নেপালে ভয়াবহ বন্যায় লাশের স্তূপ, মর্গের সংকট ও গণকবর, নিখোঁজ হাজারো মানুষ
নেপালের উত্তরাঞ্চল ও তিব্বতের পাহাড়ি এলাকায় হিমবাহ ধসে সৃষ্ট ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার পাঁচ দিন পেরিয়ে গেলেও থামেনি স্বজনদের আহাজারি। বন্যার তোড়ে ভেসে যাওয়া শত শত বিকৃত মরদেহের ভিড়ে প্রিয়জনের কোনো একটি চিহ্ন খোঁজার মরিয়া চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন দূরদূরান্ত থেকে ছুটে আসা মানুষেরা। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে, মর্গের অভাবে এবং মরদেহ পচে যাওয়ার শঙ্কায় কর্তৃপক্ষ গণকবর দিতে বাধ্য হচ্ছে।
গত বুধবার নেপাল ও তিব্বতের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া এই আকস্মিক বন্যার সূত্রপাত হয় একটি বিশালাকার হিমবাহ পাহাড়ের গা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নিচে আছড়ে পড়ার মাধ্যমে।
হিমবাহ পতনের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে, কর্মকর্তারা শুরুতে একে শক্তিশালী ভূমিকম্প বলে মনে করেছিলেন। বিশাল জল ও কাদার স্রোত গ্রামবাসী, জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কর্মী এবং তীর্থযাত্রীসহ বিভিন্ন দেশের শত শত পর্যটককে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। রোববার রাত পর্যন্ত প্রায় ৮০০টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে এবং এখনো আড়াই হাজারের বেশি মানুষ নিখোঁজ। বন্যার তোড়ে পুরো শহর নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে, ধ্বংস হয়েছে সড়ক, সেতু ও যাবতীয় যোগাযোগব্যবস্থা।
বন্যার উৎপত্তিস্থল থেকে ১০০ মাইলেরও বেশি দূরে অবস্থিত ভারতপুর শহরে নদীর স্রোতে ভেসে আসছে শত শত লাশ। এত লাশ সংরক্ষণের সক্ষমতা নেপালের নেই।
চিতওয়ান জেলার পুলিশপ্রধান রামেশ্বর পাউডেল জানান, তাদের মর্গগুলোতে মাত্র ৩৬টি মরদেহ সংরক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে। উপায়ন্তর না দেখে ভারতপুরের একটি সরকারি ভবনকে অস্থায়ী মর্গে পরিণত করা হয়েছে। সেখানে একটিমাত্র শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র থাকায় শুষ্ক বরফ দিয়ে পচন রোধের চেষ্টা চলছে।
নারী-পুরুষেরা ছোট একটি টেলিভিশন পর্দার দিকে তাকিয়ে নীরবে উদ্ধার হওয়া ২৭০টি মরদেহের ছবি দেখছেন, যার প্রায় সবগুলোরই পরিচয় এখনো অজানা। নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তার সমপদমর্যাদার কর্মকর্তাদের কাছে জরুরি ভিত্তিতে হিমায়িত সংরক্ষণযন্ত্র (ফ্রিজার) চেয়ে পাঠালেও তা সময়মতো পৌঁছায়নি।
বাধ্য হয়ে গণকবরের সিদ্ধান্ত
পানিতে দীর্ঘ সময় থাকা এবং বর্ষার গরমের কারণে মরদেহগুলো দ্রুত পচে যাচ্ছে। তাই বাধ্য হয়ে শহর থেকে ১০ মিনিটের দূরত্বের একটি বনাঞ্চলে গণকবরের ব্যবস্থা করা হয়েছে। সুরক্ষাবর্ম পরা নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা স্ট্রেচারে করে মরদেহ নামাচ্ছেন। প্রতিটি কবরের পরিচয়চিহ্ন হিসেবে কংক্রিটে ভরা পাত্রের মধ্যে সারি করে রাখা হচ্ছে ধাতব তৈরি নম্বরযুক্ত চিহ্ন। দাফনের আগে মরদেহের ছবি তোলা, শরীরের বিশেষ চিহ্ন বা পোশাকের বিবরণ লিখে রাখা এবং ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের কাজ করা হচ্ছে। শনিবার রাতে ৯৩টি এবং পরদিন আরও ১০০টি মরদেহ এভাবে দাফন করা হয়।
উদ্ধার অভিযানের মূল কেন্দ্রবিন্দু এখন রসুয়া ও নুওয়াকোট এলাকার জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গগুলো। সেনাবাহিনীর মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রাজা রাম বাসনেত জানান, ভারতীয় উদ্ধারকারী দলের সহায়তায় একটি সুড়ঙ্গের মুখ পাওয়া গেলেও তা পানিতে পূর্ণ। দ্বিতীয়টির খোঁজ পাওয়া আরও কঠিন।
নেপাল সেনাবাহিনী জীবিতদের সন্ধানে তাপ-শনাক্তকারী ড্রোন ব্যবহার করছে, তবে এখন পর্যন্ত কোনো প্রাণের স্পন্দন মেলেনি। বন্যার স্রোত এতটাই প্রবল ছিল যে, প্রায় এক ডজন মরদেহ শত শত মাইল দূরে ভারতেও ভেসে গেছে।
স্বজনদের বুকফাটা আর্তনাদ ও ফিকে হওয়া আশা
অস্থায়ী মর্গের বাইরে অপেক্ষারত পরিবারগুলোর গল্পগুলো অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। বীরেশ কুমার সাহ (১৭) আট ঘণ্টার বাসযাত্রা শেষে সিরাহা থেকে মর্গে পৌঁছান। তার বাবা (গণিতের শিক্ষক) এবং ছোট ভাই বন্যার স্রোতে ভেসে গেছেন। প্রথমে বিশ্বাস করতে না চাইলেও, বাবার এক সহকর্মীর চোখের সামনে ভেসে যাওয়ার বর্ণনায় তিনি এখন দিশেহারা।
রমেশ দাহাল (৩১) কাঠমান্ডুর সব হাসপাতালে খোঁজার পর তিনি ভারতপুরে এসেছেন তার ২১ বছর বয়সী গাইড ভাতিজা সুমান দাহালকে খুঁজতে। প্রথমে আশা ছিল ভাতিজা হয়তো সাইরেন শুনে উঁচু জঙ্গলে আশ্রয় নিয়েছে, কিন্তু এখন তিনি বুঝতে পারছেন, "তার মরদেহটা খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনাও হয়তো শূন্য দশমিক এক শতাংশ।"
Comments