আওয়ামী লীগের প্রত্যাবর্তন: শুধু ঝটিকা মিছিল করে ফেরা যায় না
হঠাৎ করে গায়েবি আওয়াজের মতো খবর আসে – শেখ হাসিনা ফিরছেন। তারপর দেশে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া হয়। অন্তবর্তী আমলে এই আওয়াজের পরিপ্রেক্ষিতে ধানমন্ডি ৩২ এ বঙ্গবন্ধুর বাড়ি একেবারে গুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে দুই দুইবার। আর ২৩ বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে দলের কার্যালয় তো এখন গণ শৌচাগার।
প্রায় দুই বছর হতে চলল – আওয়ামী লীগ ক্ষমতা থেকে উৎখাত হয়েছে। হঠাৎ হঠাৎ কিছু ঝটিকা মিছিল ছাড়া কোন সাংগঠনিক তৎপরতা দেখাতে পারেনি দলটি।
অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাহী আদেশে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেছে। ছাত্রলীগ-কে নিষিদ্ধ করেছে। ফলে স্বাভাবিক সাংগঠিনিক কার্যক্রম চালানোর কোন সুযোগ নেই আওয়ামী লীগের। এখন দল হিসেবে বিচারের কথাও উঠছে।
কিন্তু কিছু প্রশ্ন তো আসেই দলটির ব্যাপারে। এতো বড় একটা দল, ৪০ শতাংশের বেশি জন সমর্থন। কিন্তু দল গোছানোর জন্য এখন একজন জোহরা তাজউদ্দীন নেই, রাজ্জাক তোফায়েল নেই যারা ঝড়ের মুখে নৌকা বাইবেন।
শেখ হাসিনা আসতে পারবেন না – এটা দৃশ্যমান বাস্তবতা। কিন্তু তিনি কি দল গোছানোর জন্য কাউকে দায়িত্ব দিয়েছেন বা দিতে চান যাদের গ্রহণযোগ্যতা আছে তুলনামূলকভাবে বেশি? এটি বড় প্রশ্ন। কিন্তু উত্তর নেই।
ছাত্রলীগ ফ্যাক্টর
৭৩ এ ডাকসু নির্বাচনে ভোটার বাক্স ছিনতাই থেকে সেভেন মার্ডারের ইতিহাস, ২০০৯ থেকে সাড়ে ১৫ বছর আবরার হত্যা, বিশ্বজিৎ খুন, আবু বকুর খুন এবং আরও আরও খুন ধর্ষণ, অভ্যন্তরীণ খুন, টাকার বিনিময়ে কমিটি বাণিজ্য, হলে হলে সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের নিপীড়ন করাসহ সব ধরনের শিক্ষা স্বার্থ বিরোধী কাজে লিপ্ত থাকা ছাত্রলীগের কোন ইমেজ নেই দেশের ছাত্র সমাজের মাঝে। অথচ রাজনীতির সমর্থনটা আসতে হবে ছাত্র তরুণদের দিক থেকেই।
উল্লেখ্য, বেপরোয়া আচরণে শেখ হাসিনা নিজে একবার ছাত্রলীগ ছেড়ে দিতে চেয়েছিলেন। তখন তিনি প্রধানমন্ত্রী ছিলেন।
২০১৮ সালের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে সাধারণ ছাত্রদের বিরুদ্ধে গিয়ে স্থায়ীভাবে শিক্ষার্থী বিরোধী হয়ে যায় ছাত্রলীগ এবং ২০২৪ এ বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনে হামলা, নারীদের ওপর সহিংস আক্রমণ – সব ছবি যে সংকেত সারা দেশে পাঠিয়েছে, তা থেকে এখনও বের হতে পারছে না ছাত্রলীগ।
আন্তর্জাতিক ফ্যাক্টর
আমেরিকার সাথে যে বৈরিতা তৈরি করেছে সেখান থেকেও দলটি বের হতে পারেনি। এতে করে পশ্চিমা দেশগুলোও এখনও সহানুভূতিশীল হতে পারেনি শেখ হাসিনা বা দলের প্রতি। দু'জন মার্কিন কূটনীতিক গত সপ্তাহেও দেখলাম – শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে জোরালো বক্তব্য দিয়েছেন।
ফলে ভারত ছাড়া যেন চলছেই না। সেই ভারতও এখন কতটা সাথে আছে, আর কতটা চাপে পড়ে কাছে রাখছে, বা ফর্মালিটি করছে সেটা কে জানে। প্রায় সব স্তরের নেতা নেত্রী আছেন ভারতে, নিউ ইউয়র্ক বা লন্ডনে। ভারতে দুনিয়ার প্রায় সব মিডিয়া আছে। আজ পর্যন্ত একটা কার্যকর প্রেস কনফারেন্স হয়নি দিল্লীতে।
দলের আন্তর্জাতিক কমিটির প্রধান লন্ডনে। সাবেক পররাষ্টমন্ত্রী হাছান মাহমুদও লন্ডনে। সেখানেও বিশ্ব মিডিয়ায় কোন ইতিবাচক কাভারেজ নেই। কোনো রাজনৈতিক দলের ফিরে আসা অনেকগুলো বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। এর অন্যতম হলো পজিটিভ ইমেজ সৃষ্টি করা। দলটি সাড়ে ১৫ বছর ক্ষমতায় বিলীন হয়ে গেছে। সরকার নেই, দলও নেই।
আওয়ামী লীগ ভবিষ্যতে আবার শক্তিশালী রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে ফিরতে পারবে কি না, তা নির্ভর করতে পারে কিছু বিষয়ের ওপর। যেমন:
- তাদের সাংগঠনিক সক্ষমতা পুনর্গঠন করতে পারে কি না।
- জনসমর্থন অর্জন এবং তাকে কাজে লাগানো।
- দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ ও আইনগত পরিস্থিতি কী থাকে।
- অন্যান্য রাজনৈতিক দলের অবস্থান তাদের প্রতি কেমন থাকে।
- সামাজিক পরিসরে নিজের ইতিবাচক ভাবমূর্তি কতোটা তৈরি করতে পারে।
রাজনীতিতে এমন অনেক উদাহরণ রয়েছে যেখানে ক্ষমতাচ্যুত বা দুর্বল হয়ে পড়া দল পরে আবার ক্ষমতায় ফিরেছে। আবার এমনও হয়েছে যে কোনো দল দীর্ঘ সময় ধরে প্রান্তিক অবস্থায় থেকেছে। তাই ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নিশ্চিত পূর্বাভাস দেওয়া এখনই সম্ভব নয়।
সার্বিকভাবে একটা কথাই বলা যায়, কেবল ঝটিকা মিছিল বা আবেগ নির্ভর প্রচারণার মাধ্যমে আগের অবস্থায় ফেরা আওয়ামী লীগের জন্য কষ্টসাধ্য হবে।
Comments