রোহিঙ্গাদের এনআইডি-পাসপোর্ট পাওয়া ঠেকাতে সরকারের উদ্যোগ
মিথ্যা তথ্য ও জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশি জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) এবং পাসপোর্ট হাতিয়ে নেওয়া ঠেকাতে কঠোর অবস্থান নিয়েছে সরকার। মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া ১২ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গার বায়োমেট্রিক তথ্য ও ডেটাবেজ এবার যুক্ত হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ সরকারের নিজস্ব সার্ভারে।
বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল (বিসিসি) ইতিমধ্যেই এই বিশেষ সার্ভার তৈরির কাজ সম্পন্ন করেছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ শেষে দ্রুতই এটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে হস্তান্তর করা হবে। এর পরপরই জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) তাদের কাছে থাকা রোহিঙ্গাদের সমস্ত ডেটা এই সার্ভারে পাঠানো শুরু করবে। এতদিন বাংলাদেশ সরকারের কাছে এই ডেটাবেজের কেবল 'রিড অনলি অ্যাকসেস' বা শুধু দেখার অনুমতি ছিল।
বহু বছর ধরে সুরক্ষার অজুহাতে ইউএনএইচসিআর এই তথ্য হস্তান্তরে অস্বীকৃতি জানালেও, বর্তমান সরকারের নানামুখী তৎপরতা ও যৌক্তিক দাবির মুখে অবশেষে তারা এই তথ্য দিতে রাজি হয়েছে।
একটি অসাধু চক্রের সহায়তায় অনেক রোহিঙ্গা বাংলাদেশি এনআইডি ও পাসপোর্ট তৈরি করে বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছে, যা দেশের ভাবমূর্তির জন্য বড় সংকট তৈরি করছে। অতি সম্প্রতি পুলিশের একটি সংস্থার অনুসন্ধানে ১৭১ জন রোহিঙ্গার সন্ধান মিলেছে, যারা ভুয়া নাম-পরিচয় ব্যবহার করে বাংলাদেশি পাসপোর্ট তৈরি করেছে। ইতিমধ্যেই তাদের পাসপোর্ট বাতিলের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
ভবিষ্যতে এই জালিয়াতি চিরতরে বন্ধ করতে জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) কর্তৃপক্ষ এবং শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশন (আরআরআরসি) যৌথভাবে কাজ করছে। 'এপিআই' প্রযুক্তির মাধ্যমে এনআইডির মূল সার্ভারের সঙ্গে রোহিঙ্গাদের এই ডেটাবেজ যুক্ত করা হবে। এর ফলে কোনো রোহিঙ্গা যদি নিজের পরিচয় লুকিয়ে বাংলাদেশি এনআইডি বা পাসপোর্ট করতে যায়, তবে আঙুলের ছাপ (ফিঙ্গারপ্রিন্ট) বা চোখের স্ক্যান ম্যাচ করার সাথে সাথেই সার্ভার স্বয়ংক্রিয়ভাবে তাকে 'রোহিঙ্গা' হিসেবে চিহ্নিত করে দেবে।
বর্তমানে কক্সবাজারের বিভিন্ন ক্যাম্পে ১২ লাখের বেশি নিবন্ধিত রোহিঙ্গা রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৫ লাখ রোহিঙ্গা অবৈধ উপায়ে বাংলাদেশি সিমকার্ড ব্যবহার করছে বলে তথ্য রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এই অবৈধ সিম ব্যবহারের কারণে ক্যাম্পগুলোতে মাদক চোরাচালান, অর্থ পাচার ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মতো অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ছিল।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান জানিয়েছেন, রোহিঙ্গাদের তথ্য সরকারি সার্ভারে আসার পরপরই ক্যাম্পে থাকা সব অবৈধ সিম ব্লক বা বন্ধ করে দেওয়া হবে। এরপর ইউএনএইচসিআর-এর দেওয়া নিবন্ধন নম্বর বা 'প্রগ্রেস আইডি'র বিপরীতে ১৮ বছরের ঊর্ধ্বে থাকা সব রোহিঙ্গাকে বিটিআরসি-এর মাধ্যমে বৈধ ও নজরদারিযোগ্য বাংলাদেশি সিমকার্ড দেওয়া হবে। ইতিমধ্যেই পাইলট প্রজেক্ট হিসেবে প্রায় ১০ হাজার সিম বিতরণ করা হয়েছে।
তদন্তে দেখা গেছে, স্থানীয় কিছু জনপ্রতিনিধি, পাসপোর্ট অফিসের কর্মচারী, পুলিশ ও দালালদের সমন্বয়ে গঠিত একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট রোহিঙ্গাদের পাসপোর্ট তৈরিতে সাহায্য করছে।
ভুয়া তথ্যে পাসপোর্ট নেওয়া কয়েকজন রোহিঙ্গার উদাহরণ: আবদুর রহমান নিজের নাম 'সালমান আহমেদ' এবং চট্টগ্রামের পটিয়ার ঠিকানা ব্যবহার করে পাসপোর্ট তৈরি করেন। আহমদ উল্লাহ কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের ঠিকানা ব্যবহার করে পার্সপোর্ট পান। রোকেয়া বেগম ফেনীর দাগনভূঞার ভুয়া ঠিকানা ও মা-বাবার নাম ব্যবহার করে পার্সপোর্ট নেন। মরজান নোয়াখালী থেকে ভুয়া তথ্যে পাসপোর্ট সংগ্রহ করেন। এছাড়া শামসুল আলম, ইকবাল চৌধুরী, সরওয়ার আলম, আবদুল্লাহ ও জমিলার মতো একাধিক রোহিঙ্গা চট্টগ্রামের বিভিন্ন ভুয়া ঠিকানায় পাসপোর্ট তৈরি করেছে।
ক্যাম্পের বাইরে রোহিঙ্গাদের চলাচল কঠোরভাবে সীমিত করতে হবে। পাশাপাশি যেসব অসাধু স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, পুলিশ বা পাসপোর্ট কর্মকর্তা এই জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত, তাদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা জরুরি।
বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের নির্বাহী পরিচালক এ টি এম জিয়াউল ইসলাম নিশ্চিত করেছেন যে, সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করেই এই সার্ভার তৈরি করা হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এটি বুঝে নেওয়ার পর ডেটা ট্রান্সফার শুরু হলে এনআইডি জালিয়াতি সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণে আসবে।
Comments