দুর্বল ব্যাংকিং ব্যবস্থার গভীর ক্ষত
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর সম্প্রতি বলেছেন, দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে স্থিতিশীল করাই এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান লক্ষ্য। তাঁর আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য ছিল-দেশের ব্যাংকিং খাত থেকে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ অর্থ বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে বেরিয়ে গেছে। এই বক্তব্য শুধু উদ্বেগজনক নয়, বরং দেশের আর্থিক খাতের প্রকৃত চিত্রের একটি কঠিন বাস্তবতাও তুলে ধরে।
এমন এক সময়ে এই মন্তব্য এসেছে, যখন সরকার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট ঘাটতি পূরণে ব্যাংক খাত থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে। অর্থাৎ মোট বাজেট ঘাটতির প্রায় ৪৬ শতাংশ অর্থ আসবে ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে। কিন্তু প্রশ্ন হলো-যে ব্যাংক খাত নিজেই গভীর সংকটে নিমজ্জিত, সেই খাত কতটা কার্যকরভাবে সরকারের অর্থায়নের দায়িত্ব পালন করতে পারবে?
সরকারি হিসাব অনুযায়ী দেশের খেলাপি ঋণের পরিমাণ এখন ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩৫ শতাংশেরও বেশি। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক পর্যায়। একটি ব্যাংকের মূল কাজ হলো জনগণের আমানত সংগ্রহ করে তা উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ করা। কিন্তু যখন বিপুল পরিমাণ ঋণ ফেরত আসে না, তখন ব্যাংকের তারল্য, মুনাফা ও স্থিতিশীলতা-সবকিছুই হুমকির মুখে পড়ে।
পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে যখন দেখা যায়, ব্যাংকগুলোর মূলধন পর্যাপ্ততার হার ঋণাত্মক ২.৬৪ শতাংশে নেমে এসেছে। অর্থাৎ অনেক ব্যাংকের সম্পদের চেয়ে দায় বেশি হয়ে গেছে। দুর্বল ব্যাংকগুলোকে টিকিয়ে রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে বারবার সহায়তা দিতে হচ্ছে। একদিকে কয়েক দফায় হাজার হাজার কোটি টাকার তারল্য সহায়তা,অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় অর্থে পুনঃমূলধনীকরণ-সব মিলিয়ে ব্যাংক খাত এখন কার্যত সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
বিশেষ করে রাষ্ট্রায়াত্ত ও কিছু বেসরকারি ব্যাংকে দীর্ঘদিন ধরে দুর্বল সুশাসন, রাজনৈতিক প্রভাব এবং অনিয়মিত ঋণ বিতরণের সংস্কৃতি এই সংকটকে আরও তীব্র করেছে। যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়া ঋণ অনুমোদন,একই ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর কাছে অতিরিক্ত ঋণ কেন্দ্রীভূত হওয়া এবং প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ার কারণে খেলাপি ঋণ ক্রমাগত বেড়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ঋণ পুনঃতফসিলের অপব্যবহার, যার মাধ্যমে প্রকৃত সমস্যাকে অনেক সময় আড়াল করা হয়েছে।
সংস্কার ছাড়া উত্তরণের পথ নেই
ব্যাংক খাতের এই সংকট কেবল ব্যাংকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি পুরো অর্থনীতির জন্য একটি বড় ঝুঁকি। এর সবচেয়ে স্পষ্ট প্রভাব দেখা যাচ্ছে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহে। বর্তমানে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে মাত্র ৪.৭৫ শতাংশে, যা দেশের ইতিহাসে সর্বনিম্ন। জিডিপির তুলনায় বেসরকারি ঋণের অনুপাতও গত এক যুগের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে।
এর অর্থ হলো ব্যবসা ও শিল্প খাতে নতুন বিনিয়োগ কমছে, উদ্যোক্তারা প্রয়োজনীয় অর্থায়ন পাচ্ছেন না এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি শ্লথ হয়ে পড়ছে। অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে যে বেসরকারি বিনিয়োগের প্রয়োজন, তা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে ব্যাংক খাতের দুর্বলতার কারণে।
অন্যদিকে, ব্যাংকগুলোর প্রতি আমানতকারীদের আস্থাও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। কোনো ব্যাংককে কেন্দ্র করে সংকট বা অনিয়মের খবর প্রকাশিত হলে গ্রাহকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়। সাম্প্রতিক সময়ে ইসলামী ব্যাংককে ঘিরে যে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে,তা প্রমাণ করে যে আস্থার সংকট কত দ্রুত পুরো খাতে ছড়িয়ে পড়তে পারে। ব্যাংকিং ব্যবস্থার মূল ভিত্তিই হলো জনগণের বিশ্বাস। সেই বিশ্বাস ক্ষতিগ্রস্ত হলে আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
এই সংকটের পেছনে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো অর্থ পাচার ও ঋণ জালিয়াতি। ভুয়া প্রতিষ্ঠান, নামসর্বস্ব কোম্পানি বা জাল কাগজপত্রের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ ঋণ নিয়ে বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগ বহু বছর ধরে আলোচিত। এসব ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা না নেওয়ার ফলে জবাবদিহিতার সংস্কৃতি দুর্বল হয়েছে।
বাংলাদেশের ব্যাংক খাতকে স্থিতিশীল করতে হলে সাময়িক সহায়তা বা পুনঃমূলধনীকরণের বাইরে গিয়ে কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন। প্রথমত, খেলাপি ঋণ আদায়ে কঠোর ও নিরপেক্ষ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনায় পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত,কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি ক্ষমতা আরও শক্তিশালী ও স্বাধীন করতে হবে,যাতে রাজনৈতিক বা অন্য কোনো প্রভাব ছাড়াই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া যায়। পাশাপাশি অর্থ পাচার, ঋণ জালিয়াতি ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার ও কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশের অর্থনীতি আজ এমন এক পর্যায়ে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে একটি শক্তিশালী ও স্থিতিশীল ব্যাংকিং ব্যবস্থা ছাড়া টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব নয়। তাই ব্যাংক খাতের সংকটকে শুধুমাত্র আর্থিক খাতের সমস্যা হিসেবে না দেখে জাতীয় অর্থনৈতিক নিরাপত্তার প্রশ্ন হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। সময়মতো কার্যকর সংস্কার না হলে এই নীরব সংকট ভবিষ্যতে আরও বড় অর্থনৈতিক ঝুঁকিতে পরিণত হতে পারে।
Comments