মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি বাংলাদেশের নিরাপত্তা, নাকি অন্যের শত্রু আমদানি?
বাংলাদেশের মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যোগ দেওয়া উচিত কি না-এই নিয়ে বিতর্ক আছে। বাংলাদেশ একটি মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ,এবং মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের রাজনৈতিক,সাংস্কৃতিক,অর্থনৈতিক ও মানবিক সম্পর্ক স্বাভাবিকভাবেই গুরুত্বপূর্ণ। মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি হলো সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত একটি ত্রিপক্ষীয় সম্মিলিত প্রতিরক্ষা চুক্তি। চুক্তিটি ২০২৬ সালের ৭ আগস্ট সৌদি আরবের মক্কায় স্বাক্ষরিত হয়।
কিন্তু প্রশ্ন এ কারণেই সামনে আসে যে, বাংলাদেশ কি এমন একটি সামরিক জোটে প্রবেশ করবে, যার কারণে অন্য রাষ্ট্রের সংঘাত আমাদের ওপর এসে পড়বে? এর মধ্যেই তার নমুনা পাওয়া গেছে। হুতিরা সৌদি আরবের দক্ষিণের চারটা শহরে একসাথে হামলা চালিয়েছে। ডজন ডজন ব্যালিস্টিক মিসাইল আর ড্রোন দিয়ে আরামকোর স্থাপনা আর কিং খালিদ বিমানঘাঁটিতে আঘাত করার দাবি তাদের। জাজানে যে শোধনাগারটা পুড়েছে সেটা দিনে চার লাখ ব্যারেল ক্ষমতার, সৌদির সবচেয়ে বড়গুলোর একটা। আহত ৭৩ জন, তার মধ্যে নারী ও শিশুও আছে। কয়েকটা স্থাপনার কাজ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়েছে। কেউ এগিয়ে আসেনি। না তুরষ্ক, না পাকিস্তান।
তিন দেশ মিলিয়ে প্রায় ১৪ লাখ সেনা, ৩৪০০ যুদ্ধবিমান, ছয় হাজার ট্যাংক, বছরে ১২৪ বিলিয়ন ডলারের প্রতিরক্ষা বাজেট। কাগজে-কলমে বিশাল ব্যাপার। কিন্তু এই হিসাবটা সেনাবাহিনীর সাথে সেনাবাহিনীর যুদ্ধের হিসাব। বাস্তবে ঝুঁকি বা হুমকি আসে এমন সব গোষ্ঠী থেকে যাদের বিরুদ্ধে সমরাস্ত্র দিয়ে কিছু হয় না।
সবচেয়ে বড় ফাঁকিটা অন্য জায়গায়। চুক্তির যে বাক্যটা নিয়ে এত হইচই-তিন দেশের যেকোনো একটার উপর সশস্ত্র হামলা হলে সেটা তিনটার উপরেই হামলা বলে ধরা হবে -সেটা যৌথ বিবৃতির লাইন। কিন্তু এটা করতে যৌথ কমান্ড, স্ট্যান্ডিং ফোর্স, ট্রিগার মেকানিজম- সেগুলোর কিছুই নেই।
ন্যাটোর আর্টিকেল ফাইভ পঁচাত্তর বছরে মাত্র একবার ডাকা হয়েছে। ৯/১১-এর পর। রাষ্ট্রের হামলায় না, একটা নন-স্টেট গোষ্ঠীর হামলায়। ফল হলো বিশ বছরের আফগান যুদ্ধ, যেখানে ইউরোপের বহু দেশ কেন ঢুকেছিল সেটা তারা নিজেরাই পরে ব্যাখ্যা করতে পারেনি।
জোটে ঢোকা মানে শুধু বন্ধু পাওয়া না। জোটে ঢোকা মানে অন্যের শত্রুও আমদানি করা। সৌদির ঘাড়ে হুতি, পাকিস্তানের ঘাড়ে টিটিপি আর বেলুচ সশস্ত্র গোষ্ঠী, তুরস্কের ঘাড়ে সিরিয়া সীমান্তের হিসাব-নিকাশ। এদের কারো সাথে বাংলাদেশের কোনো ঝগড়া নেই। সই করার দিন থেকে থাকতে পারে।
আর এসব গোষ্ঠীর কৌশলই হলো সবচেয়ে দুর্বল জায়গায় আঘাত করা। রিয়াদ বা আঙ্কারার এয়ার ডিফেন্স ভেদ করার চেয়ে জোটের নতুন, ছোট, অপ্রস্তুত সদস্যের উপর চাপ তৈরি করা সহজ। কাজেই "সৌদি-তুরস্ক-পাকিস্তানের শত্রুরা জোটের কোনো সদস্যের উপর হামলা করতে পারে না" -এটা বলা কঠিন।
বাংলাদেশের এটা মনে রাখা দরকার।
আরেকটা জিনিস খেয়াল করার মতো। এরদোয়ান বলেছেন মিশরের যোগ দেওয়া সম্ভব। মিশরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জবাবে বলেছেন কায়রো আগে সাংবিধানিক আর আইনি দিকগুলো দেখে নিচ্ছে। মিশর,যাদের সামরিক সক্ষমতা আর আঞ্চলিক ওজন বাংলাদেশের চেয়ে বহুগুণ বেশি, তারা তাড়াহুড়ো করছে না। ঢাকায় এখন যে গতিতে উৎসাহ, তার সাথে এই সতর্কতাটা মিলিয়ে দেখলে ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়। প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেছেন,মধ্যপ্রাচ্যে মুসলিম দেশগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বাংলাদেশের অংশগ্রহণের কথা ভাবাটা অস্বাভাবিক না,এবং বিষয়টা ইতিবাচকভাবে দেখা হচ্ছে।
সবশেষে ভারতের প্রসঙ্গ। এই যুক্তিটা নিয়ে সন্দেহ আছে। মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক একটা প্রতিরক্ষা জোট ঢাকায় ভারতীয় গোয়েন্দা তৎপরতা বা রাজনৈতিক প্রভাব ঠিক কীভাবে ঠেকাবে, সেই মেকানিজমটা কেউ ব্যাখ্যা করেনি। প্রভাব যদি কিছু হয়ও,সেটা মনস্তাত্ত্বিক,অপারেশনাল না। উল্টোদিকের ঝুঁকিটা বেশ বাস্তব:পাকিস্তানের সাথে আনুষ্ঠানিক সামরিক জোটে ঢুকলে বাংলাদেশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভারত-পাকিস্তান হিসাবের ভেতরে ঢুকে যায়। এতদিন যে জায়গাটায় দাঁড়িয়ে আমরা সবার সাথে দর-কষাকষি করতাম, সেটা হাতছাড়া হয়। আধিপত্য ঠেকানোর নামে আমরা হয়তো আধিপত্যের প্রতিযোগিতাটাকেই বাংলাদেশের ভেতরে ডেকে আনব।
পঞ্চাশ বছর ধরে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল কথা ছিল সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে সামরিক জোট না। সেই অবস্থান বদলানো যেতেই পারে। কিন্তু বদলাতে হবে চোখ খুলে, হিসাব কষে। কার শত্রু, কোন শর্তে, কত দামে আর,যে চুক্তিতে সই করব বুঝে করতে হবে। কূটনীতি কিন্তু জুয়া খেলা না।
Comments