৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার রেকর্ড বাজেট আসছে বৃহষ্পতিবার
ফেব্রুয়ারিতে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসা বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার দেশের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ বাজেট ঘোষণা করতে যাচ্ছে। উচ্চাভিলাষী রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য এবং বৈদেশিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল একটি বড় পরিকল্পনার ভিত্তিতে এই বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে।
আগামীকাল অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী তাঁর প্রথম বাজেট উপস্থাপন করবেন। বাজেটের প্রতিপাদ্য হবে "অর্থনৈতিক গণতন্ত্রীকরণ ও বিকেন্দ্রীকরণ: ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির পথে বাংলাদেশ"। দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বাজেটের আকার ৯ লাখ কোটি টাকা অতিক্রম করবে। যদিও অর্থমন্ত্রী বাজেট নিয়ে আলোচনায় নির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান উল্লেখ করেননি,তবে তিনি বলেছেন,অর্থনীতির পুনরুদ্ধার নিশ্চিত করতে আগামী বাজেট হবে বেশ বড় আকারের।
অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করার লক্ষ্য
বাজেটের তিনটি প্রধান লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে-অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার করা,সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়ন, কর্মসংস্থান বাড়াতে উচ্চ প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরে যাওয়া।
গত তিন বছর ধরে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ধারাবাহিকভাবে কমেছে। গত অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৪ শতাংশের নিচে নেমে যায়, যা ২০১৯-২০ অর্থবছরে করোনাভাইরাস মহামারির পর প্রথমবারের মতো ঘটে। উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোর পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরেও প্রবৃদ্ধি ৪ শতাংশের নিচেই থাকতে পারে। অন্যদিকে, ২০২৩ সাল থেকে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে অবস্থান করছে। আগামী অর্থবছরে সরকার ৬.৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি এবং ৭.৫ শতাংশ মূল্যস্ফীতি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করতে পারে।
রাজস্ব আদায়ে বড় চ্যালেঞ্জ
এই লক্ষ্য অর্জনে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হবে,যার প্রায় ৯০ শতাংশই জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)-কে সংগ্রহ করতে হবে। গত অর্থবছরে এনবিআর সংগ্রহ করেছিল ৩ লাখ ৬৯ হাজার ৫২৮ কোটি টাকা। বর্তমান প্রবণতা অনুযায়ী,চলতি বছরে তা প্রায় ৪ লাখ কোটি টাকা হতে পারে বলে কর্মকর্তারা মনে করছেন। অর্থাৎ,আগামী অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে হলে রাজস্ব আদায় আরও ২ লাখ কোটি টাকা বাড়াতে হবে,যা অর্থমন্ত্রীর জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বৈদেশিক সহায়তার ওপর নির্ভরতা
রাজস্বের পাশাপাশি বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকার প্রায় ১১ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক সহায়তা পাওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এর মধ্যে প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার বাজেট সহায়তা থাকবে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো,এই হিসাবের মধ্যে আইএমএফের কোনো ঋণ ধরা হয়নি। চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে ৪ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক সহায়তা ব্যবহার করা হয়েছে। জুনের মধ্যে বাজেট সহায়তাসহ মোট ব্যবহার ৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। তাই বিদেশি অর্থায়নে পরিচালিত প্রকল্প বাস্তবায়নের বাধা দূর করা এবং সংস্কারের মাধ্যমে বাজেট সহায়তা নিশ্চিত করা সরকারের জন্য আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হবে।
বাজেট ঘাটতি ও ব্যয়
আগামী অর্থবছরে বাজেট ঘাটতি ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা,যা জিডিপির ৩.৫৫ শতাংশ,নির্ধারণ করা হতে পারে। এটি আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য ৫ শতাংশ সীমার নিচে। আগামী অর্থবছরের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় ১৯ শতাংশ বেশি। সরকার নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে সরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে চায়। ইতোমধ্যে ৩ লাখ কোটি টাকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) অনুমোদন করা হয়েছে,যা চলতি বছরের তুলনায় ৫০ শতাংশ বেশি। তবে বাস্তবায় বায়ন সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে অর্থনীতিবিদ-দের মধ্যে।
নতুন বেতন কাঠামো ও সুদের চাপ
৬ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার পরিচালন বাজেটের মধ্যে প্রায় ৪ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে ঋণের সুদ পরিশোধে,নতুন বেতন কাঠামোর আংশিক বাস্তবায়নে,ভর্তুকি প্রদানে। আগামী অর্থবছর থেকে পে কমিশনের সুপারিশ আংশিক বাস্তবায়ন শুরু হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, তিন বছরে এটি সম্পূর্ণ কার্যকর হবে এবং প্রথম ধাপে মৌলিক বেতনের ৫০ শতাংশ কার্যকর করা হবে। এর ফলে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন, ভাতা ও পেনশনের জন্য অতিরিক্ত ৩৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করা হবে। এই খাতে মোট বরাদ্দ দাঁড়াবে ১ লাখ ৬৬ হাজার কোটি টাকা। ভর্তুকি ও প্রণোদনার জন্য বরাদ্দ হতে পারে ১ লাখ ২৬ হাজার ১২৫ কোটি টাকা,আর সুদ পরিশোধে ১ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বড় বরাদ্দ
সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। সেই অনুযায়ী- শিক্ষা সংশ্লিষ্ট তিনটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগে ১ লাখ কোটি টাকার বেশি বরাদ্দ এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট দুটি বিভাগে ৬০ হাজার কোটি টাকার বেশি বরাদ্দ দেওয়া হবে। তবে এই দুই খাতে বরাদ্দের চেয়ে কার্যকর বাস্তবায়নই বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সৃজনশীল অর্থনীতি নামে নতুন উদ্যোগ
এই বাজেটে অর্থমন্ত্রী "সৃজনশীল অর্থনীতি" নামে একটি নতুন উদ্যোগ ঘোষণা করবেন। এর জন্য ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে,যার মধ্যে-সরকার দেবে ২০০ কোটি টাকা,বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের সিএসআর তহবিল থেকে দেবে ৩০০ কোটি টাকা। বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী সৃজনশীল অর্থনীতির সম্ভাবনা তুলে ধরবেন এবং এর একটি কাঠামো উপস্থাপন করবেন।
সৃজনশীল অর্থনীতির আওতায় থাকবে-চলচ্চিত্র, নৃত্য, সংগীত, নাটক, প্রকাশনা, বিজ্ঞাপন স্থাপত্য, চারুকলা,হস্তশিল্প, ডিজাইন, সফটওয়্যার, ভিডিও গেমসসহ বিভিন্ন সৃজনশীল শিল্পখাত। এই খাতকে ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের নতুন চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করছে সরকার।
Comments