সাবঅলটার্ন কেন আসলে 'সাবঅলটার্ন' নয়
গত কয়েক দশকে দক্ষিণ এশীয় সমাজবিজ্ঞান, ইতিহাস এবং সাহিত্য সমালোচনার অন্যতম সবচেয়ে আলোচিত ও প্রভাবশালী ধারণা হলো 'সাবঅলটার্ন' (Subaltern) বা নিম্নবর্গ। সাধারণ অর্থে, ক্ষমতার কাঠামোর বাইরে অবস্থানকারী যে জনগোষ্ঠীর কণ্ঠস্বর রাষ্ট্র, পুঁজি, জ্ঞান-উৎপাদন এবং সাংস্কৃতিক আধিপত্যের ভেতরে যথাযথভাবে প্রতিনিধিত্ব পায় না, তারাই সাবঅলটার্ন। কিন্তু ধারণাটি যত জনপ্রিয় হয়েছে, ততই একটি মৌলিক ও অস্বস্তিকর প্রশ্ন সামনে এসেছে-যাদের আমরা 'সাবঅলটার্ন' বলে চিহ্নিত করছি, তারা কি আসলেই সাবঅলটার্ন?
এই প্রশ্নের সবচেয়ে তীক্ষ্ণ ও তাত্ত্বিক রূপটি হাজির করেছিলেন উত্তর-ঔপনিবেশিক চিন্তাবিদ গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক তাঁর বিখ্যাত প্রবন্ধ 'Can the Subaltern Speak?' (সাবঅলটার্ন কি কথা বলতে পারে?)-এ। স্পিভাকের মূল যুক্তি ছিল, সাবঅলটার্নের সমস্যা কেবল তার নীরবতা নয়; বরং তার হয়ে যারা কথা বলে, তারা অজান্তেই তাকে আরও বেশি নীরব করে ফেলে।
সাবঅলটার্ন : একটি তাত্ত্বিক নির্মাণ
ইতালীয় মার্কসবাদী চিন্তাবিদ আন্তোনিও গ্রামশি 'সাবঅলটার্ন' শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন রাষ্ট্র ও আধিপত্যশীল শ্রেণির বাইরে থাকা অবদমিত জনগণকে বোঝাতে। পরবর্তীতে আশির দশকে রণজিৎ গুহ এবং 'সাবঅলটার্ন স্টাডিজ' গোষ্ঠী ঔপনিবেশিক ভারতের ইতিহাসকে নতুনভাবে পাঠ করার জন্য এই ধারণাকে সামনে নিয়ে আসেন। তাঁদের দাবি ছিল, প্রচলিত ইতিহাস মূলত অভিজাতদের বয়ানে রচিত; সেখানে কৃষক, শ্রমিক ও প্রান্তিক মানুষের নিজস্ব অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ অনুপস্থিত।
কিন্তু এখানেই একটি মৌলিক দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। যখন একজন মধ্যবিত্ত বা উচ্চবিত্ত গবেষক, ইতিহাসবিদ বা বুদ্ধিজীবী সাবঅলটার্নের হয়ে ইতিহাস লিখছেন, তখন প্রকৃতপক্ষে কে কথা বলছে? সাবঅলটার্ন নিজে,নাকি তার স্বঘোষিত প্রতিনিধি?
স্পিভাকের আপত্তি: "সাবঅলটার্ন কথা বলতে পারে না"
স্পিভাকের বহুল উদ্ধৃত বক্তব্য-"The subaltern cannot speak"-প্রায়শই ভুলভাবে উপস্থাপিত হয়। তিনি বলতে চাননি যে প্রান্তিক মানুষের কোনো ভাষা নেই বা তারা প্রতিবাদ করতে জানে না। বরং তাঁর আসল বক্তব্য ছিল,ক্ষমতার প্রচলিত কাঠামোর মধ্যে সাবঅলটার্নের কণ্ঠস্বরটি এমনভাবে অনুবাদ,ব্যাখ্যা এবং পুনর্গঠিত হয় যে,শেষ পর্যন্ত তার আদি ও অকৃত্রিম কণ্ঠস্বরটি আর শোনা যায় না।
সহজ কথায়,সাবঅলটার্ন যখন ক্ষমতার কেন্দ্রে নিজের কথা পৌঁছাতে চায়,তখন তাকে এলিট বা অভিজাতদের তৈরি 'জ্ঞানতাত্ত্বিক কাঠামো'র মধ্য দিয়ে আসতে হয়। ফলে যা শোনা যায়,তা আর সাবঅলটার্নের নিজস্ব ভাষা থাকে না;তা হয়ে ওঠে আধিপত্যশীল শ্রেণির ভাষায় অনূদিত এক বয়ান। এই অর্থে,'সাবঅলটার্ন' কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠী নয়; বরং এটি এমন এক প্রান্তিক অবস্থান, যেখানে পৌঁছানোর পর মানুষের নিজস্ব কণ্ঠস্বরটি কাঠামোগত কারণেই হারিয়ে যায়।
দৃশ্যমানতার প্যারাডক্স: যখন সে আর সাবঅলটার্ন নয়
