যত লেনদেন, তত শাস্তি-এ কেমন ব্যাংকিং দর্শন?
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে নতুন নতুন সেবা চার্জ আরোপ এবং বিদ্যমান ফি বৃদ্ধির প্রস্তাব নিয়ে জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে মাসে তিনবারের বেশি কাউন্টার থেকে নগদ অর্থ উত্তোলনে অতিরিক্ত ফি, দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় হিসাব পুনরায় সচল করতে জরিমানা এবং বিভিন্ন ব্যাংকিং সেবায় ধারাবাহিকভাবে চার্জ বৃদ্ধির উদ্যোগ অনেক গ্রাহকের কাছে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। কারণ, একজন গ্রাহক নিজের বৈধভাবে উপার্জিত অর্থ ব্যবহার করতে গিয়ে যদি অতিরিক্ত ব্যয়ের মুখোমুখি হন, তবে ব্যাংকিং সেবার আসল মূল্য কোথায়-সেটিই এখন আলোচনার বিষয়।
ব্যাংকিং একটি সেবা-ভিত্তিক শিল্প। এখানে গ্রাহকই সবচেয়ে বড় সম্পদ। আধুনিক সার্ভিস মার্কেটিংয়ের অন্যতম নীতি হলো-যে গ্রাহক যত বেশি ব্যাংক ব্যবহার করবেন, তাকে তত বেশি সুবিধা দেওয়া। কারণ নিয়মিত লেনদেনকারী গ্রাহক শুধু আমানতই বাড়ান না; তিনি ব্যাংকের দীর্ঘমেয়াদি আয়, তথ্যভিত্তিক সেবা এবং নতুন পণ্য বিপণনেরও গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করেন। তাই বিশ্বের অধিকাংশ উন্নত ব্যাংকিং ব্যবস্থায় বেশি ব্যবহারকারী গ্রাহককে শাস্তি নয়, বরং পুরস্কৃত করার সংস্কৃতিই গড়ে উঠেছে।
বাংলাদেশের ব্যাংকগুলো পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধি, প্রযুক্তিগত বিনিয়োগ, সাইবার নিরাপত্তা এবং অবকাঠামো উন্নয়নের ব্যয়কে নতুন চার্জ আরোপের অন্যতম কারণ হিসেবে তুলে ধরছে। এই যুক্তি পুরোপুরি অযৌক্তিক নয়। প্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংকিং পরিচালনা করতে অবশ্যই উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগের প্রয়োজন হয়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—এই ব্যয়ের পুরো দায় কি শুধুই সাধারণ আমানতকারীদের বহন করতে হবে?
অর্থনীতির একটি মৌলিক নীতি হলো, প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ অদক্ষতা, অপচয় কিংবা দুর্বল ব্যবস্থাপনার খরচ গ্রাহকের ওপর চাপিয়ে দেওয়া টেকসই সমাধান নয়। খেলাপি ঋণ, অদক্ষ প্রশাসন, অতিরিক্ত শাখা পরিচালনা ব্যয় কিংবা অপ্রয়োজনীয় অবকাঠামো সম্প্রসারণের বোঝা যদি শেষ পর্যন্ত গ্রাহকের কাঁধে এসে পড়ে, তবে তা ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থাকেই ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা বলছে, পরিচালন ব্যয় কমানোর আরও কার্যকর পথ রয়েছে। ভারতের উদাহরণই ধরা যাক। ইউনিফায়েড পেমেন্টস ইন্টারফেস (UPI) চালুর মাধ্যমে দেশটি ডিজিটাল লেনদেনে এক ধরনের নীরব বিপ্লব ঘটিয়েছে। আজ কোটি কোটি মানুষ ব্যাংক কাউন্টারে না গিয়ে মোবাইল ফোন থেকেই তাৎক্ষণিক এবং বিনামূল্যে অর্থ লেনদেন করছেন। ফলে ব্যাংকের কাউন্টার পরিচালনার চাপ যেমন কমেছে, তেমনি নগদ অর্থ ব্যবস্থাপনার ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। একই সঙ্গে জন ধন যোজনার আওতায় কোটি মানুষের জন্য জিরো-ব্যালেন্স হিসাব চালু করে ব্যাংকিং অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা হয়েছে, যেখানে অতিরিক্ত ফি নয়, বরং সহজ প্রবেশাধিকারকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
