রহস্যময় নারী, প্রশাসনের উদ্যোগে দেড় দশক পর উদ্ধার
দেড় দশক ধরে একবারের জন্যও ঘরের বাইরে যাননি। কারও সঙ্গে বলেননি একটি কথাও। স্বামীর মৃত্যুর পর বোরকা আর কাপড়ে নিজেকে মুড়িয়ে রেখেছেন জরাজীর্ণ একটি কুটিরে। গোসল কিংবা প্রাকৃতিক প্রয়োজন তিনি কোথায় সারেন, সেটিও জানে না আশপাশের কেউ।
দীর্ঘ ১৫ বছর পর সেই রহস্যময় নারীকে অবশেষে ঘর থেকে বের করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছে প্রশাসন।এ যেন জীবনের সঙ্গে দীর্ঘ এক নীরব যুদ্ধ।এমন ঘটনার সাক্ষী পটুয়াখালীর কলাপাড়া পৌর শহরের নাচনাপাড়া এলাকার মৃত আবুল কালামের বসতঘর। বছরের পর বছর অবহেলায় পড়ে থাকা ঘরটি প্রায় এক দশক আগেই হেলে পড়ে। চারপাশে জমে থাকা নর্দমার দুর্গন্ধযুক্ত পানি। বিদ্যুৎহীন ঘরটিতে ঠিকমতো দাঁড়ানোরও জায়গা নেই।
দেখলে মনে হয়, মানুষের বসবাসের চেয়ে বিষধর সাপ আর পোকামাকড়ের আশ্রয়স্থল হিসেবেই হয়তো ঘরটি বেশি উপযুক্ত।কিন্তু সেই ঘরেই স্বামীর মৃত্যুর পর দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে বাস করছিলেন ৬০ বছর বয়সী সালেহা বেগম।এই দীর্ঘ সময়ে একদিনের জন্যও তাকে ঘরের বাইরে যেতে দেখেননি কেউ। কারও সঙ্গে কথা বলেননি। বোরকা ও কাপড়ে নিজেকে মুড়িয়ে নিঃশব্দে পড়ে থেকেছেন অন্ধকার সেই কুটিরে।তার জীবন যেন থমকে গেছে ১৫ বছর আগের কোনো এক অজানা দিনে।গোসল কিংবা প্রাকৃতিক প্রয়োজনেও তাকে কখনো বাইরে বের হতে দেখেননি প্রতিবেশীরা। তিন বছর আগে ছেলে জিয়া ক্যান্সারে আক্রান্ত হলেও মায়ের এই নীরবতার দেয়াল ভাঙেনি।
মেয়ের হাতে দেওয়া খাবারও অনেক সময় ফিরিয়ে দেন তিনি।প্রতিদিন মায়ের জন্য খাবার নিয়ে যান মেয়ে লাকী বেগম। কিন্তু মায়ের এই অসহায় অবস্থার কথা বলতে গিয়ে বারবার ভারী হয়ে ওঠে তার কণ্ঠ।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন জরাজীর্ণ ঘর ধসে যে কোনো সময় ঘটতে পারে প্রাণহানি। অন্যদিকে নিজেও চর্মরোগসহ নানা শারীরিক সমস্যায় ভুগছেন লাকী। ক্যান্সারে আক্রান্ত ভাইয়ের চিকিৎসার খরচও তাদের পরিবারের জন্য বাড়তি বোঝা।
চিকিৎসা, ভাইয়ের চিকিৎসা, নতুন একটি ঘর নির্মাণ এবং মা সালেহা বেগমকে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার জন্য সরকারি সহযোগিতার আবেদন জানিয়েছেন প্রতিবেশীসহ স্বজনরা।
সালেহা বেগমকে ঘিরে স্থানীয়দের মাঝেও তৈরি হয়েছে নানা কৌতূহল। তবে কৌতূহলের চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে এখন উদ্বেগ। তাদেরও দাবি, দ্রুত চিকিৎসার মাধ্যমে এই নারীকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি অসহায় পরিবারটির পাশে দাঁড়ানো হোক।
কলাপাড়া উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা জহিরুল ইসলাম বলেন সালেহা বেগম ও তার পরিবারের জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতার করা হবে।
কলাপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডাঃ ববি মালাকার বলেন, দীর্ঘ দেড় দশকের ঘরবন্দি জীবনের অবসান ঘটিয়ে সালেহা বেগমকে ইতোমধ্যে উদ্ধার করা হয়েছে। এখন তাকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসার মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আরিফুজ্জামান বলেন শুধু সালেহা বেগম ই নয় ক্যান্সারে আক্রান্ত ছেলে জিয়ার চিকিৎসা এবং বসবাসের অনুপযোগী ভঙ্গুর ঘরটি সংস্কার বা নতুনভাবে নির্মাণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার হয়েছে।
১৫ বছর ধরে একটি অন্ধকার ঘরের ভেতর বন্দি ছিল একটি মানুষের জীবন।বাইরের পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন, কথা হারিয়ে ফেলা সেই সালেহা বেগম আজ আবার ফিরছেন আলোর পথে। তবে শুধু ঘর থেকে বের করে আনলেই শেষ নয়, চিকিৎসা, ভালোবাসা ও মানবিক সহায়তার মাধ্যমে তাকে ফিরিয়ে আনতে হবে স্বাভাবিক জীবনে।
Comments