নাইয়ারা নূর : বুলবুল-এ-পাকিস্তান
সঙ্গীতে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা ছিলো না। কোনো ওস্তাদের কাছে বছরের পর বছর তালিম নেননি, কোনো মিউজিক একাডেমির সার্টিফিকেটও ছিলো না। অথচ একাডেমিক পড়াশোনা মানুষ সাধারণত যে উদ্দেশ্যে করে - নিজের ভেতরের প্রতিভাকে শাণিত করে তাকে পূর্ণতা দেওয়ার জন্য। সেই গুণটি তাঁর কণ্ঠে ছিল খোদা প্রদত্ত।
তাই হয়তো নাইয়ারা নূরকে শুধু একজন গায়িকা বললে তাঁর প্রতি অবিচার করা হয়। আপনি তাঁর কোনো গজল শুনতে শুরু করলে মনে হবে, গানটি যেন বাইরে কোথাও বাজছে না; বরং আপনার নিজের ভেতর থেকেই কেউ একজন ধীরে ধীরে গেয়ে উঠছে। কখনো বিষণ্ণতা, কখনো প্রেম, কখনো বিরহ, আপনার সমস্ত অনুভূতিকে যেন তিনি সুরের ছন্দে দোল খাওয়াচ্ছেন।
বলছি কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী নাইয়ারা নূর-এর কথা। ভালোবেসে যাকে পাকিস্তান বলেছে "Bulbul-e-Pakistan", "Nightingale of Pakistan."
আসামের মেয়ে থেকে পাকিস্তানের 'বুলবুল':
নাইয়ারা নূরের জন্ম ১৯৫০ সালের ৩ নভেম্বর, ভারতের আসাম রাজ্যের গুয়াহাটিতে। তার পরিবার মূলত পাঞ্জাবের অমৃতসর অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত ছিল। তাঁর বাবা ছিলেন ব্যবসায়ী এবং অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগের সদস্য। এমনকি দেশভাগের আগে আসামে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ সফরে গেলে তিনি তাঁদের বাড়িতে আতিথ্য গ্রহণ করেছিলেন বলে বিভিন্ন জীবনীমূলক গ্রন্থে উল্লেখ আছে।
দেশভাগের কয়েক বছর পর, ১৯৫৭ সালে তাঁর মা সন্তানদের নিয়ে পাকিস্তানে চলে যান। নাইয়ারা তখন মাত্র সাত বছর বয়সী। পরিবারটি প্রথমে করাচিতে বসতি স্থাপন করে। তাঁর বাবা অবশ্য সম্পত্তির দেখাশোনার কারণে আরও বহু বছর আসামেই থেকে যান এবং পরবর্তীতে পাকিস্তানে যোগ দেন। নতুন দেশে, নতুন পরিবেশে বেড়ে উঠতে উঠতেই তাঁর ভেতরের আরেকটি জগত বেড়ে উঠেছিলো। সেটি সঙ্গীতের।
ছোটবেলায় তিনি শুনতেন বেগম আখতার, কানন দেবী ও লতা মঙ্গেশকর। বিশেষ করে বেগম আখতারের গজল ও ঠুমরি তাঁকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিলো। অন্যদিকে কানন দেবীর ভজনও তাঁর শৈশবের শ্রুতিজগতের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিলো। কিন্তু তখনও তিনি জানতেন না, একদিন এই শোনা গানই তাঁর নিজের কণ্ঠে এমনভাবে ফিরে আসবে যে একটি দেশ তাঁকে নিজেদের সঙ্গীত ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে গ্রহণ করবে।
কোনো তালিম নয়, প্রতিভাই ছিলো তাঁর প্রথম শিক্ষকঃ
নাইয়ারা নূরের গল্পের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক এখানেই। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সঙ্গীত শেখেননি। তাঁর কণ্ঠের যে স্বাভাবিক মাধুর্য, স্বরক্ষেপণের যে নিজস্বতা এবং কবিতার শব্দকে অনুভব করে গাওয়ার যে ক্ষমতা এসব ছিল তাঁর সহজাত।
