খেলাপি ঋণ ছাড়াল ৬ লাখ কোটি টাকা, যত বড় খেলাপি তত বড় ছাড়
ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের পরিমাণ আবারও ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ থেকে জুন—এই তিন মাসের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা। বর্তমানে ব্যাংক খাতের মোট ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশই খেলাপি। অর্থাৎ, ব্যাংক থেকে বিতরণ করা প্রতি ১০০ টাকার ঋণের মধ্যে প্রায় ৩২ টাকা ৭৮ পয়সাই এখন খেলাপি হয়ে আছে। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ অর্থনীতিতে কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখছে না; বরং আমানতকারীদের অর্থও ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে।
এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। মনে হচ্ছে, যত বড় খেলাপি, তত বড় ছাড়। এক হাজার কোটি টাকার বেশি খেলাপি ঋণের ক্ষেত্রে পুনঃতফসিল বা নবায়নের পর ঋণ পরিশোধের জন্য ১৫ বছর পর্যন্ত সময় দেওয়া হচ্ছে। এমনকি পুনঃতফসিলের পর প্রথম দুই বছর কোনো কিস্তি পরিশোধ করতে হবে না। বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি এ সুযোগ দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। অথচ এক হাজার কোটি টাকার কম খেলাপি ঋণের ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে কম সুযোগ রাখা হয়েছে।
প্রশ্ন হলো, অতীতে দেওয়া এত নীতিসহায়তার পরও খেলাপি ঋণ কেন কমছে না? ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ কমাতে পুনঃতফসিলসহ বিভিন্ন ধরনের নীতিসহায়তা দিয়ে আসছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এসব সুযোগ নিয়ে গত বছর রেকর্ড প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকার ঋণ পুনঃতফসিল করা হয়েছে। চলতি বছরও সেই ধারা অব্যাহত রয়েছে। কিন্তু পুনঃতফসিলের পরও খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমার পরিবর্তে বাড়ছে। অর্থাৎ, কাগজে-কলমে ঋণ পুনঃতফসিল হলেও বাস্তবে ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হচ্ছে না।
দেশে ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ না করার প্রবণতা অনেকটাই সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। বছরের পর বছর বিভিন্ন ধরনের নীতিছাড় ও সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার পরও অনেক খেলাপি ঋণগ্রহীতা ব্যাংকের অর্থ পরিশোধে এগিয়ে আসছেন না। ফলে নীতিসহায়তা দিয়ে সমস্যার সমাধান তো হচ্ছেই না, বরং এক ধরনের নৈতিক ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে—সময়মতো ঋণ পরিশোধ না করলেও শেষ পর্যন্ত আরও সুযোগ পাওয়া যাবে, এমন ধারণা প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এই নমনীয় নীতিরও একটি সীমা থাকা প্রয়োজন। কারণ বছরের পর বছর ঋণখেলাপিদের প্রতি উদারতা দেখিয়েও সংকটের সমাধান হয়নি। বরং খেলাপি ঋণের বোঝা আরও বেড়েছে। এতে নিয়মিত ঋণ পরিশোধকারী ব্যবসায়ী ও ঋণগ্রহীতারা নিরুৎসাহিত হচ্ছেন এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা দুর্বল হচ্ছে। অপরাধ ও অপরাধীকে বারবার প্রশ্রয় দেওয়া হলে ঋণখেলাপির প্রবণতা কমার পরিবর্তে আরও উৎসাহিত হওয়ার আশঙ্কাই বেশি।
অবশ্য খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির পেছনে শুধু ঋণগ্রহীতার অনিচ্ছাকেই দায়ী করলে পুরো চিত্রটি পাওয়া যাবে না। দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট, উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক চাপও অনেক প্রতিষ্ঠানের ঋণ পরিশোধ সক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। তাই খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে একদিকে যেমন ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে, অন্যদিকে শিল্প ও ব্যবসার জন্য বিদ্যুৎ-জ্বালানি সরবরাহের স্থায়ী সমাধানও নিশ্চিত করতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া নীতিসহায়তা বাস্তবে কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে, সেটিও খতিয়ে দেখা দরকার। অনেক ক্ষেত্রে পুনঃতফসিল বা অন্যান্য নীতিসুবিধা দেওয়ার পরও ঋণের ওপর সুদ যুক্ত হতে থাকে। ফলে কাগজে ঋণ পুনঃতফসিল হলেও মোট দায়ের পরিমাণ বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে ওই ঋণ আবারও খেলাপিতে পরিণত হয়। ফলে শুধু পুনঃতফসিল করে খেলাপি ঋণের সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে প্রথমেই ব্যাংকিং খাতকে শক্তিশালী করতে হবে। এজন্য প্রয়োজন আমূল সংস্কার, সুশাসন নিশ্চিত করা এবং দুর্বল ব্যাংকগুলোকে একীভূত করে শক্তিশালী ব্যাংক গড়ে তোলা। বেসরকারি খাতের কয়েকটি ব্যাংক একীভূত করে একটি ব্যাংক গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একইভাবে দুর্বল সরকারি ব্যাংকগুলোকেও প্রয়োজন অনুযায়ী একীভূত করে শক্তিশালী ও কার্যকর ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার উদ্যোগ নিতে হবে।
বছরের পর বছর জনগণের অর্থ থেকে সরকারি ব্যাংকগুলোকে মূলধন জোগান দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সেই অর্থের বিনিময়ে ব্যাংকগুলোর আর্থিক সক্ষমতা ও ঋণ আদায়ের ব্যবস্থায় কাঙ্ক্ষিত উন্নতি হয়নি। তাই এখন আর ঢালাওভাবে মূলধন জোগান বা নীতিছাড় দিয়ে সমস্যাকে সাময়িকভাবে আড়াল করার সুযোগ নেই। দেশের অর্থনীতি ও আমানতকারীদের স্বার্থে সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে কঠোর এবং দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
Comments