পারস্পরিক আস্থা ও সুরক্ষাই বাংলাদেশের ই-কমার্স খাতের টেকসই বিকাশের আসল পথ
বাংলাদেশের ই-কমার্স খাতে এখন চারপাশে এক অদ্ভুত সংকট তৈরি হয়েছে। এখানে শুধু গ্রাহকরাই ঠকছেন না, ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোও প্রতিনিয়ত নানামুখী জালিয়াতির শিকার হচ্ছে। এই দ্বিমুখী প্রতারণা পুরো ইন্ডাস্ট্রির ওপর মানুষের বিশ্বাসটাই কমিয়ে দিয়েছে। অথচ অনলাইন কেনাকাটার বাজারকে বড় করতে হলে এই আস্থার সংকট দূর করার কোনো বিকল্প নেই। গ্রাহকরা যখন নিশ্চিত হবেন যে তারা সঠিক পণ্য পাবেন, তখনই বিক্রির পরিধি বাড়বে। একইভাবে, প্রতিষ্ঠানগুলো যখন ক্রেতাদের সততার বিষয়ে আশ্বস্ত হতে পারবে, তখনই তারা উন্নত সেবা ও নতুন বিনিয়োগে উৎসাহিত হবে। দিনশেষে এই পারস্পরিক আস্থার সুফল কিন্তু সাধারণ ভোক্তারাই পাবেন।
এই জট খুলতে হলে ক্রেতা-বিক্রেতা উভয় পক্ষের সচেতনতা যেমন দরকার, তেমনি দরকার ভেতরের সমস্যাগুলো নিয়ে খোলাখুলি আলোচনা। সমসাময়িক সময়ে দুই পক্ষ যেভাবে প্রতারিত হচ্ছে এবং তা থেকে উত্তরণের যে পথ, তা গভীর নিবিড়ভাবে তলিয়ে দেখা প্রয়োজন।
গ্রাহকরা যেভাবে ফাঁদে পড়ছেন — সনাতনী চাল ও প্রযুক্তির নতুন রূপ।
ডিজিটাল প্রযুক্তির যত প্রসার হচ্ছে, অসাধু চক্রগুলো গ্রাহকদের ফাঁদে ফেলার জন্য সাধারণ জালিয়াতির পাশাপাশি তত নিত্যনতুন মনস্তাত্ত্বিক ও প্রযুক্তিগত কৌশল ব্যবহার করছে।
অনেকেই বাজারে ৫০% থেকে ১০০% পর্যন্ত ক্যাশব্যাক বা অবিশ্বাস্য কম দামে পণ্য বিক্রির লোভনীয় অফার ছড়িয়ে দেয়। এই চটকদার বিজ্ঞাপনে প্রলোভিত হয়ে মানুষ যখন অগ্রিম টাকা পরিশোধ করে, তারপর দেখা যায় সেই পণ্যের আর কোনো হদিস থাকে না। সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করতে অনেক বিতর্কিত বা ভুয়া প্রতিষ্ঠান বিখ্যাত ব্যক্তি, সেলিব্রিটি কিংবা নামী সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সারদের দিয়ে বিজ্ঞাপন করায়। প্রিয় তারকাদের দেখে মানুষও অন্ধের মতো বিশ্বাস করে ফাঁদে পা দেয়।
আজকাল আবার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করে নামী ব্র্যান্ডের লোগো ও ওয়েবসাইট হুবহু নকল করার চল শুরু হয়েছে। এমনকি সেলিব্রিটিদের কণ্ঠ ও চেহারা এআই-এর মাধ্যমে ক্লোন বা ডিপফেক করে এমনভাবে ভুয়া অফার ছড়ানো হচ্ছে যে সাধারণ ক্রেতাদের পক্ষে আসল-নকল চেনা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। অনেক সময় প্রতিষ্ঠান সরাসরি টাকা মারে না, কিন্তু অ্যাপ বা ওয়েবসাইটের ডিজাইন এমনভাবে করে যা গ্রাহককে বিভ্রান্ত করে। যেমন—শেষ মুহূর্তে 'প্রসেসিং ফি' বা 'প্যাকিং চার্জ' নামে কিছু গোপন খরচ যোগ করে দেওয়া হয়। আবার কৃত্রিমভাবে "মাত্র ১টি পণ্য বাকি আছে" বা "অফারটি শেষ হতে ৫ মিনিট বাকি" এমন ভুয়া তাগিদ তৈরি করে ক্রেতাকে দ্রুত পেমেন্ট করতে বাধ্য করা হয়।