লাহোরের National College of Arts (NCA)-এ পড়ার সময়ই তাঁর গানের প্রতিভা প্রথম বড়ভাবে সামনে আসে। ১৯৬৮ সালের দিকে একটি অনুষ্ঠানে বন্ধু ও শিক্ষকদের সামনে তিনি গান করছিলেন। সেখানে ইসলামিয়া কলেজের অধ্যাপক আসরার আহমদের নজরে পড়ে তাঁর কণ্ঠ। তিনিই তাঁকে Radio Pakistan-এর অনুষ্ঠানে গান গাওয়ার সুযোগ করে দেন।
অর্থাৎ, নাইয়ারা নূর পেশাদার গায়িকা হওয়ার পরিকল্পনা করে গানের জগতে আসেননি। বরং গান তাঁকে খুঁজে নিয়েছিলো। তিনি নিজেও একসময় বলেছেন, পেশাদারভাবে গান গাওয়া তাঁর পরিকল্পনা ছিল না; ঘটনাচক্রেই একজন অধ্যাপকের উৎসাহে তাঁর যাত্রা শুরু হয়। এই জায়গাটাই নাইয়ারা নূরের গল্পকে অন্যরকম করে তোলে।
কিছু মানুষ গান শেখেন। আর কিছু মানুষের মধ্যে গান নিজেই জন্ম নেয়। নাইয়ারা নূর ছিলেন দ্বিতীয় দলের মানুষ। Radio Pakistan থেকে টেলিভিশন, তারপর চলচ্চিত্র Radio Pakistan-এর মাধ্যমে তাঁর কণ্ঠ পরিচিত হতে শুরু করে।
১৯৭১ সালে তিনি পাকিস্তানি টেলিভিশনে গান গাওয়া শুরু করেন। Shoaib Hashmi-র অনুষ্ঠান Taal Matol ও Sach Gup-এর মতো অনুষ্ঠান তাঁকে দ্রুত পরিচিত করে তোলে। এরপর আসে চলচ্চিত্রে playback singing।
১৯৭৩ সালে Gharana চলচ্চিত্রের জন্য তিনি Nigar Award for Best Female Playback Singer লাভ করেন। একই সময় তাঁর কণ্ঠে চলচ্চিত্রের গানও জনপ্রিয় হতে থাকে।
"Tera Saaya Jahan Bhi Ho Sajna, Palkain Bichha Doon"—Gharana চলচ্চিত্রের এই গান তাঁর playback career-এর অন্যতম স্মরণীয় কাজ। এরপর Aina, Mastana, Farz Aur Mamta, Phool Mere Gulshan Ka সহ বিভিন্ন চলচ্চিত্রে তাঁর কণ্ঠ ব্যবহৃত হয়।
তবে চলচ্চিত্রের জনপ্রিয়তার চেয়েও শেষ পর্যন্ত নাইয়ারা নূরের নামটি সবচেয়ে গভীরভাবে জড়িয়ে যায় গজল ও উর্দু কবিতার সঙ্গে। বেগম আখতারের ছায়া, কিন্তু কণ্ঠ ছিলো একান্তই তাঁর নিজের। বেগম আখতার ছিলেন তাঁর অন্যতম বড় অনুপ্রেরণা। কিন্তু নাইয়ারা নূর কখনো বেগম আখতারের অনুকরণে আটকে থাকেননি। বরং অনুপ্রেরণাকে নিজের কণ্ঠের স্বাতন্ত্র্যে রূপান্তর করেছিলেন।
তাঁর কণ্ঠে একটা অদ্ভুত বিষণ্ণতা ছিলো। খুব বেশি নাটকীয় নয়, আবার একেবারে নির্লিপ্তও নয়। Dawn-এর একটি স্মরণলেখায় তাঁর কণ্ঠকে মিষ্টি অথচ রহস্যময় বিষণ্ণতায় ভরা বলা হয়েছে। তাঁর স্বাভাবিক nasal quality-টিকেও তিনি গানের সূক্ষ্মতার সঙ্গে ব্যবহার করতেন। তাঁর গানের সবচেয়ে বড় শক্তি সম্ভবত এখানেই যে তিনি শব্দকে কখনো হত্যা করেননি।
একজন কবির লেখা গাইলে তিনি কবিতাটাকে নিজের করে নিতেন ঠিকই, কিন্তু কবির অনুভূতিকে কখনো চাপা দিতেন না।
ফয়েজ, গালিব, মোমিন, নাসির—কবিতার কাছে তাঁর আত্মসমর্পণঃ
