আতঙ্ক,অনিশ্চয়তা: রাস্তা থেকে ঘর-কোথাও নিরাপদ নয় মানুষ
দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সাধারণ মানুষের উদ্বেগ দিন দিন বাড়ছে। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো শুধু সাধারণ নাগরিকদের নয়,রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদেরও নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে সশস্ত্র ডাকাতদের হামলায় কুমিল্লার মুরাদনগরের সহকারী কমিশনার (ভূমি) সাকিব হাছান খাঁনসহ কয়েকজন আহত হওয়ার ঘটনা সেই উদ্বেগকে আরও তীব্র করেছে। নিজের গ্রামের বাড়িতে অবস্থানরত একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তাও যখন অপরাধীদের হামলার শিকার হন,তখন দেশের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি সম্পর্কে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে।
পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যানও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। গত তিন মাসে দেশে ৯১৫টি হত্যাকাণ্ডের মামলা নথিভুক্ত হয়েছে, অর্থাৎ গড়ে প্রতিদিন ১০টির বেশি খুনের ঘটনা ঘটেছে। মার্চে ৩১৭টি, এপ্রিলে ২৮৮টি এবং মে মাসে ৩১০টি হত্যামামলা হয়েছে। অঞ্চলভিত্তিক হিসাবে ঢাকা রেঞ্জে সবচেয়ে বেশি ২০৭টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এরপর রয়েছে চট্টগ্রাম,রাজশাহী ও খুলনা অঞ্চল। রাজধানী ঢাকাও হত্যাকাণ্ডের তালিকায় শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে সংবাদমাধ্যমের শিরোনামগুলোতে প্রায় প্রতিদিনই সহিংসতার খবর স্থান পাচ্ছে। কোথাও রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে গুলিবর্ষণ,কোথাও প্রকাশ্য হত্যাকাণ্ড,আবার কোথাও সন্ত্রাসীদের হামলায় আহত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। সড়কে ছিনতাই,চাঁদাবাজি,দখলদারি এবং সংঘবদ্ধ অপরাধের ঘটনাও বেড়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে নাগরিকদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি আরও গভীর হচ্ছে।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি নিয়ে মানুষের যে প্রত্যাশা ছিল,তা এখনো পূরণ হয়নি বলে অনেকের ধারণা। নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পরও হত্যাকাণ্ড, মাদক ব্যবসা, নারী ও শিশু নির্যাতন এবং সংঘবদ্ধ অপরাধের ঘটনা কমেনি-এমন অভিযোগ বিভিন্ন মহল থেকে উঠে আসছে। ফলে জনগণের একাংশের মধ্যে হতাশা ও উদ্বেগ বাড়ছে।
বিশ্লেষকদের মতে,অবৈধ অস্ত্রের বিস্তার,সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের সক্রিয়তা এবং রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব বর্তমান সহিংসতার অন্যতম কারণ। অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও অভ্যন্তরীণ কোন্দল রাস্তায় সংঘর্ষে রূপ নিচ্ছে। অপরাধী গোষ্ঠীগুলো ক্ষমতার লড়াইয়ে ব্যবহৃত হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে,যার ফলে টার্গেট কিলিং,গুলি ও হামলার ঘটনা বাড়ছে।
নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতাও উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ধর্ষণ,যৌন নির্যাতন এবং শিশু নির্যাতনের খবর প্রায় প্রতিদিনই প্রকাশিত হচ্ছে। এসব ঘটনা শুধু অপরাধ বৃদ্ধির চিত্রই তুলে ধরে না,বরং সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় এবং আইন প্রয়োগের সীমাবদ্ধতাও প্রকাশ করে।
একই সঙ্গে গণপিটুনি ও মব সহিংসতার ঘটনাও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বিভিন্ন তথ্য অনুযায়ী,গত মে মাসে মব সহিংসতা ও গণপিটুনির ঘটনায় বহু মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার এই প্রবণতা সমাজে অস্থিরতা ও ভয় আরও বাড়িয়ে তুলছে।
অপরাধ দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। অভিযোগ রয়েছে,অনেক ক্ষেত্রে অপরাধ সংঘটনের আগেই তথ্য পাওয়া গেলেও তা প্রতিরোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। অপরাধীরা রাজনৈতিক পরিচয়,স্থানীয় প্রভাব কিংবা সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কের আশ্রয়ে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করছে বলেও বিভিন্ন মহলে আলোচনা রয়েছে।
নাগরিক সমাজও এ পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। হত্যা,অপহরণ,নারী ও শিশু নির্যাতন, চাঁদাবাজি,জবরদখল এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার ঘটনাগুলো নিয়ে বিভিন্ন সংগঠন সতর্কবার্তা দিয়েছে। তাদের মতে,আইনের শাসন শক্তিশালী না হলে এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
সবশেষে বলা যায়,জনগণ এখন আশ্বাসের চেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ দেখতে চায়। নিরাপত্তা নিশ্চিত করা,অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ,অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার এবং আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ-এসবই সময়ের দাবি। একটি স্থিতিশীল,নিরাপদ ও মানবিক রাষ্ট্র গঠনের জন্য আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এখন শুধু প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়,বরং জাতীয় অগ্রাধিকারের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
Comments