পণ্য ডেলিভারির আগেই সম্পূর্ণ বা বড় অঙ্কের অর্থ অগ্রিম পরিশোধের শর্ত দিয়ে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার পর কাস্টমার সার্ভিস নম্বর বন্ধ বা সোশ্যাল মিডিয়া পেজ থেকে গ্রাহককে ব্লক করে দেওয়ার ঘটনা তো নিত্যদিনের। কিছু চক্র আসল ই-কমার্স সাইটের মতো দেখতে হুবহু ভুয়া বা ফিশিং সাইট তৈরি করে গ্রাহকদের ব্যক্তিগত ও আর্থিক তথ্য, যেমনカードের পিন বা ওটিপি চুরি করে নেয়। বড় অঙ্কের টাকা জমা হওয়ার পর তারা মূল প্ল্যাটফর্মটি হঠাৎ বন্ধ করে গায়েব হয়ে যায়।
আবার ই-কমার্সের মোড়কে এক ধরণের অবৈধ এমএলএম বা পিরামিড স্কিমের মতো পঞ্জি ব্যবসাও চলছে। সেখানে পণ্য বিক্রির চেয়ে নতুন গ্রাহক যোগ করিয়ে অবাস্তব লাভের প্রলোভন দেখানোই প্রধান উদ্দেশ্য থাকে। এর বাইরে ছবিতে পণ্যের গুণগত মান চমৎকার দেখালেও বাস্তবে অত্যন্ত নিম্নমানের বা সম্পূর্ণ ভিন্ন পণ্য সরবরাহ করা এবং ডেলিভারির জন্য মাসের পর মাস অতিরিক্ত সময় নিয়ে গ্রাহককে আর্থিক ও মানসিকভাবে হেনস্তা করার ঘটনা তো রয়েছেই। লজিস্টিকস বা কুরিয়ার জালিয়াতির মাধ্যমে কুরিয়ার বক্সের ভেতরে ইট-পাথর বা বালি ভরে গ্রাহকের কাছে পাঠানো হচ্ছে, যেখানে বক্স খোলার আগেই কুরিয়ার প্রতিনিধি টাকা নিয়ে চলে যায় এবং গ্রাহককে জিম্মি হতে হয়।
ক্রেতাদের সুরক্ষায় বাস্তবসম্মত করণীয়
এই থেকে বাঁচতে কেনাকাটার আগে পেজ বা ওয়েবসাইটের ট্রান্সপারেন্সি বা তৈরির তারিখ এবং অন্যান্য গ্রাহকদের বাস্তব অভিজ্ঞতা ভালো করে যাচাই করতে হবে। বিখ্যাত ব্র্যান্ডের নামের বানান ও লোগো সঠিক আছে কিনা তা পরীক্ষা করা জরুরি। অস্বাভাবিক উচ্চ ছাড় বা অবাস্তব ক্যাশব্যাক অফার দেখলে তাৎক্ষণিক লোভ পরিহার করে সতর্ক হতে হবে। অপরিচিত বা নতুন সাইটের ক্ষেত্রে সবসময় ক্যাশ অন ডেলিভারি এবং সম্ভব হলে "ওপেন বক্স ডেলিভারি" বা পণ্য দেখে নেওয়ার সুযোগ সুবিধা ব্যবহার করা উচিত। বাংলাদেশ ব্যাংক অনুমোদিত এসক্রো গেটওয়ে ব্যবহারের চেষ্টা করা যেতে পারে, যেখানে ক্রেতার পরিশোধিত অর্থ তৃতীয় পক্ষের কাছে জমা থাকে এবং পণ্য হাতে পাওয়ার পর সেই অর্থ বিক্রেতা পান।