নাইয়ারা নূরের কণ্ঠে উর্দু সাহিত্যের অনেক বড় কবির কবিতা নতুন জীবন পেয়েছে। Faiz Ahmed Faiz ছিলেন তাঁর বিশেষ প্রিয় কবি। ১৯৭৬ সালে প্রকাশিত Nayyara Sings Faiz অ্যালবাম তাঁর ক্যারিয়ারের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক হয়ে দাঁড়ায়। ফয়েজের কবিতা তাঁর কণ্ঠে এমনভাবে জনপ্রিয় হয় যে পরবর্তীকালে নাইয়ারা নূর এবং ফয়েজ—এই দুটি নামকে আলাদা করা কঠিন হয়ে পড়ে।
"Hum Ke Thehre Ajnabi Itni Mulaqaton Ke Baad" তাঁর সবচেয়ে স্মরণীয় পরিবেশনাগুলোর একটি। আরেকটি অনন্য পরিবেশন-
"Aaj Bazaar Mein Pa-Ba-Jaulan Chalo"
ফয়েজের বিদ্রোহ, বেদনা ও আত্মমর্যাদার যে আবহ, নাইয়ারা নূর সেটিকে কোনো অতিনাটকীয়তা ছাড়াই কণ্ঠে ধারণ করেছিলেন।
তিনি গেয়েছেন মির্জা গালিব, মোমিন খান মোমিন, নাসির কাজমি, আখতার শিরানি, ইবনে ইনশা-সহ বহু কবির লেখা। এই কারণেই তাঁর গান শুধু গান না, উর্দু কবিতার এক ধরনের শ্রুতিময় সংরক্ষণও হয়ে আছে।
তাঁর কিছু গান শুনতেই হবেঃ
নাইয়ারা নূরকে যদি নতুন করে আবিষ্কার করতে চান, শুরু করতে পারেন এই গানগুলো দিয়ে—
Ae Jazba-e-Dil Gar Main Chahoon—Behzad Lucknavi-এর লেখা; এটি তাঁর signature ghazal হিসেবে ব্যাপকভাবে পরিচিত।
Hum Ke Thehre Ajnabi Itni Mulaqaton Ke Baad — Faiz Ahmed Faiz
Aaj Bazaar Mein Pa-Ba-Jaulan Chalo — Faiz Ahmed Faiz
Mere Qatil Mere Dildar Mere Paas Raho — Faiz Ahmed Faiz
Aye Ishq Hamein Barbaad Na Kar — Akhtar Shirani
Woh Jo Hum Mein Tum Mein Qarar Tha — Momin Khan Momin
Kabhi Hum Bhi Khoobsurat Thay
Watan Ki Mitti Gawah Rehna
Sohni Dharti
Roothay Ho Tum Tum Ko Kaisay Manaaun Piya — Aina
Mujhe Dil Se Na Bhulana — Aina
Tera Saaya Jahan Bhi Ho Sajana — Gharana
বিশেষ করে "Ae Jazba-e-Dil", "Aaj baazar mein" আর "Aye Ishq Hamein Barbaad Na Kar"—এই তিনটি গান শুনলে নাইয়ারা নূরের কণ্ঠের তিনটি আলাদা রূপ বোঝা যায়।
একই কণ্ঠ যে মুহূর্তে প্রেমের গজলে কোমল, সেই কণ্ঠই আবার দেশাত্মবোধক, সমসাময়িক সব গানে হয়ে উঠেছে দৃঢ় ও আবেগপূর্ণ।
শুধু গায়িকা নন, একজন মাঃ
নাইয়ারা নূরের সংগীত-উত্তরাধিকার শুধু তাঁর রেকর্ডে থেমে থাকেনি। তাঁর দুই ছেলে—Naad-e-Ali Zaidi এবং Jaffer Zaidi দুজনেই সংগীতের সঙ্গে যুক্ত হন। জাফর জাইদি পরবর্তীতে পাকিস্তানের জনপ্রিয় contemporary semi-classical band Kaavish-এর lead vocalist ও pianist হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন। বাংলাদেশে Kaavish পাকিস্তানি যেকোন ব্যান্ড এর চেয়ে বেশী সমাদৃত।
Kaavish-এর অফিসিয়াল ওয়েবসাইটেও নাইয়ারা নূরকে স্মরণ করে তাঁদের পরিবেশনার উল্লেখ রয়েছে। এমনকি Faiz-এর লেখা "Raat Yun Dil Mein Teri", যা মূলত নাইয়ারা নূরের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত, Kaavish পরবর্তীতে live পরিবেশন করেছে। অর্থাৎ, মায়ের কণ্ঠের যে সুর একসময় একটি প্রজন্মকে আন্দোলিত করেছিলো, সেই সুরের উত্তরাধিকার পরবর্তী প্রজন্মেও বেঁচে থেকেছে।
খ্যাতির শীর্ষে থেকেও ছিলেন নিভৃতচারীঃ
