৩৯ বছর বয়সেও কেন অপ্রতিরোধ্য মেসি? নেপথ্যের জ্যামিতি
৩৯ বছর বয়সে পৌঁছালে ৯৯ শতাংশ খেলোয়াড়ই পেশাদার ফুটবল থেকে অবসর নিয়ে নেন। অথচ চলতি ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে ৩৯ বছর বয়সী লিওনেল মেসি যা করে দেখাচ্ছেন, তা এক কথায় অবিশ্বাস্য ও ফুটবল ব্যাকরণের পরিপন্থী!
টুর্নামেন্টে দুটি পেনাল্টি মিস করার পরও তার নামের পাশে জ্বলজ্বল করছে ৮টি গোল!
স্বাভাবিক নিয়মে একজন ৩৯ বছর বয়সী খেলোয়াড়ের বিশ্বকাপে যেকোনো দলের বিপক্ষে এমন অতিমানবীয় পারফরম্যান্স করার কথা নয়। টুর্নামেন্ট শুরুর আগে অনেক ফুটবল বিশ্লেষকই সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন, এই বয়সে মেসি কি দলকে বহুদূর নিতে পারবেন? কিন্তু মেসি প্রমাণ করেছেন, ২৫ বছর বয়সে তার পায়ে বল থাকলে যে ধার, দক্ষতা ও গতি দেখা যেত, ৩৯ বছর বয়সেও তার বিন্দুমাত্র পরিবর্তন হয়নি। এই বয়সেও তিনি একা হাতে আর্জেন্টিনাকে টুর্নামেন্টে টিকিয়ে রেখেছেন।
লিওনেল মেসিকে ছাড়া এই দলটিকে নিতান্তই একটি গড়পড়তা দল বলে মনে হতে পারে, কিন্তু তার উপস্থিতিতেই দলটি বিশ্ব চ্যাম্পিয়নের মতো খেলছে।
পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে এই বিস্ময় আরও বাড়ে। পেনাল্টি ছাড়াই ৮ গোল করে তিনি চলতি বিশ্বকাপের যৌথ সর্বোচ্চ এবং আর্জেন্টিনা দলের সর্বোচ্চ গোলদাতা। সতীর্থদের দিয়ে করিয়েছেন ২টি সরাসরি গোল, যা দলের হয়ে যৌথভাবে সর্বোচ্চ অ্যাসিস্ট। পুরো দলের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ২১টি নিখুঁত গোল করার সুযোগ তৈরি করেছেন তিনি একাই। লক্ষ্য বরাবর সবচেয়ে বেশি ১৬টি অন-টার্গেট শট নিয়ে দলের সবচেয়ে নিখুঁত আক্রমণকারীও তিনিই। নকআউট পর্বে মিশর ও সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে প্রবল চাপের মুখে দলের জয়ের পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান রাখা এবং ডেডলক ভাঙা গোলগুলো তার পা থেকেই এসেছে।
অথচ অবিশ্বাস্য ব্যাপার হলো, এবারের বিশ্বকাপে আউটফিল্ড খেলোয়াড়দের মধ্যে সবচেয়ে কম দূরত্ব অতিক্রম করেছেন এই মেসিই। দৌড় কমিয়েও তিনি কীভাবে এত ভয়ংকর?
এর উত্তর লুকিয়ে আছে আর্জেন্টিনার অভাবনীয় ট্যাকটিক্যাল বিবর্তনের মাঝে।
২০০৫ সালে যখন মেসির উত্থান ঘটে, তখন তিনি ছিলেন ৪-৩-৩ ফরমেশনে খেলা দ্রুতগতির এক ডায়নামিক উইঙ্গার, যিনি গতি দিয়ে একাধিক খেলোয়াড়কে অনায়াসে পরাস্ত করতেন। পরবর্তীতে বার্সেলোনা তাকে স্ট্রাইকার ছাড়াই মাঝখান দিয়ে খেলানো শুরু করে এবং তাকে একটি নির্দিষ্ট পজিশনহীন খেলোয়াড়ে পরিণত করে। কিন্তু ২০১৮ বিশ্বকাপে তাকে 'ফলস নাইন' হিসেবে খেলানোর কৌশল চরম ব্যর্থ হয় এবং দল শেষ ১৬ থেকেই বিদায় নেয়; কারণ তিনি মাঠের একটি নির্দিষ্ট অংশেই আটকে ছিলেন। এরপর লিওনেল স্কালোনি এসে ছক বদলে তাকে ডান প্রান্তে নিয়ে আসেন।
এই পরিবর্তনের মূল লক্ষ্য ছিল মেসিকে মাঠের সবচেয়ে ভয়ংকর জায়গা, যা 'জোন ১৪' নামে পরিচিত, সেখানে পৌঁছে দেওয়া। এই কৌশল ২০২২ বিশ্বকাপ জয়ে বড় ভূমিকা রাখে।
কিন্তু চার বছর পর, ৩৯ বছর বয়সে এসে মেসির সেই পুরনো গতি বা ছোট জায়গায় বল নিয়ে ছিটকে যাওয়ার শারীরিক বিস্ফোরক ক্ষমতা অনেকটাই কমে এসেছে। তাই আর্জেন্টিনা বাধ্য হয়ে এমন এক ট্যাকটিক্যাল সিস্টেম তৈরি করেছে, যেখানে বয়স্ক ও ধীরগতির মেসিকে রোখাও প্রতিপক্ষের জন্য অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। এই কৌশলের শুরুটা হয় খোদ রক্ষণভাগ থেকে। এই বিশ্বকাপে যেকোনো দলের চেয়ে আর্জেন্টিনার 'পাসেস পার সিকোয়েন্স' (পাসের ধারা) এবং 'লংগেস্ট সিকোয়েন্স টাইম' সবচেয়ে বেশি।
গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্টিনেজ এবং সেন্টার ব্যাকরা অত্যন্ত ধৈর্যশীল বিল্ড-আপের মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে প্রেস করার জন্য প্রলুব্ধ করেন। ম্যাক অ্যালিস্টার তখন দুই সেন্টার ব্যাকের মাঝে নেমে এসে তিন সদস্যের একটি বিল্ড-আপ তৈরি করেন। অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে স্পষ্ট দেখা যায়, এই কৌশলটি মাঠে একটি 'ইউ-শেপ' তৈরি করে এবং প্রতিপক্ষকে বাধ্য করে মাঠের মাঝখানের জায়গা উন্মুক্ত করে দিতে। লিসান্দ্রো মার্টিনেজ এই ধৈর্যশীল প্রক্রিয়ায় দারুণ ভূমিকা রাখেন।
মাঝমাঠ উন্মুক্ত হওয়ার পর শুরু হয় ট্যাকটিক্যাল জ্যামিতির দ্বিতীয় ধাপ। লেফট সাইডেড মিডফিল্ডার এনজো ফার্নান্দেজ উইংয়ের ফাঁকা জায়গা ছেড়ে দিয়ে চারজন অস্ট্রিয়ান খেলোয়াড়ের ব্লকের ভেতর ঢুকে যান। ফুটবলীয় ট্যাকটিকসে একে ব্রাজিলিয়ান পরিভাষায় বলে 'এস্কাদিনাস' বা সিঁড়ি, যা মূলত বল সামনে নেওয়ার উলম্ব পথ তৈরি করে। এনজো বা কখনও কখনও থিয়াগো আলমাদা প্রতিপক্ষের ব্লকের ভেতর ঢুকে বল রিসিভ করেন, ফলে প্রতিপক্ষের লাইনগুলোর মাঝে সবসময় আর্জেন্টিনার একজন খেলোয়াড় উপস্থিত থাকেন।
অন্যদিকে, রাইট উইঙ্গার হিসেবে কাগজে-কলমে খেললেও মেসি ডান প্রান্তের কোনো দায়িত্ব নেন না। ডি পল এবং রাইট ব্যাক (মন্টিয়েল বা মলিনা) পুরো ডান দিকের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের কাঁধে নিয়ে নেন। ফলে ডান প্রান্তে মেসির পা প্রায় বল স্পর্শই করে না। বরং তিনি কেন্দ্রে ঘিঞ্জি জায়গায় অবস্থান নেন। আলজেরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে দেখা যায়, ম্যাক অ্যালিস্টার এবং এনজো ফার্নান্দেজ প্রতিপক্ষের ব্লকের ভেতর ঢুকে চারজন ডিফেন্ডারের মনোযোগ কেড়ে নেন। ঠিক ওই মুহূর্তে আলজেরিয়ার খেলোয়াড়রা আধা সেকেন্ডের জন্য মেসিকে ভুলে যায়, আর ওই আধা সেকেন্ডই তাদের সর্বনাশ ডেকে আনে। মেসিকে এখন আর রাইট উইং থেকে বল টেনে কেন্দ্রে আনতে হয় না; বরং সতীর্থরাই তাঁর জন্য পাসিং লেন তৈরি করে দেন।
এই পুরো ছকের সবচেয়ে জাদুকরী দিকটি দেখা যায় প্রতি আক্রমণের সময়। আলজেরিয়ার বিপক্ষে যখন পুরো আর্জেন্টিনা দল প্রবল বেগে সামনের দিকে ছুটছে, মেসি তখন একাই স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন! সতীর্থদের মুভমেন্ট বা ওভারল্যাপিংয়ের ফাঁদে পা দিয়ে আলজেরিয়ার ডিফেন্ডাররা নিজেদের বক্সে নেমে যেতে বাধ্য হয় এবং জোন ১৪-তে সম্পূর্ণ আনমার্কড অবস্থায় ফাঁকা জায়গা পেয়ে যান মেসি। আর সেখান থেকেই তিনি গোলরক্ষককে পরাস্ত করে নিজের হ্যাটট্রিক পূরণ করেন। দলের বর্তমান দর্শনের গোল্ডেন রুল হলো - যেভাবেই হোক বল মেসিকে দাও। সতীর্থরা বল নিয়ে গোল করার সুযোগ পেলেও তাঁদের প্রথম চিন্তা থাকে, মেসি কোথায়?
একসময় পুরো দল নির্ভর করত মেসির বল টেনে নিয়ে জাদুকরী কিছু করার ওপর।
আজ ট্যাকটিকস পুরো উল্টে গেছে; পুরো দল এখন তাঁর জন্য সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছে। ম্যানেজার, সতীর্থ এবং সমর্থকরা আনন্দের সাথেই এই সিস্টেম মেনে নিয়েছেন, কারণ তাঁরা এই সর্বকালের সেরাদের একজনের কাছ থেকে সম্ভাব্য শেষ বিন্দুটি পর্যন্ত নিংড়ে নিতে চান। ট্যাকটিকস আর দলের নিঃস্বার্থ নিবেদনের এক অপূর্ব রসায়নেই ৩৯ বছরের ধীরগতির মেসি হয়ে উঠেছেন আগের মতোই অপ্রতিরোধ্য।
Comments