ইমেইল, এসএমএস বা সোশ্যাল মিডিয়ায় আসা কোনো অপরিচিত বা সন্দেহজনক লিঙ্কে ক্লিক করা থেকে বিরত থাকতে হবে, কারণ এগুলো ফিশিং বা ম্যালওয়্যার হতে পারে। কেনাকাটার আগে সাইটের গোপনীয়তা নীতি এবং রিটার্ন বা রিফান্ড শর্তাবলী ভালোভাবে পড়ে নেওয়া ভালো। আর প্রতারিত হলে চুপ না থেকে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, পুলিশ সদর দপ্তরের সাইবার ক্রাইম ইউনিট, বা জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে দ্রুত তথ্যপ্রমাণসহ অভিযোগ দায়ের করতে হবে।
ডিবি আইডির জটিলতা ও বিকল্প যাচাই পদ্ধতি
বাংলাদেশ সরকার ডিজিটাল কমার্সকে নিয়মের মধ্যে আনতে ডিজিটাল বিজনেস আইডি বা ডিবি আইডি চালু করলেও মাঠপর্যায়ের ক্ষুদ্র, মাঝারি এবং ফেসবুক ভিত্তিক এফ-কমার্স উদ্যোক্তাদের জন্য এটি সংগ্রহ করা পাহাড়সম জটিল। *ডিজিটাল কমার্স রিসার্চ অ্যান্ড অ্যাডভোকাসি ফোরাম (DCRAF)*-এর মাঠপর্যায়ের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী—নিজস্ব ডোমেইন থাকার বাধ্যবাধকতা, ইউনিক ল্যান্ডমার্ক ও ঠিকানার জটিলতা এবং কঠোর আইনি নথিপত্রের দীর্ঘসূত্রতার কারণে অনেক সৎ ও ছোট উদ্যোক্তার পক্ষেও ডিবি আইডি পাওয়া সম্ভব হয় না।
তাই সাধারণ গ্রাহকদের সুরক্ষায় ডিবি আইডির পাশাপাশি ডিসিআরএএফ (DCRAF) সমর্থিত আরও কিছু সহজ, সরল ও বাস্তবসম্মত বিকল্প যাচাই পদ্ধতি ব্যবহার করা যেতে পারে। যেমন, ডিবি আইডি না থাকলেও প্রতিষ্ঠানটির নামে কোনো বৈধ ট্রেড লাইসেন্স বা ১২ ডিজিটের ট্যাক্স আইডেন্টিফিকেশন নম্বর বা ই-টিন আছে কিনা তা অনলাইনের মাধ্যমে খুব সহজেই যাচাই করা সম্ভব। লেনদেনের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত বিকাশ বা নগদ নম্বরের চেয়ে নিবন্ধিত 'মার্চেন্ট অ্যাকাউন্ট' ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠানগুলো অনেক বেশি নির্ভরযোগ্য। কারণ মোবাইল ব্যাংকিং অপারেটররা কঠোরভাবে জাতীয় পরিচয়পত্র ও ব্যবসার নথিপত্র যাচাই করেই কেবল মার্চেন্ট সুবিধা দেয়।
কোনো জটিল আইডি ছাড়াও ফেসবুক পেজের "Page Transparency" অপশনে গিয়ে যে কেউ দেখতে পারেন পেজটি কত বছর পুরনো এবং এর আগে পেজের নাম কতবার পরিবর্তন করা হয়েছে। দীর্ঘদিনের পুরনো এবং নাম অপরিবর্তিত থাকা পেজগুলো সাধারণত নিরাপদ ও বিশ্বাসযোগ্য হয়ে থাকে। পেমেন্ট করার আগে বিক্রেতার নম্বরটি ট্রুকলারের মতো কলার আইডি অ্যাপে সার্চ করে কোনো স্প্যাম বা ফ্রড রিপোর্ট আছে কিনা তা দেখা যায়। পাশাপাশি ই-কমার্সের বিভিন্ন বড় ফেসবুক গ্রুপে উক্ত প্রতিষ্ঠানের নাম লিখে সার্চ দিলে পূর্বের গ্রাহকদের বাস্তব অভিজ্ঞতা মুহূর্তেই জানা সম্ভব।
উদ্যোক্তাদের নীরব কান্না — জালিয়াতির নতুন ফাঁদ ও ভেতরের অদৃশ্য সংকট