সাবঅলটার্ন ধারণার সবচেয়ে বড় পরিহাস বা প্যারাডক্স এখানেই। কোনো জনগোষ্ঠী যখন প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণার বিষয় হয়, রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত হয়, গণমাধ্যমে স্থান পায় বা আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার এজেন্ডায় অন্তর্ভুক্ত হয়-তখন তারা আর সম্পূর্ণ অদৃশ্য থাকে না।
অর্থাৎ, যাকে আমরা 'সাবঅলটার্ন' বলে শনাক্ত করতে পারছি, তাকে আমরা ইতোমধ্যেই কোনো না কোনো প্রতিনিধিত্বের কাঠামোর মধ্যে নিয়ে এসেছি। আর যে মুহূর্তে সে কোনো কাঠামোর ভেতর চলে আসে, সে আর স্পিভাকীয় অর্থে 'সাবঅলটার্ন' থাকে না। এই কারণেই বলা যায়, সাবঅলটার্নকে সংজ্ঞায়িত বা চিহ্নিত করার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই তার সাবঅলটার্ন অবস্থানের আংশিক অবসান ঘটে।
প্রান্তিকতার বাজার এবং প্রতিনিধিত্বের রাজনীতি
সমসাময়িক বিশ্বে সাবঅলটার্ন কেবল একটি তাত্ত্বিক ধারণা নয়, বরং এটি অ্যাকাডেমিক ও সাংস্কৃতিক উৎপাদনের একটি লাভজনক ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। প্রান্তিক মানুষের জীবন নিয়ে পিএইচডি হচ্ছে,বড় বড় প্রজেক্ট হচ্ছে,আন্তর্জাতিক ফান্ড আসছে এবং সেমিনার-সিম্পোজিয়াম হচ্ছে। কিন্তু অদ্ভুত বিষয় হলো,এই পুরো প্রক্রিয়ায় প্রান্তিক মানুষের চেয়ে তাদের 'প্রতিনিধিত্বকারী' এলিট বুদ্ধিজীবী ও এনজিও রেটরিকরাই বেশি দৃশ্যমান এবং লাভবান হচ্ছে।
ফলে সাবঅলটার্ন এক বাস্তব সামাজিক অবস্থার চেয়েও অনেক সময় অ্যাকাডেমিক ও সাংস্কৃতিক পুঁজিতে পরিণত হয়। এখানে স্পিভাকের প্রশ্নটি তীব্রভাবে ফিরে আসে-আমরা কি সত্যিই সাবঅলটার্নের কথা শুনছি,নাকি সাবঅলটার্নকে পণ্য বানিয়ে তার সম্পর্কে নির্মিত আমাদের নিজস্ব বয়ান শুনছি?
পরিচয় বনাম সম্পর্ক
সাবঅলটার্নকে একটি স্থায়ী বা অপরিবর্তনীয় 'পরিচয়' হিসেবে দেখার ভুল প্রবণতা আমাদের রয়েছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এটি কোনো নির্দিষ্ট জাতি, লিঙ্গ বা শ্রেণির নাম নয়;এটি ক্ষমতার সাথে একটি আপেক্ষিক সম্পর্ক। একজন মানুষ একটি নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সাবঅলটার্ন হতে পারেন,আবার অন্য পরিস্থিতিতে ক্ষমতার কাঠামোর অংশ হয়ে উঠতে পারেন।তাই সাবঅলটার্নত্বকে চিরস্থায়ী পরিচয় হিসেবে দেখলে এর গতিশীল রাজনৈতিক তাৎপর্য হারিয়ে যায়।
"সাবঅলটার্ন কেন আসলে সাবঅলটার্ন নয়"-এই মীমাংসার অর্থ সাবঅলটার্নের বাস্তব দুঃখ দুর্দশাকে অস্বীকার করা নয়। বরং এটি আমাদের এই সত্যটি স্মরণ করিয়ে দেয় যে, সাবঅলটার্ন ধারণাটি নিজেই একটি জটিল ও পরস্পরবিরোধী ফাঁদ। যে মুহূর্তে আমরা তাকে উদ্ধার করতে যাই, তার হয়ে কথা বলি বা তাকে ইতিহাসের পাতায় স্থান দিই, সে আর আগের অর্থে "নিঃশব্দ" থাকে না।
স্পিভাকের ভাষায়, সংকটটি সাবঅলটার্নের কথা বলার ক্ষমতাহীনতার নয়; সংকটটি হলো এমন একটি রাজনৈতিক ও জ্ঞানতাত্ত্বিক কাঠামোর, যা তার কণ্ঠস্বরকে নিজের রূপে শুনতে দেয় না। তাই সাব অলটার্নকে জানার একমাত্র উপায় তাকে জবরদস্তিমূলক সংজ্ঞায় বেঁধে ফেলা নয়, বরং প্রতিনিয়ত এই আত্ম-জিজ্ঞাসা জারি রাখা-কে কথা বলছে,কার হয়ে কথা বলছে এবং এই বলার আড়ালে কার কণ্ঠস্বর চিরতরে হারিয়ে যাচ্ছে্-সেখানে।
লেখক : গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব
Comments