৬ সালের মার্চে শেষ হওয়া অর্থবছরে ভারত ও চীনের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য রেকর্ড ১৫১.১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। তবে একই সময়ে ভারতের বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে রেকর্ড ১১২.১৬ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে (যা আগের বছর ছিল ৯৯.২১ বিলিয়ন ডলার)। নয়াদিল্লি চায় চীনের বাজারে ভারতীয় পণ্যের প্রবেশাধিকার বাড়াতে এবং দুই দেশের বাণিজ্যে ভারসাম্য আনতে সরবরাহ ব্যবস্থার নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করতে।
এদিকে চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম সিজিটিএনের সাংবাদিক হুয়াং ইউ জানান, শির এই সফর দুই দেশের বাণিজ্য প্রসারে বড় ভূমিকা রাখবে, কারণ তাঁর সঙ্গে একটি বড় চীনা ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদল নয়াদিল্লি আসছে এবং চীনা কোম্পানিগুলো ব্রিকসভুক্ত দেশগুলোতে নতুন ব্যবসার সুযোগ খুঁজছে।
সাম্প্রতিক সময়ে ভারত ও চীন সম্পর্কের বরফ গলাতে বেশ কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নিয়েছে। এর মধ্যে পুনরায় সরাসরি বিমান চলাচল শুরু হয়েছে এবং চীনা ব্যবসায়ীদের জন্য ভারতের ভিসা প্রক্রিয়াও সহজ করা হয়েছে। এছাড়া করোনা মহামারির কারণে ২০২০ সাল থেকে বন্ধ থাকা ভারত-চীন সীমান্ত বাণিজ্য দীর্ঘ ছয় বছর পর সম্প্রতি পুনরায় চালু হয়েছে। ঐতিহাসিক সিল্ক রোডের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথ সিকিমের নাথুলা পাস দিয়ে এই বাণিজ্য শুরু হওয়াকে দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার আরেকটি বড় অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
Comments