ডিজিটাল কমার্স কেবল গ্রাহকদের জন্য নয়, বরং উদ্যোক্তাদের—বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি বা এসএমই উদ্যোক্তাদের জন্যও মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে যখন অসাধু বা অসচেতন ব্যবহারকারীরা প্ল্যাটফর্মগুলোর অপব্যবহার করেন।
এক শ্রেণীর অসাধু ব্যবহারকারী বা প্রতিযোগী চক্র ইচ্ছাকৃতভাবে ভুয়া নাম-ঠিকানা ব্যবহার করে প্রচুর সংখ্যক ক্যাশ অন ডেলিভারি বা সিওডি অর্ডার দেয়। পরবর্তীতে পণ্য ডেলিভারি না নিয়ে রিফিউজ করায় প্রতিষ্ঠানগুলোর বিশাল অঙ্কের কুরিয়ার বা লজিস্টিকস খরচ অপচয় হয়। ফ্যাশন ও লাইফস্টাইল ই-কমার্সে রিটার্ন পলিসির অপব্যবহার বা "ওয়ার্ডরোবিং" নামের প্রবণতাটি মারাত্মকভাবে বাড়ছে। অনেক গ্রাহক দামী পোশাক, গ্যাজেট বা গহনা অর্ডার করেন। এরপর কোনো অনুষ্ঠান বা সামাজিক মাধ্যমে ছবি বা রিলস তোলার জন্য সেটি ব্যবহার করে, তিনদিনের মধ্যে "পছন্দ হয়নি" বলে রিটার্ন করে দেন। এতে বিক্রেতা ব্যবহৃত পণ্য ফেরত পান, যা তিনি আর নতুন হিসেবে বিক্রি করতে পারেন না।
অনেক সময় গ্রাহক আসল ও ভালো পণ্যটি বুঝে পাওয়ার পর তা নিজের ব্যবহৃত বা কোনো নষ্ট-নিম্নমানের পণ্য দিয়ে বক্সের ভেতরে পরিবর্তন করে বিক্রেতার কাছে রিটার্ন পাঠায়। এতে বিক্রেতা তার আসল মূল্যবান পণ্যটি হারান। কুরিয়ারের ভেতরের কিছু অসাধু কর্মী ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের সফল গ্রাহকদের ডেটাবেজ বাইরে পাচার বা বিক্রি করে দেয়। পণ্য আসল কুরিয়ারে পৌঁছানোর আগেই অন্য একটি চক্র গ্রাহকের তথ্য দেখে ফোন করে অগ্রিম বিকাশ চার্জ দাবি করে। গ্রাহক টাকা দিলে আসল পণ্য আর আসে না, যার দায় এসে পড়ে মূল ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের ওপর।
চুরি করা ক্রেডিট কার্ড বা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের ভুয়া তথ্যের মাধ্যমে পণ্য কিনে নেওয়া কিংবা গ্রাহক পণ্য পাওয়ার পরেও পেমেন্ট অস্বীকার করে ব্যাংকের কাছে মিথ্যা অভিযোগ করে যে পণ্য পায়নি—এমন পেমেন্ট ও চার্জব্যাক প্রতারণাও ঘটছে। যখন আসল কার্ড হোল্ডার অভিযোগ করে, তখন পেমেন্ট বাতিল বা চার্জব্যাক হয় এবং প্রতিষ্ঠানকে অর্থ ও পণ্য দুটোই হারাতে হয়। কিছু গ্রাহক আবার অফার বা কুপনের অপব্যবহার করার জন্য একই ডিভাইস থেকে ভিন্ন ভিন্ন ভুয়া আইপি অ্যাড্রেস বা ফোন নম্বর ব্যবহার করে একাধিক অ্যাকাউন্ট তৈরি করে এবং অনৈতিকভাবে ডিসকাউন্ট হাতিয়ে নেয়। অন্যের ব্যক্তিগত ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের তথ্য চুরি করে অর্ডার দিয়ে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানকে আইনি বা আর্থিক ঝুঁকিতে ফেলার মতো ঘটনাও ঘটছে।
