ফারমার্স থেকে পদ্মা : দেউলিয়ার দ্বারপ্রান্তে এক ব্যাংকের দীর্ঘ পতনের ইতিহাস
২০১৩ সালে রাজনৈতিক বিবেচনায় অনুমোদন পাওয়া ফারমার্স ব্যাংককে দেশের ব্যাংকিং খাতের নতুন সম্ভাবনা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছিল। এর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ছিলেন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ নেতা ড. মহীউদ্দীন খান তথা মখা আলমগীর এবং নির্বাহী কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন মাহবুবুল হক চিশতী বা বাবুল চিশতী।
মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই এটি অনিয়ম, ভুয়া ঋণ, নিয়োগ বাণিজ্য এবং দুর্নীতির কারণে ভয়াবহ সংকটে পড়ে। গ্রাহকের আমানত ফেরত দিতে ব্যর্থ হয়ে ব্যাংকটি তারল্য সংকটে নিমজ্জিত হয়। পরবর্তীতে আস্থার সংকট কাটাতে ২০১৯ সালে নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় পদ্মা ব্যাংক। কিন্তু নাম বদলালেও বাস্তবতা বদলায়নি; বরং অভিযোগ অনুযায়ী নতুন নেতৃত্বের সময়েও আর্থিক অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের নতুন অধ্যায় যুক্ত হয়।
আজ পদ্মা ব্যাংকের বহু গ্রাহক বছরের পর বছর নিজেদের জমা অর্থ তুলতে না পেরে হতাশ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গ্রাহক ফোরামগুলোতে এমন অসংখ্য অভিযোগ দেখা যায়। একজন গ্রাহকের আক্ষেপ-"আমার মাত্র ৪০ হাজার টাকা, দুই বছর যাবৎ তুলতে পারছি না। ঘরে সিন্দুক বানিয়ে টাকা রাখব, তবুও ব্যাংকে টাকা রাখব না।" এই প্রতিক্রিয়াগুলো কেবল ব্যক্তিগত ক্ষোভ নয়; বরং দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থাহীনতারও প্রতিফলন।
ফারমার্স ব্যাংকের জন্ম এবং প্রথম লুটপাট
ফারমার্স ব্যাংক প্রতিষ্ঠার পর থেকেই নানা অনিয়মের অভিযোগ সামনে আসে। অভিযোগ ছিল, উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও ভুয়া প্রতিষ্ঠানের নামে বিপুল অঙ্কের ঋণ বিতরণ করা হয়, যার বড় অংশই পরে খেলাপিতে পরিণত হয়। ঋণ অনুমোদনের বিপরীতে কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগও ওঠে। একই সঙ্গে ঘুষের বিনিময়ে কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগের অভিযোগ ব্যাংকটির ভাবমূর্তি আরও প্রশ্নবিদ্ধ করে।
২০১৭ সালের মধ্যে পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ হয়ে ওঠে যে আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়াই কঠিন হয়ে পড়ে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হস্তক্ষেপে চেয়ারম্যান হিসেবে ম খা আলমগীর ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পরিবর্তন করা হলেও সংকট আর থামেনি।
নাম বদল, কিন্তু লুটপাট বন্ধ হয় না
২০১৯ সালে ফারমার্স ব্যাংকের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় পদ্মা ব্যাংক। রাষ্ট্রায়াত্ত কয়েকটি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান মূলধন জোগান দিয়ে ব্যাংকটিকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করে। উদ্দেশ্য ছিল গ্রাহকদের আস্থা ফিরিয়ে আনা। ব্যাংকটির নতুন চেয়ারম্যান হন আর্থিক খাতের তৎকালীন প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব চৌধুরী নাফিজ সরাফাত।
কিন্তু পরবর্তী সময়েও নানা তদন্তে নতুন অনিয়মের অভিযোগ উঠে আসে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়, ভুয়া পরিচয়ে ঋণ বিতরণ, কাগুজে প্রতিষ্ঠানের নামে শত শত কোটি টাকা আত্মসাৎ এবং ব্যাংকের শেয়ার কেনার অর্থের উৎস নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়। এসব অভিযোগ ব্যাংকটির পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনাকেও দুর্বল করে দেয়।
সরকারি অর্থও আটকে যায়
শুধু সাধারণ গ্রাহকের আমানত নয়, বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের বিপুল পরিমাণ আমানতও পদ্মা ব্যাংকে জমা ছিল। আর্থিক সংকট গভীর হওয়ার পর সেই অর্থও আটকে পড়ে। ফলে ক্ষতির পরিধি শুধু একটি ব্যাংকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; এর প্রভাব সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনাতেও পড়ে।
আজকের পদ্মা ব্যাংক
বর্তমানে পদ্মা ব্যাংক কার্যত গভীর সংকটে রয়েছে। নতুন ঋণ বিতরণ ও আমানত সংগ্রহ কার্যক্রম প্রায় স্থবির। পুরোনো গ্রাহকদের অর্থ ফেরত দিতে না পারায় আস্থা তলানিতে নেমে এসেছে। অনেক গ্রাহক দীর্ঘ সময় ধরে নিজেদের সঞ্চয় তুলতে না পেরে মানবিক ও আর্থিক সংকটে পড়েছেন।
একই সঙ্গে ব্যাংকটির বিপুল খেলাপি ঋণ, মূলধন ঘাটতি এবং আর্থিক দুর্বলতা এটিকে টিকিয়ে রাখার প্রশ্নকে আরও জটিল করে তুলেছে। ফলে ভবিষ্যতে একীভূতকরণ, পুনর্গঠন বা অবসায়ন—যে সিদ্ধান্তই নেওয়া হোক না কেন, তা দেশের ব্যাংকিং খাতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির হয়ে থাকবে।
ফারমার্স ব্যাংক থেকে পদ্মা ব্যাংক-এই নাম পরিবর্তনের গল্প মূলত একটি প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি বদলের চেষ্টা ছিল। কিন্তু শুধু নাম বদলালে প্রতিষ্ঠান বদলায় না; সুশাসন, জবাবদিহি ও কঠোর নজরদারি ছাড়া কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠান টেকসই হতে পারে না। পদ্মা ব্যাংকের দীর্ঘ সংকট সেই বাস্তবতারই একটি কঠিন উদাহরণ।
অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো-ব্যাংকিং খাতে রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল নিয়ন্ত্রণ এবং জবাবদিহির অভাব শেষ পর্যন্ত শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের নয়, লাখো আমানতকারী এবং সামগ্রিক অর্থনীতির জন্যও বড় ঝুঁকি তৈরি করে।
Comments