ওয়াশিং মেশিন ও মাইক্রোওয়েভ ওভেন ইস্যুতে উত্তপ্ত সংসদ
সংসদ সদস্যদের (এমপি) সরকারি আবাসিক ফ্ল্যাটে ওয়াশিং মেশিন, মাইক্রোওয়েভ ওভেন ও পর্দা সরবরাহের দাবি ঘিরে জাতীয় সংসদে তীব্র শোরগোল ও তর্ক-বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর এক সংসদ সদস্যের উত্থাপিত এই দাবিকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থ কটাক্ষমূলক মন্তব্য করলে সংসদ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
পরবর্তীতে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বিজেপি চেয়ারম্যানের বক্তব্যকে সংশ্লিষ্ট সদস্যের জন্য 'অসম্মানজনক' হিসেবে উল্লেখ করেন। অন্যদিকে, বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান সংসদে দাঁড়িয়ে পরনিন্দার চর্চা পরিহার করে সংসদ সদস্যদের মানসিকতা পরিবর্তনের আহ্বান জানান।
বৃহস্পতিবার (১৮ জুন, ২০২৬) বিকেলে জাতীয় সংসদ অধিবেশনে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে বিষয়টি প্রথম উত্থাপন করেন বিজেপি চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থ। তিনি বলেন, "দীর্ঘ সংগ্রামের পর দেশের মানুষ একটি কার্যকর ও ফ্যাসিবাদমুক্ত সংসদ পেয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক কিছু বিষয় সংসদের মর্যাদা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।"
গণমাধ্যমে প্রকাশিত জামায়াত এমপির দাবির খবরের সূত্র ধরে পার্থ বলেন, "সংসদ জনগণের মৌলিক সমস্যা ও অধিকার নিয়ে কথা বলার জায়গা। সেখানে দাঁড়িয়ে ওয়াশিং মেশিন, মাইক্রোওয়েভ ওভেন বা পর্দা না পাওয়ার অভাব অভিযোগ করা সংসদের মর্যাদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।" চলতি সংসদে গাড়ি ও প্লটের মতো বড় সুবিধা ত্যাগের ঘোষণার কথা মনে করিয়ে দিয়ে তিনি কৌতুকের সুরে বলেন:
"ভবিষ্যতে যদি আমার ওই ভাইয়ের মাইক্রোওয়েভ ওভেন বা পর্দার প্রয়োজন হয়, তবে আমি ব্যক্তিগতভাবে একটি ওভেন দিতে প্রস্তুত আছি। প্রধানমন্ত্রীর কাছে অনুরোধ করব তিনি যেন একটি ওয়াশিং মেশিনের ব্যবস্থা করেন, আর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে বলব পর্দার ব্যবস্থা করতে। আমরা সবাই মিলে ওনার সংসার গুছিয়ে দিতে পারতাম।"
এ সময় উপস্থিত সরকারি দলের সংসদ সদস্যরা টেবিল চাপড়ে পার্থর বক্তব্যকে সমর্থন জানান।
পার্থর বক্তব্যের পর স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ পুরো বিষয়টির ব্যাখ্যা ও মধ্যস্থতা করেন। তিনি জানান, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসনের জামায়াতের সংসদ সদস্য মিজানুর রহমান মূলত বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে দেশের সব এমপির আবাসিক ভবনের সুবিধার কথা চিন্তা করে বিষয়টি তুলেছিলেন।
স্পিকার বলেন, "আমি মনে করি, বিষয়টি সংসদে না তুলে আবাসনসংক্রান্ত সংসদীয় কমিটিতে তোলা যেত। তবে তিনি এমন কোনো গর্হিত অপরাধ করেননি। ওয়াশিং মেশিন বা মাইক্রোওয়েভ ওভেন এমন কোনো বড় বিলাসবহুল সুবিধা নয় যে তা নিয়ে সংসদে এই ধরনের বড় বিতর্ক বা বাড়াবাড়ি করতে হবে। এতে জনমনে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হতে পারে।"
পার্থকে উদ্দেশ্য করে স্পিকার আরও বলেন, "আপনি যেভাবে একজন সদস্যকে ব্যক্তিগতভাবে জিনিস দেওয়ার প্রস্তাব করেছেন, সেটিও তাঁর জন্য অসম্মানজনক হতে পারে। তিনি নিজের জন্য ব্যক্তিগতভাবে চাননি, সবার জন্য চেয়েছেন।"
স্পিকারের বক্তব্যের পর পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে বিজেপি চেয়ারম্যানের কড়া সমালোচনা করেন বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, "সংশ্লিষ্ট সদস্য বিষয়টি সংসদে না তুলে কমিটিতে জানাতে পারতেন—তা সত্য। কিন্তু তা নিয়ে সংসদে যেভাবে গাড়ি ও প্লটের প্রসঙ্গ টেনে উপহাস করা হলো, তা দুঃখজনক। তিনি (পার্থ) একজন অভিজ্ঞ পার্লামেন্টারিয়ান হয়ে নিজেই আবার সবকিছু দান করার প্রস্তাব দিয়ে দিলেন, অথচ কেউ তাঁর কাছে কিছু ভিক্ষা চায়নি।"
জামায়াত আমির ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "আমাদের মানসিকতা এমন হওয়া উচিত নয় যে সংসদে দাঁড়িয়ে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বা কারো ব্যক্তিগত সম্মানে আঘাত করা হবে। সংসদে পরস্পরের প্রতি ন্যূনতম সম্মান ও শিষ্টাচার বজায় রাখা সবার পবিত্র দায়িত্ব।"
উল্লেখ্য, গত বুধবার বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসনের জামায়াত এমপি মিজানুর রহমান অভিযোগ করেছিলেন যে, এমপিদের জন্য বরাদ্দকৃত ফ্ল্যাটগুলোর দরজা-জানালায় এখনো পর্দা লাগানো হয়নি এবং প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ওয়াশিং মেশিন ও মাইক্রোওয়েভ ওভেন সরবরাহ করা হয়নি। সেই বক্তব্যকে কেন্দ্র করেই বৃহস্পতিবারের অধিবেশনে এই নাটকীয় বিতর্কের সূত্রপাত হয়।
Comments