কেনিয়া আবার ভিন্ন পথ দেখিয়েছে। সেখানে এম-পেসা (M-Pesa)-এর মতো মোবাইলভিত্তিক আর্থিক সেবার মাধ্যমে ব্যাংকগুলো প্রতিটি এলাকায় ব্যয়বহুল শাখা ও এটিএম স্থাপনের পরিবর্তে বিদ্যমান এজেন্ট নেটওয়ার্ক ব্যবহার করেছে। এতে রিয়েল এস্টেট, জনবল এবং প্রশাসনিক ব্যয় নাটকীয়ভাবে কমেছে। একই সঙ্গে ছোট ছোট সঞ্চয় ও ঋণপণ্য চালু করে বিপুল সংখ্যক নতুন গ্রাহককে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় যুক্ত করা সম্ভব হয়েছে।
যুক্তরাজ্য ও ইউরোপের অভিজ্ঞতা আরও তাৎপর্যপূর্ণ। সেখানে অধিকাংশ ব্যাংক পৃথকভাবে এটিএম নেটওয়ার্ক গড়ে না তুলে যৌথ অবকাঠামো ব্যবহার করে। এর ফলে একই সেবা দিতে গিয়ে প্রতিটি ব্যাংকের আলাদা ব্যয় বহন করতে হয় না। পাশাপাশি সম্পূর্ণ ডিজিটালভিত্তিক নিও-ব্যাংকগুলোর উত্থান দেখিয়েছে যে, প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার করলে ভৌত শাখা ছাড়াও কম খরচে মানসম্মত ব্যাংকিং সেবা দেওয়া সম্ভব।
অস্ট্রেলিয়ার অভিজ্ঞতা আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি শিক্ষা দেয়। সেখানে পরিচালন ব্যয় বেড়ে গেলে প্রথম সমাধান হিসেবে গ্রাহকদের ওপর নতুন ফি চাপানো হয় না। বরং নিয়ন্ত্রক কাঠামোর মাধ্যমে শীর্ষ নির্বাহীদের কর্মদক্ষতা, বোনাস এবং জবাবদিহিতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। অর্থাৎ ব্যয় নিয়ন্ত্রণের সূচনা হয় প্রতিষ্ঠানের ভেতর থেকেই।
বাংলাদেশের বাস্তবতাও এখন নতুনভাবে ভাবার দাবি রাখে। দেশের অধিকাংশ ব্যাংক আলাদাভাবে এটিএম পরিচালনা করছে, পৃথক প্রযুক্তি অবকাঠামো গড়ে তুলছে এবং অনেক ক্ষেত্রে একই ধরনের বিনিয়োগ পুনরাবৃত্তি করছে। যদি যৌথ এটিএম নেটওয়ার্ক, শেয়ারড ডেটা সেন্টার, সমন্বিত ডিজিটাল অবকাঠামো কিংবা আন্তঃব্যাংক প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলা যায়, তাহলে পরিচালন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে ডিজিটাল লেনদেনে আরও প্রণোদনা দিলে কাউন্টারভিত্তিক সেবার চাপও স্বাভাবিকভাবেই কমবে।
তবে এ ক্ষেত্রে বাস্তবতার কথাও মাথায় রাখতে হবে। বাংলাদেশের অর্থনীতি, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তির অবস্থা ভারত, যুক্তরাজ্য বা অস্ট্রেলিয়ার মতো নয়। তাই কোনো দেশের মডেল হুবহু অনুকরণ না করে, তাদের সফল অভিজ্ঞতার উপযোগী অংশগুলো দেশের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে গ্রহণ করাই হবে বিচক্ষণতার পরিচয়।
বাংলাদেশ ব্যাংক ইতোমধ্যে ডিজিটাল পেমেন্ট, আন্তঃব্যাংক লেনদেন এবং ক্যাশলেস অর্থনীতির দিকে অগ্রসর হওয়ার বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। এখন প্রয়োজন সেই উদ্যোগকে আরও বিস্তৃত করা, অবকাঠামো ভাগাভাগির নীতিকে উৎসাহিত করা এবং এমন একটি চার্জ নীতি প্রণয়ন করা, যেখানে গ্রাহকের স্বার্থ, ব্যাংকের টেকসই মুনাফা এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তি—তিনটির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা হবে।
একটি ব্যাংকের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার ভবন নয়, প্রযুক্তিও নয়—তার গ্রাহকের আস্থা। সেই আস্থা ক্ষুণ্ণ করে স্বল্পমেয়াদে কিছু অতিরিক্ত আয় করা সম্ভব হলেও, দীর্ঘমেয়াদে তার মূল্য অনেক বেশি। তাই এখন সময় এসেছে চার্জ বাড়ানোর সহজ পথ থেকে সরে এসে দক্ষতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার, যৌথ অবকাঠামো এবং গ্রাহকবান্ধব নীতিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার। কারণ শেষ পর্যন্ত ব্যাংকিং ব্যবসায় টেকসই সাফল্যের ভিত্তি অতিরিক্ত ফি নয়-গ্রাহকের বিশ্বাস।
Comments