রপ্তানি প্রণোদনায় উৎসে কর কমে হচ্ছে ৫ শতাংশ
বিনিয়োগ ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরির লক্ষ্যে আসন্ন বাজেটে রাজস্ব ও ভ্যাট-সংক্রান্ত একগুচ্ছ সংস্কার প্রস্তাব আনতে যাচ্ছে সরকার। তাতে রপ্তানি প্রণোদনার ওপর বিদ্যমান উৎসে কর ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা। যদিও রপ্তানিকারকরা দীর্ঘদিন ধরেই এ কর পুরোপুরি প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে আসছেন। কারণ, দেশের রপ্তানিকারকরা বিশেষ করে মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৫ শতাংশ অবদান রাখা তৈরি পোশাক খাত-রপ্তানি কমে যাওয়া এবং উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির চাপের মধ্যে রয়েছে।
ব্যবসা সহজীকরণ, প্রশাসনিক জটিলতা কমানো এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানোর লক্ষ্যেই নেওয়া হচ্ছে এসব উদ্যোগ।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পাট রপ্তানি খাতসহ বিভিন্ন খাতে রপ্তানি প্রণোদনার জন্য সরকার ৯ হাজার ২৫ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে।
বর্তমানে তৈরি পোশাক খাতসহ প্রায় ৪৩টি রপ্তানি খাত এই প্রণোদনার আওতায় রয়েছে। এসব খাতে প্রণোদনার হার শূন্য দশমিক ৩০ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত।
সব ধরনের পোশাক রপ্তানিতে শূন্য দশমিক ৩০ শতাংশ প্রণোদনা দেওয়া হয়। আর স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত সুতা ব্যবহার করে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে ১ দশমিক ৫ শতাংশ প্রণোদনা মেলে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি রপ্তানিকারকরা পান ২ শতাংশ এবং অপ্রচলিত বাজারে রপ্তানির ক্ষেত্রে দেওয়া হয় ৩ শতাংশ প্রণোদনা।
চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানিকারকরা ৬ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত প্রণোদনা পান। আর পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানিতে প্রণোদনার হার ৩ থেকে ১০ শতাংশ।
এ ছাড়া বর্তমানে ব্যবসায়ীদের জন্য প্রতি মাসে ভ্যাট রিটার্ন জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকলেও নতুন প্রস্তাবে তা তিন মাস অন্তর জমা দেওয়ার সুযোগ রাখা হচ্ছে। প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে বছরে ১২টির পরিবর্তে চারবার রিটার্ন দাখিল করতে হবে, যা ব্যবসায়ীদের জন্য উল্লেখযোগ্য স্বস্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এ বিষয়ে এসএমএসি অ্যাডভাইজরি সার্ভিসেসের পরিচালক স্নেহাশীষ বড়ুয়া বলেন, 'এতে প্রশাসনিক চাপ কমবে এবং হিসাব ব্যবস্থাপনা সহজ হবে। তিন মাসের লেনদেন একসঙ্গে হিসাব করে ইনপুট ও আউটপুট ভ্যাট সমন্বয় করা আরও কার্যকর হবে।'
একই সঙ্গে মাসিক রিটার্নের চাপ না থাকায় নগদ প্রবাহ ব্যবস্থাপনায়ও উন্নতি ঘটবে, ফলে ব্যবসায় পুনর্বিনিয়োগের সুযোগ বাড়বে বলেও মনে করেন তিনি।
এনবিআরের কর্মকর্তারা বলেন, ফাইলিংয়ের সংখ্যা কম হওয়ায় ভুল বা বিলম্বের ঝুঁকিও কমবে, ফলে জরিমানা ও সুদের চাপ হ্রাস পাবে। ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য এটি বিশেষভাবে সুবিধাজনক হবে, কারণ সীমিত জনবল দিয়েই কর-সম্মতি নিশ্চিত করা সহজ হবে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব হচ্ছে, কোনো প্রতিষ্ঠান যদি ইআরপি (এন্টারপ্রাইজ রিসোর্স প্ল্যানিং) সফটওয়্যারে ক্রয়-বিক্রয়সহ প্রয়োজনীয় নথিপত্র সংরক্ষণ করে, তাহলে আলাদাভাবে হার্ড কপি সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক থাকবে না। এতে ডিজিটাল ব্যবস্থাপনার প্রসার ঘটবে এবং ব্যবসা পরিচালনা আরও সহজ হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ ছাড়া বর্তমানে ব্যবসায়ীদের মূল্য ঘোষণা করে পণ্য বিক্রয় করতে হয়, যা অত্যন্ত জটিল। এ কারণে মূল্য ঘোষণা প্রক্রিয়া সহজ করার প্রভিশন আগামী বাজেটে যুক্ত করা হচ্ছে বলেও জানা গেছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বিনিয়োগ বর্তমানে অন্যতম বড় উদ্বেগের বিষয়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) চূড়ান্ত হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জিডিপির তুলনায় বিনিয়োগের হার নেমে এসেছে ২৮ দশমিক ৫৪ শতাংশে।
তবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে এ হার বাড়িয়ে ৩১ দশমিক ৪ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করতে যাচ্ছে সরকার।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় বিনিয়োগে এমন বড় ধরনের উল্লম্ফন অর্জন করা সহজ হবে না। তাদের মতে, প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, আর্থিক খাতের সংস্কার এবং বেসরকারি বিনিয়োগ পুনরুদ্ধার— সবকিছুই এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে স্থিতিশীল অর্থনীতি, নীতিগত ধারাবাহিকতা এবং সহজ ব্যবসা পরিবেশ নিশ্চিত করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, শুধু উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ নয়, বরং বাস্তবভিত্তিক সংস্কার এবং প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও সরলীকরণই আগামী দিনে বিনিয়োগ বৃদ্ধির মূল চাবিকাঠি হতে পারে।
Comments