উদ্যোক্তা ও প্রতিষ্ঠানের সুরক্ষায় করণীয়
উদ্যোক্তাদের এই ক্ষতি এড়াতে শক্তিশালী অর্ডার ভেরিফিকেশন সিস্টেম চালু করতে হবে। পণ্য প্যাকেজিংয়ের আগে ফোন নম্বর এবং ইমেইল ভেরিফিকেশন বাধ্যতামূলক করা এবং বিশেষ করে বড় অর্ডারের ক্ষেত্রে কাস্টমার কেয়ার থেকে সরাসরি ফোনে যোগাযোগ করে অর্ডার নিশ্চিত করা উচিত। সুরক্ষিত পেমেন্ট গেটওয়ে এবং আধুনিক ফ্রড ডিটেকশন সরঞ্জাম বা হাতিয়া ব্যবহার করা যেতে পারে, যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সন্দেহজনক বা একই আইপি থেকে বারবার আসা লেনদেন শনাক্ত করতে পারে। রিটার্ন পলিসি সুনির্দিষ্ট এবং স্পষ্ট হওয়া উচিত। ফেরত নেওয়া পণ্যের গুণগত মান পরীক্ষা করার জন্য কঠোর প্রক্রিয়া অনুসরণ করা এবং কুরিয়ারের সামনে পণ্য ফেরতের সময় ভিডিও রেকর্ড বা ছবি তুলে রাখা দরকার।
সম্পূর্ণ ভুয়া অর্ডার এড়াতে সিওডি অর্ডারের ক্ষেত্রে ন্যূনতম ডেলিভারি চার্জটি অগ্রিম নেওয়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। অপরিচিত, দুর্গম বা পূর্বের খারাপ ট্র্যাক রেকর্ড থাকা গ্রাহকদের ক্ষেত্রে সিওডি সুবিধা সীমিত করা বা মূল্যবান পণ্যের ক্ষেত্রে সিওডি অপশন না রাখাই ভালো। কুরিয়ার বা লজিস্টিকস পার্টনারদের সতর্ক করে দেওয়া যাতে তারা সন্দেহজনক অর্ডার বা ডেটা লিকের বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ নেয়। আগের প্রতারণার ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করে অপরাধীদের একটি নিজস্ব ডেটাবেজ বা ব্ল্যাকলিস্ট তৈরি করা এবং বড় ধরণের প্রতারণার শিকার হলে দ্রুত আইন প্রয়োগকারী সংস্থা বা সাইবার ক্রাইম ইউনিটের কাছে অভিযোগ দায়ের করা উচিত।
সামষ্টিক অর্থনীতিতে ধাক্কা : দ্বিমুখী প্রতারণার আর্থিক ক্ষতি
ই-কমার্সের এই দ্বিপাক্ষিক প্রতারণা কেবল ক্রেতা-বিক্রেতার ব্যক্তিগত ক্ষতির কারণ নয়, এটি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি ও উদীয়মান এই ডিজিটাল বাজারের প্রবৃদ্ধির গতি শ্লথ করে দিচ্ছে।
বাংলাদেশের ই-কমার্স ও এফ-কমার্স খাতে দৈনিক গড়ে ১০% থেকে ১৫% পর্যন্ত অর্ডার 'রিটার্ন' বা বাতিল হয়, যার একটি বড় অংশই অনিচ্ছাকৃত বা ভুয়া অর্ডার। লজিস্টিকস খাতের হিসাব অনুযায়ী, প্রতিটি সফল ডেলিভারির বিপরীতে একটি ব্যর্থ বা রিটার্ন অর্ডারে উদ্যোক্তাদের দ্বিগুণ কুরিয়ার চার্জ এবং প্যাকেজিং খরচ বহন করতে হয়। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের মোট পরিচালন ব্যয়ের প্রায় ১৮% থেকে ২২% পর্যন্ত অপচয় হয় শুধুমাত্র এই ভুয়া অর্ডার এবং রিটার্ন ব্যবস্থাপনায়, যা অনেক সম্ভাবনাময় স্টার্টআপকে অঙ্কুরেই ধ্বংস করছে।
আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা জুনিপার রিসার্চ-এর তথ্যমতে, বিশ্বব্যাপী ই-কমার্সে পেমেন্ট জালিয়াতি ও চার্জব্যাক জালিয়াতির কারণে প্রতি বছর প্রায় ৫০ বিলিয়ন ডলারের বেশি ক্ষতি হয়। বাংলাদেশেও ক্যাশলেস বা ডিজিটাল পেমেন্ট বাড়ার সাথে সাথে ক্রেডিট বা ডেবিট কার্ড ও মোবাইল ব্যাংকিং ক্লোনিং এবং রিফান্ড পলিসির জটিলতায় প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার ট্রানজেকশন আইনি গ্যাঁড়াকলে আটকে থাকছে।
আস্থার সংকটের কারণে বাংলাদেশের প্রায় ৮০% থেকে ৮৫% অনলাইন কেনাকাটা এখনও 'ক্যাশ অন ডেলিভারি'র ওপর নির্ভরশীল। এর ফলে বাজারে কাগজের নোটের ওপর চাপ বাড়ছে এবং খাতের ডিজিটাল স্কেলাবিলিটি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। দেশী-বিদেশী বড় বিনিয়োগকারীরা যখন দেখেন কোনো বাজারে ফ্রড বা জালিয়াতির হার বেশি এবং আইনগত সুরক্ষা দুর্বল, তখন তারা বিনিয়োগ থেকে পিছিয়ে যান। ফলে ট্রিলিয়ন ডলারের ডিজিটাল অর্থনীতিতে রূপান্তরের পথ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
চোখের আড়ালে থাকা প্রাতিষ্ঠানিক ও মনস্তাত্ত্বিক সংকট
ই-কমার্সের জালিয়াতি এখন আর কেবল 'টাকা নিলাম পণ্য দিলাম না' এর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি এখন মনস্তাত্ত্বিক, লজিস্টিকস এবং প্রাতিষ্ঠানিক এক জটিল জালে রূপ নিয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম দুটি বড় সংকট হলো:
১. *পেমেন্ট গেটওয়ের রিফান্ড পলিসির দীর্ঘসূত্রতা:* গ্রাহক যখন কোনো কারণে অর্ডার বাতিল করেন বা রিফান্ড চান, তখন ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান থেকে টাকা ছাড় দিলেও ব্যাংকিং চ্যানেল বা পেমেন্ট গেটওয়ের জটিলতার কারণে গ্রাহকের অ্যাকাউন্টে টাকা পৌঁছাতে ১০ থেকে ১৫ দিন বা তার বেশি সময় লেগে যায়। এই প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়হীনতার কারণে গ্রাহক ভাবেন ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান তার টাকা আটকে রেখেছে এবং তারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নেতিবাচক প্রচারণা শুরু করেন, যা সৎ উদ্যোক্তাদের ইমেজ সংকটে ফেলছে।
২. *ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের মানসিক স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিগ্রহ:* বাজারে গ্রাহকের আর্থিক ক্ষতি নিয়ে অনেক কলাম লেখা হলেও, একজন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা যখন বারবার ভুয়া অর্ডার বা রিটার্নের কারণে পুঁজি হারিয়ে দেউলিয়া হয়ে যান, তার মানসিক অবস্থা নিয়ে কেউ কথা বলে না। অনেকেই পারিবারিক ও সামাজিকভাবে তীব্র অবমাননার শিকার হন এবং লোকলজ্জার ভয়ে ব্যবসা বন্ধ করে দেন। এই উদ্যোক্তা সুরক্ষার বিষয়টি নীতিমালায় সম্পূর্ণ অনুপস্থিত।
