যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের আশঙ্কায় কঠিন কূটনৈতিক টানাপোড়েনে পাকিস্তান
ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের সাম্প্রতিক সৌদি আরবে হামলার ঘটনায় তীব্র উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে পাকিস্তানে। এই হামলার জেরে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে বড় ধরনের সংঘাত শুরু হলে ইসলামাবাদের মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা যেমন ভেস্তে যেতে পারে, তেমনি রিয়াদের সাথে থাকা প্রতিরক্ষা চুক্তি রক্ষায় সরাসরি যুদ্ধে জড়াতে হতে পারে পারমাণবিক শক্তিধর এই দেশটিকে। বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।
গত বছর সৌদি আরবের সাথে একটি দ্বিপাক্ষিক পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি সই করে পাকিস্তান। বর্তমানে সৌদিতে হাজারো পাকিস্তানি সেনা এবং একটি যুদ্ধবিমান স্কোয়াড্রন মোতায়েন রয়েছে।
রয়টার্সকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক শীর্ষ পাকিস্তানি কর্মকর্তা জানান, চলতি সপ্তাহে হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর ইরানকে কড়া বার্তা দিয়েছে ইসলামাবাদ। তিনি বলেন, "সৌদি আরবের ওপর হামলাকে আমরা পাকিস্তানের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করি। এটি আমাদের জন্য 'রেড লাইন'।"
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, ইয়েমেন সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় পাকিস্তানি সেনা মোতায়েন থাকায় হুথিদের হামলা বিস্তৃত হলে তারা সরাসরি ঝুঁকির মুখে পড়তে পারেন। আর তেমনটি হলে প্রতিরক্ষা চুক্তির শর্ত অনুযায়ী পাকিস্তানের সামরিকভাবে এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া ছাড়া উপায় থাকবে না।
গত মাসেই ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে চলমান উত্তেজনা প্রশমনে একটি অন্তর্বর্তী সমঝোতা প্রতিষ্ঠায় অন্যতম প্রধান মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা রেখেছিল পাকিস্তান। কিন্তু সোমবার ৪ বছরের যুদ্ধবিরতি ভেঙে হুথি ও সৌদির মধ্যে নতুন করে ক্ষেপণাস্ত্র বিনিময় এই শান্তি প্রক্রিয়াকে হুমকির মুখে ফেলেছে।
পাকিস্তানের নিরাপত্তা বিশ্লেষক মুহাম্মদ আমির রানা বলেন, এত দ্রুত উত্তেজনা বাড়বে বলে ইসলামাবাদ ধারণা করেনি। এছাড়া লোহিত সাগরে সংঘাত ছড়িয়ে পড়লে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথ ব্যাহত হবে, যা পাকিস্তানসহ বিশ্ববাজারে জ্বালানি ও পণ্য সরবরাহে বড় বিপর্যয় ডেকে আনবে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বের মধ্যকার মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব নিয়েও চিন্তিত পাকিস্তান। দেশটির সরকারি কর্মকর্তাদের মতে, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি ও পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফের মতো রাজনৈতিক নেতৃত্বের চেয়ে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) সামরিক প্রভাব দিন দিন বাড়ছে। ইরানি সামরিক বাহিনীর এই আগ্রাসী অবস্থানকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে ইসলামাবাদ।
এই উত্তেজনার আবহেই ইরানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসকান্দার মোমেনির নেতৃত্বাধীন একটি প্রতিনিধিদলের ইসলামাবাদ সফর নির্ধারিত সময়ের দুই দিন পর অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
কূটনীতি বনাম প্রতিরক্ষা: কঠিন ভারসাম্য
অবসরপ্রাপ্ত পাকিস্তানি জেনারেল গুলাম মোস্তফা জানান, বর্তমানে পাকিস্তানের নেতৃত্ব সব পক্ষকে শান্ত রাখার চেষ্টা করছে। বৃহস্পতিবার পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র তাহির আন্দ্রাবি বলেন, "ধারাবাহিক সংলাপ, কূটনীতি ও সম্পৃক্ততার কোনো বিকল্প নেই। পাকিস্তান সব পক্ষকে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানাচ্ছে।"
বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তান এখন এক কঠিন সমীকরণের মুখোমুখি। একদিকে আঞ্চলিক শান্তিরক্ষায় তারা মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা ধরে রাখতে চায়, অন্যদিকে সৌদি আরবের নিরাপত্তা ও মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানির ওপর তাদের গভীর নির্ভরশীলতা দেশটিকে রিয়াদের পাশে দাঁড়াতে বাধ্য করছে।
রয়টার্সকে দেওয়া আরেকটি সূত্রের চূড়ান্ত বক্তব্য পরিস্থিতি স্পষ্ট করে দেয়—"যুদ্ধের অবসান সবার স্বার্থে। কিন্তু সৌদি আরব যদি আমাদের ডাকে, তবে আমরা তাদের পাশেই দাঁড়াব—এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।"
Comments