নেপালে ভয়াবহ বন্যা, বাংলাদেশে নেপালের বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ
নেপালে ভোতেকোশি নদীর আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে একাধিক জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশে নেপালের বিদ্যুৎ সরবরাহেও। ক্ষতিগ্রস্ত প্রকল্প দুটির উৎপাদন বন্ধ থাকায় ভারতের সঞ্চালনব্যবস্থা ব্যবহার করে বাংলাদেশে নেপালের বিদ্যুৎ রপ্তানি কার্যত শূন্যে নেমে এসেছে।
বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে নেপালের সংবাদমাধ্যম 'কাঠমান্ডু পোস্ট'।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২৬ আগস্টের ভয়াবহ বন্যায় বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য অনুমোদিত দুটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রকল্প দুটি হলো ২২ দশমিক ১ মেগাওয়াট ক্ষমতার চিলিমে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এবং ২৪ মেগাওয়াটের ত্রিশূলী জলবিদ্যুৎ প্রকল্প। দুর্যোগের পর থেকেই উভয় প্রকল্পে বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ রয়েছে।
নেপাল ইলেকট্রিসিটি অথরিটির (এনইএ) ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক দীর্ঘায়ু কুমার শ্রেষ্ঠ জানান, বাংলাদেশে বিদ্যুৎ রপ্তানির জন্য নির্ধারিত দুটি প্রকল্পই বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ কারণে সচল অন্য কোনো প্রকল্প থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ পাঠানোর অনুমতি দিতে ভারতের কাছে আবেদন করা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে নেপালের বিদ্যুৎ রপ্তানির পরিমাণ প্রায় শূন্য।
বর্ষা মৌসুমে নেপালের নদীগুলোতে পানির প্রবাহ বেড়ে যাওয়ায় সাধারণত জলবিদ্যুৎ উৎপাদনও বৃদ্ধি পায়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বর্ষায় দেশটি গড়ে প্রায় ১ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ রপ্তানি করেছে। বিদ্যুৎ রপ্তানির মাধ্যমে আঞ্চলিক বাজারে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার পরিকল্পনাও ছিল নেপালের। কিন্তু এবারের বন্যায় উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে প্রায় ৬৫০ মেগাওয়াটে নেমে এসেছে।
বাংলাদেশে নেপালের বিদ্যুৎ আমদানির পথ তৈরি হয় ২০২৪ সালের ৫ জানুয়ারি। ওই দিন নেপাল ইলেকট্রিসিটি অথরিটি, ভারতের এনটিপিসি বিদ্যুৎ ব্যাপার নিগম লিমিটেড (এনভিভিএন) এবং বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) মধ্যে ত্রিপক্ষীয় চুক্তি সই হয়। চুক্তির আওতায় প্রতিবছর ১৫ জুন থেকে ১৫ নভেম্বর পর্যন্ত নেপাল থেকে বাংলাদেশে ৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহের কথা রয়েছে।
এরপর ২০২৫ সালের ২৭ নভেম্বর ঢাকায় অনুষ্ঠিত জয়েন্ট স্টিয়ারিং কমিটির (জেএসসি) বৈঠকে বিদ্যমান ৪০ মেগাওয়াটের সঙ্গে আরও ২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যুক্ত করার বিষয়ে বাংলাদেশ ও নেপাল নীতিগতভাবে একমত হয়। তবে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ ভারতের সঞ্চালনব্যবস্থা দিয়ে বাংলাদেশে পাঠানোর অনুমোদন এখনো মেলেনি।
'কাঠমান্ডু পোস্ট' জানিয়েছে, চিলিমে প্রকল্প থেকে ২১ দশমিক ৪ মেগাওয়াট এবং ত্রিশূলী প্রকল্প থেকে ১৮ দশমিক ৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ভারতে বিক্রির অনুমোদন ছিল। একই সঙ্গে ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহার করে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্যও প্রকল্প দুটি অনুমোদিত ছিল।
ভোতেকোশি নদীর বন্যায় শুধু বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহের সঙ্গে যুক্ত প্রকল্পগুলোই ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। নেপালের আরও কয়েকটি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রও ক্ষতির মুখে পড়েছে। দুর্যোগের পর থেকে দেশটির অন্তত ১২টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ রয়েছে।
বন্যার কারণে নেপালের বিদ্যুৎ রপ্তানি খাতেও বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশটি বাংলাদেশ ও ভারতের কাছে ২ হাজার ৯৩২ কোটি নেপালি রুপির বিদ্যুৎ বিক্রি করে। একই সময়ে শুষ্ক মৌসুমে ভারত থেকে ১ হাজার ২৩ কোটি রুপির বিদ্যুৎ আমদানি করা হয়। এরপরও বিদ্যুৎ বাণিজ্যে নেপালের নিট উদ্বৃত্ত ছিল ১ হাজার ৯০৯ কোটি রুপি।
বর্তমানে ক্ষতিগ্রস্ত বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সঞ্চালন অবকাঠামো পুনরুদ্ধারে কাজ করছে নেপাল ইলেকট্রিসিটি অথরিটি। একই সঙ্গে সচল অন্য কোনো বিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে বাংলাদেশে সরবরাহের জন্য ভারতের অনুমোদন পাওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে দেশটি।
গত ২৬ আগস্ট নেপালের তিব্বত সীমান্তবর্তী হিমালয় অঞ্চলে ভোতেকোশি নদীতে আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের ঘটনা ঘটে। এতে নদীর আশপাশের জনবসতি, সড়ক, সেতু ও বিভিন্ন স্থাপনা ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বন্যার পানির সঙ্গে কাদা, পাথর ও ধ্বংসাবশেষ নেমে এসে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়। পরে সেই পানি ত্রিশূলী নদীতেও প্রবাহিত হয়।
প্রবল স্রোতে মানুষ, যানবাহন ও বিভিন্ন স্থাপনা ভেসে যায়। এতে ব্যাপক প্রাণহানি ও নিখোঁজের ঘটনা ঘটেছে। 'দ্য হিন্দু'র প্রতিবেদনের বরাতে জানা গেছে, এই দুর্যোগে মৃতের সংখ্যা ১ হাজার ২৫০ জনে পৌঁছেছে। এখনো ৪ হাজারের বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
Comments