পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দিতে টেন্ডারে বিশেষ শর্ত দেওয়া হয়: স্বাস্থ্যমন্ত্রী
সরকারি কেনাকাটায় অনেক সময় পছন্দের ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দিতে দরপত্রে (টেন্ডার) এমন সব বিশেষ ও অবাস্তব শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়, যাতে নির্ধারিত প্রতিষ্ঠানটি ছাড়া অন্য কেউ যোগ্যতা অর্জন করতে না পারে। স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন এমন মন্তব্য করেছেন।
বুধবার (২৯ জুলাই) সকালে রাজধানীর আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে আয়োজিত এক গবেষণা ফলাফল উপস্থাপন কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের উদ্যোগে এবং পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি)-এর বাস্তবায়নে 'বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য–ব্যবস্থার ঘাটতি নিরসন: সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার উপযোগী সেবা নিশ্চিত করতে ব্যয়দক্ষতার একটি দ্রুত প্রতিষ্ঠানভিত্তিক মূল্যায়ন' শীর্ষক গবেষণাটি পরিচালিত হয়।
মন্ত্রী জানান, সরকারি ক্রয়ে এ ধরনের অনিয়ম একটি বাস্তব চিত্র এবং অডিটের সময়ও প্রায়শই তা ধরা পড়ে। নিজের দাপ্তরিক অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রায় এক মাস আগে তাঁর মন্ত্রণালয়ের একটি ফাইল দেখে সন্দেহ হওয়ায় তিনি সাত দিন তাতে সই করেননি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছ থেকে একাধিকবার ব্যাখ্যা চেয়েও সন্তোষজনক উত্তর না পাওয়ায় শেষ পর্যন্ত ফাইলটিতে সই করতে বাধ্য হন। পরবর্তীতে দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দরদাতা প্রতিষ্ঠান কাজ না পেয়ে রিভিউ বোর্ডে আপিল করলে পূর্বের সিদ্ধান্ত বাতিল হয় এবং সঠিক নিয়মেই ওই প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া হয়, যা তাঁর প্রাথমিক সন্দেহের সত্যতাই প্রমাণ করে।
কর্মশালার উন্মুক্ত পর্বে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, সরকারি ক্রয়বিধি (পিপিআর) যথাযথভাবে অনুসরণ করার পরও অডিট আপত্তি এড়াতে অনেক সময় অডিটরদের ৫ শতাংশ কমিশন দিতে হয়। এর জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী স্পষ্টভাবে জানান, নিয়ম মেনে এবং সততার সঙ্গে কাজ করলে কাউকে এক টাকাও ঘুষ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। কোনো অডিটর অবৈধ অর্থ দাবি করলে সরাসরি তাঁকে জানানোর জন্য উপস্থিত কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন তিনি।
সরকারি ক্রয়ে অপরিকল্পিত ব্যয়ের আরেকটি উদাহরণ টেনে মন্ত্রী বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ১১ কোটি টাকা মূল্যের দুটি রেডিওথেরাপি মেশিন ১৮ কোটি টাকায় কেনা হয়েছিল। কিন্তু মেশিনগুলো স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় বাংকার বা বিশেষ কক্ষ নির্মাণ না করায় একটি ফরিদপুরে এবং অন্যটি খুলনায় দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে। এ ধরনের অপরিকল্পিত কেনাকাটার কারণে জনগণের কষ্টার্জিত অর্থের অপচয় হচ্ছে বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।
কর্মশালায় গবেষণার মূল ফলাফল তুলে ধরেন পিপিআরসির চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান। দেশের আট বিভাগের ২২টি সরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘ নয় মাস ধরে এই গবেষণা চালানো হয়। গবেষণার উল্লেখযোগ্য দিকগুলো হলো:
বাজেট ও অব্যয়িত অর্থ: ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জরিপভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর গড় বাজেট ব্যয়ের হার ছিল ৮৫ শতাংশ। তবে ৯৪ শতাংশ প্রতিষ্ঠানেই অর্থবছর শেষে কিছু অর্থ অব্যয়িত থেকে যায়। অডিট আপত্তির ভয়, বাজেট ব্যবস্থাপনায় প্রশিক্ষণের অভাব এবং বরাদ্দ পুনর্বণ্টনের দীর্ঘসূত্রতা এর জন্য দায়ী।
ওষুধের সংকট: সরকারি হাসপাতালগুলোতে প্রয়োজনীয় ওষুধের তীব্র ঘাটতি রয়েছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ওষুধের প্রাপ্যতা ২২ দশমিক ৭ শতাংশ, জেলা হাসপাতালে ২৩ দশমিক ৯ শতাংশ এবং মেডিকেল কলেজ ও বিশেষায়িত হাসপাতালে মাত্র ১১ দশমিক ৫ শতাংশ। বর্তমানে ইডিসিএল প্রায় ৬২ শতাংশ ওষুধ সরবরাহ করে, তবে তারা সময়মতো চাহিদা মেটাতে পারলে এই হার ৯০ শতাংশে উন্নীত হতে পারে।
পরীক্ষাগার ও জনবল সংকট: প্রয়োজনীয় রিএজেন্টের অভাব (৪৩ শতাংশ), যন্ত্রপাতি অকেজো হয়ে থাকা (৩৪ শতাংশ) এবং প্রশিক্ষিত জনবলের সংকটের (১৯ শতাংশ) কারণে হাসপাতালের ল্যাব সেবা ব্যাহত হচ্ছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়াধীন মেডিকেল টেকনোলজিস্টের ৬ হাজার ৪০৬টি পদের বিপরীতে ৩ হাজার ৮৯২ জন কর্মরত আছেন, অর্থাৎ প্রায় ৪০ শতাংশ পদই শূন্য।
পরিশেষে গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্বাস্থ্য খাতের প্রকৃত সাফল্য কেবল বাজেট বরাদ্দ বা অর্থ খরচের পরিমাণ দিয়ে মাপা উচিত নয়; বরং সময়মতো অর্থ ছাড়, সঠিক ব্যবহার এবং রোগীরা শেষ পর্যন্ত বিনামূল্যে প্রয়োজনীয় ওষুধ, ল্যাব পরীক্ষা, সচল যন্ত্রপাতি ও কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসাসেবা পাচ্ছেন কি না, সেটাই মূল মানদণ্ড হওয়া উচিত।
Comments