সংকটে থাকা ন্যাশনাল ব্যাংকের এমডির পদত্যাগ
চরম আর্থিক সংকটে থাকা ন্যাশনাল ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আদিল চৌধুরী পদত্যাগ করেছেন। গত বছরের ৭ জুলাই তিনি তিন বছরের জন্য ব্যাংকটিতে যোগদান করেন। অর্থাৎ কোন রকমে এক বছর পার করেছেন তিনি।
সম্প্রতি ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে তিনি পদত্যাগ করেন। এর আগের এমডি মো. তৌহিদুল আলম খানও মেয়াদ শেষের আগেই পদত্যাগ করেন। এ নিয়ে গত এক দশকে মেয়াদ শেষের আগেই ব্যাংকটির সাতজন এমডি পদত্যাগ করলেন।
বিগত সরকারের সময়ে ব্যাপক অনিয়ম-জালিয়াতির কারণে ন্যাশনাল ব্যাংক দীর্ঘদিন ধরে ধুঁকছে। এর মধ্যে ২০২৪ সালের আগস্টে সরকার পরিবর্তনের পর বিশিষ্ট ব্যবসায়ী আবদুল আউয়াল মিন্টুর নেতৃত্বে ছয় সদস্যের পরিচালনা পর্ষদ গঠন করে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। আবদুল আউয়াল মিন্টু এবং ব্যাংকটির আরেক পরিচালক জাকারিয়া তাহের মন্ত্রী হওয়ার পর তারা এখন আর পর্ষদে নেই।
২০০৯ সাল থেকে ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ ছিল জয়নুল হক সিকদার পরিবারের হাতে। তখন নিয়মবহির্ভূতভাবে এক পরিবার থেকে পাঁচজন পরিচালক, বেনামি ঋণ, কমিশনের বিপরীতে ঋণ, নিয়োগ বাণিজ্যসহ বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। নানা অনিয়ম ঠেকাতে ব্যর্থ হয়ে ২০২৪ সালের মে মাসে এনবিএলের নিয়ন্ত্রণ এস আলম গ্রুপ ও কেডিএস গ্রুপের হাতে তুলে দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে (এপ্রিল-জুন ২০২৬) ন্যাশনাল ব্যাংক পিএলসি-এর সমন্বিত শেয়ারপ্রতি লোকসান দাঁড়িয়েছে ৩ টাকা ৫৮ পয়সা এবং প্রথম ছয় মাসে মোট লোকসান হয়েছে ৭ টাকা ১০ পয়সা। এছাড়া তারল্য সংকট মোকাবেলায় ব্যাংকটি বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে বিশেষ সহায়তা পেয়েছে।
আর্থিক ও ব্যবস্থাপনা পরিস্থিতি
- লোকসান বৃদ্ধি: ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে (জানুয়ারি-জুন) ব্যাংকটির শেয়ারপ্রতি লোকসান বেড়ে ৭ টাকা ১০ পয়সায় দাঁড়িয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৩ টাকা ৬ পয়সা।
- শেয়ারপ্রতি নিট দায়: ৩০ জুন ২০২৬ পর্যন্ত ব্যাংকটির শেয়ারপ্রতি নিট দায় (এনএভিপিএস) দাঁড়িয়েছে ১৪ টাকা ৪৯ পয়সা।
- তারল্য সহায়তা: তীব্র আর্থিক ও নগদ অর্থের চাপ সামলাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে বিশেষ পদক্ষেপে ১ হাজার কোটি টাকার তারল্য সহায়তা প্রদান করা হয়েছে।
এদিকে, সংকট কাটিয়ে উঠতে নতুন আয়ের উৎস তৈরি করতে ঢাকার পান্থপথে নির্মাণাধীন সদর দপ্তরের দুটি টাওয়ারের মধ্যে একটি বাণিজ্যিকভাবে লিজ দেওয়ার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে সরকারের অনুমতি পেয়েছে ন্যাশনাল ব্যাংক।
ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী, ব্যাংকগুলো তাদের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় স্থাবর সম্পত্তির মালিক হতে পারে। তবে নিজস্ব ব্যবহারের জন্য নির্মিত ভবন বাণিজ্যিকভাবে লিজ দিয়ে আয় করার অনুমতি নেই।
ব্যাংকটির দুর্বল আর্থিক অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে গত ২৯ জুন বাংলাদেশ ব্যাংক সরকারকে আইনের সংশ্লিষ্ট বিধান থেকে ন্যাশনাল ব্যাংককে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
দেশের সবচেয়ে দুর্বল ব্যাংকগুলোর একটি হিসেবে রয়ে গেছে ন্যাশনাল ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের মার্চ মাসের তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংকটির মোট ঋণের ৫৬ দশমিক ৪৪ শতাংশ, যার পরিমাণ প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকা, খেলাপি ঋণে পরিণত হয়েছে। এর অধিকাংশই মন্দ ঋণ হিসেবে শ্রেণিকৃত।
এ ছাড়া, ব্যাংকটির প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার প্রভিশন ঘাটতি রয়েছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকটির মূলধন ঘাটতি ৯ হাজার কোটি টাকার বেশি ছিল। একই সময়ে ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের বিপরীতে মূলধন পর্যাপ্ততার হার (সিআরএআর) ছিল ঋণাত্মক ৬ দশমিক ১১ শতাংশ, যা নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্ধারিত ন্যূনতম ১২ দশমিক ৫ শতাংশের তুলনায় অনেক কম।
বছরের পর বছর দুর্বল সুশাসন ও ব্যাপক ঋণ অনিয়মের কারণেই এ সংকট তৈরি হয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, সিকদার গ্রুপ-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানসহ প্রভাবশালী কয়েকটি ব্যবসায়ী গোষ্ঠী বছরের পর বছর ব্যাংকটি থেকে বিপুল অঙ্কের ঋণ নিলেও সেই অর্থের বড় অংশ আর ফেরত আসেনি। ফলে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ক্রমাগত বেড়ে গিয়ে প্রভিশন ও মূলধনে বড় ঘাটতি সৃষ্টি করেছে এবং শেষ পর্যন্ত ব্যাংকটিকে বর্তমান আর্থিক সংকটে ঠেলে দিয়েছে।
Comments