উত্তরণের পথ : ডিসিআরএএফ (DCRAF)-এর নীতিগত সুপারিশ
বাংলাদেশের ই-কমার্স খাতকে একটি টেকসই এবং সমৃদ্ধিশালী অর্থনীতিতে রূপান্তর করতে হলে ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যকার এই আস্থার দেয়ালটি ভাঙতেই হবে। প্রতারকদের কোনো দল বা পক্ষ নেই—তারা কখনো ভুয়া বিক্রেতার বেশে সাধারণ গ্রাহককে ঠকাচ্ছে, আবার কখনো ভুয়া ক্রেতার বেশে সৎ ও কঠোর পরিশ্রমী উদ্যোক্তাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এই দ্বিমুখী সংকট দূরীকরণে *ডিজিটাল কমার্স রিসার্চ অ্যান্ড অ্যাডভোকাসি ফোরাম (DCRAF)*-এর পক্ষ থেকে নিচের নীতিগত পদক্ষেপগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের সুপারিশ করা হচ্ছে:
এফ-কমার্স বনাম প্রাতিষ্ঠানিক ই-কমার্স বিভাজন স্পষ্টকরণ: শুধুমাত্র ফেসবুক পেজ ভিত্তিক ব্যবসা এবং সুনির্দিষ্ট ডোমেইন-ওয়েবসাইট থাকা প্রাতিষ্ঠানিক ই-কমার্সের জবাবদিহিতায় কিছুটা ভিন্নতা আনা প্রয়োজন। ক্ষুদ্র এফ-কমার্স উদ্যোক্তাদের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে সহজ শর্তে ট্রেড লাইসেন্স ও ব্যাংকিং সুবিধা প্রদান করা উচিত, যাতে তারা মূলধারায় এসে সততার সাথে ব্যবসা করতে পারেন।
* *উদ্যোক্তাদের জন্য 'রিটার্ন প্রোটেকশন ফান্ড' বা বিমা: * লজিস্টিকস খরচ বা ভুয়া অর্ডারের কারণে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা যেন পুঁজি না হারান, সেজন্য কুরিয়ার কোম্পানি, ই-ক্যাব এবং ডিসিআরএএফ (DCRAF)-এর যৌথ উদ্যোগে একটি বিমা বা ক্ষতিপূরণ নীতিমালা প্রণয়ন করা যেতে পারে।
* *নিয়মিত সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন: * সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে এআই-চালিত জালিয়াতি, ডার্ক প্যাটার্নস এবং ফিশিং লিংক চেনার উপায় নিয়ে দেশব্যাপী ডিজিটাল লিটারেসি বা সচেতনতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।
গ্রাহকের সচেতনতা, উদ্যোক্তাদের প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা জোরদার, লজিস্টিকস খাতের স্বচ্ছতা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার কঠোর আইন প্রয়োগের মাধ্যমেই কেবল বাংলাদেশে একটি নিরাপদ, স্বচ্ছ এবং বৈশ্বিক মানের ডিজিটাল কমার্স ইকোসিস্টেম গড়ে তোলা সম্ভব।
Comments