যে কারণে হামের বিস্তার, জানালো গবেষণার তথ্য
গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৬ সালে ছড়িয়ে পড়া হামের মূল কারণ ভাইরাসের নতুন কোনো রূপ নয়, বরং বিশ্ব জুড়ে প্রচলিত তীব্র সংক্রামক 'বি৩' ধরনের বিস্তার এবং টিকাদান ও মাতৃদুগ্ধের অ্যান্টিবডির ঘাটতি। বিশেষ করে ৯ মাস বয়সের আগেই মায়ের দেওয়া রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দ্রুত কমে যাওয়ায় এবং নিয়মিত টিকাদানে অবহেলার ফলে ছয় থেকে ৯ মাস বয়সি অপুষ্ট শিশুরা সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত ও মৃত্যুর ঝুঁকিতে পড়েছে।
গতকাল বুধবার বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে আয়োজিত 'হামের বিস্তার ও জিনগত নজরদারি' বিষয়ক কর্মশালা এবং গবেষণা অনুদান প্রদান অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। এতে হাসপাতালটির রোগতত্ত্ব ও গবেষণা বিভাগ এবং আইসিডিডিআর,বির যৌথ গবেষণার ফলাফলে এসব তথ্য উঠে আসে।
এদিকে, হাম উপসর্গে গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে আরো চার শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছে ১ হাজার ১৮ জন। এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হাম ও উপসর্গে মোট মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল ৯২২ জনে। এর মধ্যে নিশ্চিত হামে মৃত্যু হয়েছে ৯৯ জনের এবং হামের উপসর্গে মৃত্যু হয়েছে ৮২৩ জনের। গতকাল বুধবার (১৯ আগস্ট) বিকালে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হামের পরিস্থিতি বিষয়ক নিয়মিত প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়। প্রতিবেদন বলছে, মঙ্গলবার সকাল ৮টা থেকে বুধবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টা সময়ের তথ্য জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ভর্তি ১ হাজার ১৮ জনের মধ্যে নিশ্চিত হাম রোগীর সংখ্যা ৮৭ জন। এ নিয়ে চলতি বছর নিশ্চিত হাম রোগীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৮ হাজার ৭৬ জনে। অন্যদিকে গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ মিলেছে ৯৩১ জনের শরীরে। এ নিয়ে ১৫ মার্চ থেকে ১৯ আগস্ট পর্যন্ত মোট হাম উপসর্গ দেখা গেছে ১ লাখ ৪৫ হাজার ৭১১ জনের মধ্যে। প্রতিবেদন আরো বলছে, গত ১৫ মার্চ থেকে ১৯ আগস্ট পর্যন্ত হাম উপসর্গে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১ লাখ ২৭ হাজার ৭৬ জন। একই সময়ে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছে ১ লাখ ২২ হাজার ৮০৫ জন।
গবেষণার ফলাফল প্রকাশ ঐ অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিত বলেছেন, আইসিইউ বা ভেন্টিলেটর দিয়ে নয়, সঠিক সময়ে কার্যকর টিকাদানের মাধ্যমেই কেবল হামের মতো মারাত্মক সংক্রামক রোগের বিস্তার ও মৃত্যু ঠেকানো সম্ভব।
স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী বলেন, ২০২৪ সালের টিকাদান ক্যাম্পেইনে সময় মতো উদ্যোগ না নেওয়া এবং নীতিগত গাফিলতির কারণে যে অনাক্রম্যতার ঘাটতি তৈরি হয়েছিল, তারই ফল আজকের এই মহামারি। হাজারটা ভেন্টিলেটর বা আইসিইউ বেড বসিয়ে এই মৃত্যুর ঢল থামানো যাবে না। প্রতিরোধ এবং টিকাদানই এর একমাত্র সমাধান।
অবাস্তব আশ্বাসের সুযোগ নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, টিকাদানের গতি শতভাগ বাড়ালেও প্রাদুর্ভাব পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসতে আরো দুই থেকে তিন মাস সময় লাগবে। তবে এ সময়ের মধ্যেই সর্বোচ্চ চিকিত্সা ও শিশু স্বাস্থ্যসেবাকে বিকেন্দ্রীকরণ করার পরিকল্পনার কথা জানান ডা. এম এ মুহিত। তিনি বলেন, আগামী অক্টোবরের মধ্যেই দেশের পাঁচ বিভাগীয় শহরে নবনির্মিত পাঁচটি পূর্ণাঙ্গ শিশু হাসপাতাল আনুষ্ঠানিকভাবে চিকিত্সা কার্যক্রম শুরু করবে। তৃণমূল পর্যায়ের চিকিত্সা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে দেশের সব ৫০ শয্যার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ১৫০ শয্যায় উন্নীত করা হচ্ছে। উপজেলা পর্যায়ে শিশু স্বাস্থ্য (পেডিয়াট্রিকস), মেডিসিন, সার্জারি ও গাইনি—এই চার মূল বিষয়কে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য দেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস, পরিচালক (হাসপাতাল) ডা. মো. নুরুল ইসলাম এবং আইইডিসিআর,বির পরিচালক ডা. কাজী আহমেদ জাকি। অনুষ্ঠানে গবেষণার মূল ফলাফল ও তথ্য-উপাত্ত যৌথভাবে উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ডা. মির্জা মো. জিয়াউল ইসলাম এবং আইসিডিডিআর,বির ভাইরোলজি বিভাগের প্রধান বিজ্ঞানী ড. মুস্তাফিজুর রহমান।
Comments