নাইয়ারা নূরের ব্যক্তিত্বের আরেকটি সুন্দর দিক ছিল তাঁর আত্মপ্রচারবিমুখতা। তিনি খুব বেশি সাক্ষাৎকার দিতেন না। খ্যাতিকে নিজের জীবনের কেন্দ্রও বানাননি। বরং একসময় পেশাদারভাবে গান গাওয়া থেকে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
২০১২ সালে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে পেশাদার সংগীতজীবন থেকে অবসর নেন। তাঁর কাছে গান ছিল গভীর ভালোবাসা ও passion, কিন্তু জীবনের একমাত্র অগ্রাধিকার নয়। পরবর্তী সময়ে তিনি মূলত পরিবার ও ব্যক্তিজীবনেই মন দেন। এই জায়গাটিও তাঁকে আজকের অনেক তারকার থেকে আলাদা করে। তিনি যতটা গান রেখে গেছেন, তার চেয়ে অনেক বেশি গান রেখে যেতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি।
সম্ভবত তিনি জানতেন, সবকিছু বেশি করে করতে হয় না; কিছু জিনিস কম করেও চিরস্থায়ী করে যাওয়া যায়।
স্বীকৃতিঃ
তাঁর অবদানের স্বীকৃতিও এসেছে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে।
১৯৭৩ সালে Gharana-এর জন্য তিনি Nigar Award লাভ করেন। এছাড়া All Pakistan Music Conference-এর আসরে তিনি তিনটি Gold Medal অর্জন করেন। ২০০৬ সালে পাকিস্তান সরকার তাঁকে দেশের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ বেসামরিক সম্মান Pride of Performance প্রদান করে।
তাঁর পরিচয়ের সঙ্গে "Bulbul-e-Pakistan" নামটিও স্থায়ীভাবে যুক্ত হয়ে যায়।
শেষ অধ্যায়ঃ
২০২২ সালের ২০ আগস্ট করাচিতে ৭১ বছর বয়সে নাইয়ারা নূর মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর চলে যাওয়ার খবর পাকিস্তানের পাশাপাশি ভারত ও উপমহাদেশের সংগীতপ্রেমীদের মধ্যেও গভীর শোক তৈরি করে।
কিন্তু কিছু কণ্ঠের মৃত্যু হয় না। মানুষ চলে যায়।
সময় বদলে যায়। প্রজন্ম বদলে যায়।
কিন্তু কোনো এক রাতে আপনি যখন হেডফোনে শুনবেন;
"Hum ke thehre ajnabi…"
অথবা খুব নিঃশব্দে বাজবে—
"Ae Jazba-e-Dil Gar Main Chahoon…"
তখন হয়তো মনে হবে, কোথাও কিছুই বদলায়নি।
একজন নারী এখনও ধীরে ধীরে গান গাইছেন।
কণ্ঠে মিশে আছে প্রেম, বিষণ্ণতা, বিরহ।
সঙ্গীতে তাঁর কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকলেও তাঁর কণ্ঠ যেন নিজেই ছিল এক বিশ্ববিদ্যালয়। তিনি কোনো গানের কাছে নিজেকে বড় করে দেখাননি। বরং কবিতাকে বড় করেছেন, সুরকে বড় করেছেন, অনুভূতিকে বড় করেছেন। আর এ কারণেই নাইয়ারা নূর শুধু পাকিস্তানের একজন জনপ্রিয় গায়িকা নন।
তিনি উপমহাদেশের সেই বিরল শিল্পীদের একজন, যাঁদের কণ্ঠ শুনলে মনে হয়__
গানটা তিনি গাইছেন না; গানটাই যেন তাঁকে দিয়ে নিজেকে প্রকাশ করছে।
নাইয়ারা নূর চলে গেছেন ২০২২ সালের ২০ আগস্ট।
আজও তাঁর কণ্ঠ রয়ে গেছে। যতদিন মানুষ প্রেমে পড়বে, বিচ্ছেদে কাঁদবে, কবিতা পড়বে কিংবা কোনো এক নির্জন রাতে নিজের ভেতরের মানুষের সঙ্গে কথা বলবে, ততদিন নাইয়ারা নূরের মতো কণ্ঠের প্রয়োজন ফুরাবে না।
Comments