একটি মৃত্যুর সাধারণীকরণ এবং রাষ্ট্রের নীরবতা
শনিবার সকালে জাতীয় সংসদ ভবনের মতো দেশের অন্যতম নিরাপদ ও সুরক্ষিত এলাকার সামনে ছিনতাইকারীর টানে রিকশা থেকে পড়ে নিহত হয়েছেন একজন প্রধান শিক্ষিকা। চিকিৎসা নিতে গ্রামে থেকে সকালে তিনি ঢাকায় এসেছিলেন। জীবনের নিরাপত্তার তাগিদেই হয়তো তিনি চিকিৎসকের কাছে যাচ্ছিলেন, কিন্তু পথের মাঝেই শেষ হয়ে গেল তাঁর পথচলা।
কয়েক দিন আগেই আসাদ গেটে একই কায়দায় ছিনতাইকারীর কবলে পড়ে প্রাণ হারিয়েছিলেন একজন মা। এসব ঘটনার মধ্যে কোনো মৌলিক পার্থক্য নেই। পার্থক্য শুধু মানুষের নাম এবং তারিখের। রাজপথে ছিনতাইকারীর টানে রিকশা থেকে ছিটকে পড়া, মাথায় চোট পাওয়া এবং রক্তে পিচঢালা পথ ভিজে যাওয়া-এই দৃশ্যপট আজ আর কাউকে চমকে দেয় না। ঘটনাগুলো এখন অতি চেনা, অতি সাধারণ। যেন এক চরম সামাজিক ও প্রশাসনিক অবক্ষয়ের ভেতর দিয়ে আমরা পার হচ্ছি, যেখানে প্রতিদিনের ভয়ংকর অপরাধগুলোও অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।
পরিবারের কাছে এই প্রতিটি জীবনের গুরুত্ব অপরিসীম। নিহত শিক্ষিকার ঘরে সন্তান আছে, স্বামী আছে, স্বজন আছে, যারা সারা জীবন এই শূন্যতা বহন করবে। তিনি কেবল একজন মানুষ ছিলেন না, ছিলেন একটি পরিবারের অভিভাবক এবং সমাজের আলো ছড়ানো একজন শিক্ষক। তাঁর জীবনের মূল্য স্বজনদের কাছে অমূল্য। কিন্তু ব্যবস্থার মারপ্যাঁচে এবং রাষ্ট্রের হিসাব-নিকাশে কি এই জীবনের কোনো দাম আছে?
একজন নাগরিক যখন ভোরে বা সকালে কোনো কাজে ঘর থেকে বের হন, তখন তিনি রাষ্ট্রের ওপর বিশ্বাস রেখেই পথে নামেন। কিন্তু যখন দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সংরক্ষিত এলাকাগুলোর সামনেই নাগরিকদের জীবন এভাবে ছিনতাইকারীর হাতে সঁপে দেওয়া হয়, তখন সেই বিশ্বাস গুঁড়িয়ে যায়। এই ধরনের প্রতিটি মৃত্যুর পর পরিবারগুলো রাষ্ট্রের কাছ থেকে পায় কেবল দীর্ঘসূত্রতা, তদন্তের আশ্বাস আর একসময় বিস্মৃতি। কোনো সুষ্ঠু বিচার, সান্ত্বনা কিংবা প্রতিদান তাদের কাছে পৌঁছায় না।
প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তা বা গাফিলতি যখন নিয়মিত চিত্র হয়ে দাঁড়ায়, তখন নাগরিকদের মনে একটাই প্রশ্ন জাগে—মানুষ কি তাহলে আর কখনোই নিরাপদ বোধ নিয়ে ঘর থেকে বের হবে না? রুটি-রুজি, চিকিৎসা কিংবা সামাজিক প্রয়োজনে মানুষকে বাইরে আসতেই হবে। কিন্তু প্রতি পদে যদি মৃত্যুকে হাতছানি দিতে হয়, তবে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের নাগরিক পরিচয়ের মূল ভিত্তিই নড়বড়ে হয়ে পড়ে। অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়া এবং সড়ক ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার মৌলিক উন্নয়ন না ঘটায় অপরাধীরা দিন দিন আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে।
এই অবক্ষয় কেবল আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার ব্যর্থতা নয়, এটি রাষ্ট্রের প্রতি জনগণের অনাস্থার প্রতীক। একটি শিক্ষিকার মৃত্যু, একজন মায়ের করুণ পরিণতি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারলে কোনো উন্নয়নই অর্থবহ নয়। বিচারহীনতার সংস্কৃতি আর কত পরিবারকে নিঃস্ব করবে? প্রতিটি নাগরিকের জীবনের মূল্য নিশ্চিত করা এবং রাজপথকে নিরাপদ করা রাষ্ট্রের প্রাথমিক দায়িত্ব—এই সত্যটি পুনরুদ্ধার করা এখন সময়ের দাবি।
Comments