হাদি হত্যাকাণ্ড নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের মমতা কি ইঙ্গিত দিলেন? হাদির ভাই কেন এমনটা বলছেন?
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনীতিতে ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শহিদ শরিফ ওসমান বিন হাদির আগমন এবং তার হত্যাকাণ্ড এক বিস্ময়কর বিষয়। তরুণ এই রাজনৈতিক কর্মী ২০২৪ এর পর দ্রুতই রাজনৈতিক ও সামাজিক স্তরে সক্রিয়ভাবে দৃশ্যমান হয়ে উঠেন। তার আলোচনায়, কথা বার্তায়, চাল চলনে নতুনত্ব ছিল, এক প্রকার ক্ষিপ্রতা ছিল,ভিন্ন ধরনের ভাষা প্রয়োগ ছিল। খুব দ্রুত তিনি তরুণ সমাজের একাংশের কাছে প্রিয় নাম হয়ে উঠেন।
২০২৪ এর ৫ আগস্টের পরে ওসমান বিন হাদী নামটি জনসমক্ষে আসে এবং দ্রুত তার একটি প্রভাবশালী অবস্থান তৈরি হয়। তিনি দৃশ্যত কোনো প্রতিষ্ঠিত পেশা বা রাজনৈতিক পদ ছাড়াই দ্রুত সংগঠন ও নেটওয়ার্ক তৈরি করেন। অল্প সময়ের মধ্যে এত সক্রিয়তা ইঙ্গিত দেয় যে, তার চারপাশে একটি বড় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কার্যক্রম ছিল।
রাজনৈতিক বাস্তবতায় হঠাৎ উত্থানশীল অ্যাক্টিভিস্ট নতুন কিছু নয়। রাজনৈতিক অস্থির সময়গুলোতে এমন চরিত্র তৈরি হয়, যারা মূলধারার রাজনীতির বাইরে থেকে প্রভাব বিস্তার করে। কিন্তু তার প্রভাব বাড়তে থাকার মধ্যেই তিনি খুন হন। হত্যাকারী হিসেবে অভিযুক্ত কয়েকজন পশ্চিমবঙ্গে গ্রেফতার করা হয়েছে। বলা হচ্ছে গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিরা নাকি হাদীর সঙ্গেই কাজ করত।
সামাজিক মাধ্যমে নানা প্রকার অভিমত আছে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এই হত্যাকাণ্ড ঝড় তুলে, তার জানাজা হয় সংসদ অ্যাভিনিউতে, যোগ দেন প্রধান উপদেষ্টাও।
পুরো বিষয়টি এখনও রহস্যময়। কেন একজন উদীয়মান তরুণকে এভাবে খুন করা হলো? তবে কি তার জনপ্রিয়তায় ঈর্ষান্বিত হয়ে কোন পক্ষ তাকে সরিয়ে দিয়েছে? কোন রাজনৈতিক সমীকরণের বলি তিনি? নাকি কোন কোন পক্ষের কোন প্রকল্প? তাকে তৈরি করা এবং তাকে বিনাশ করে তা নিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা নেওয়া?
হাদির বিষয়টি যখন ফোকাসের বাইরে তখন তার আবার প্রসঙ্গ ফিরে এলো প্রবলভাবে। তাও বাংলাদেশের সীমানার বাইরে থেকে। সম্প্রতি নির্বাচনে পরাজিত ভারতের পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল সভানেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শরীফ ওসমান হাদিকে ইঙ্গিত করে বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন। বাংলাদেশের একটি হত্যা মামলার আসামি ভারতের মেঘালয় দিয়ে পশ্চিমবঙ্গে প্রবেশের পর পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে। '
মমতা বলেছেন,'বাংলাদেশ থেকে এক বড় খুনিকে এসটিএফ গ্রেপ্তার করেছিল জেনে রাখুন, যা নিয়ে বাংলাদেশে অনেক "রেভোল্যুশন" হয়েছিল, মেঘালয় দিয়ে বাংলায় চলে আসে। আমাদের এসটিএফ তাকে ধরে। তারপর হোম মিনিস্টার নিজে আমাকে ফোন করে বলেছেন। এত দিন তো কই আমি বলিনি,মুখ খুলিনি। আজকে অত্যাচারের শেষ সীমায় গেছেন বলে। আমি এখনো নামটা বলছি না ভদ্রতা করে। বাংলাদেশের লোক উত্তাল হয়ে যাবে,আমি সেটা চাই না,আমি দেশকে ভালোবাসি…।'
তিনি অবশ্য সরাসরি নাম বলেন নি। তবে সবাই বুঝতে পারছে যে, তিনি হাদিকেই ইঙ্গিত করেছেন।
প্রশ্ন উঠেছে, মমতা বন্দোপাধ্যায়ের বক্তব্যকে কি নির্বাচনে হেরে যাওয়া মানুষের পাগলামি বলে উড়িয়ে দেওয়া হবে? নাকি বাংলাদেশ সরকার তদন্ত করে দেখবে, ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের আসলেই কোন ভূমিকা ছিল কিনা এ বিষয়ে?
এদিকে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া পরপর দুটি পোস্টকে কেন্দ্র করে নতুন করে আলোচনায় এসেছেন শহীদ শরীফ ওসমান বিন হাদির বড় ভাই ওমর বিন হাদি। তিনি এখন চুক্তিভিত্তিক কূটনৈতিক চাকরিতে লন্ডনের বাংলাদেশ হাই কমিশনে আছেন। পোস্ট দুটিতে অন্তর্বর্তী সরকার, বিএনপি এবং জামায়াতের কয়েকজন ব্যক্তির ভূমিকা নিয়ে মন্তব্য করার পর সামাজিক মাধ্যমে দেখা দিয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া।
মঙ্গলবার রাতে নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক পোস্টে ওমর হাদি দাবি করেন, 'শহিদ ওসমান হাদির হত্যার সঙ্গে ইন্টেরিম সরকারের কয়েকজন উপদেষ্টা এবং বিএনপি সরকারের কয়েকজন এমপি-মন্ত্রী সরাসরি জড়িত।' পরে আরেকটি পোস্টে তিনি দাবি করেন, 'শহিদ ওসমান হাদি হত্যার পটভূমি তৈরিতে জড়িত ছিলেন আমিরে জামায়াতের একজন পিএস। হাদিকে ঢাকা-৮ থেকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য আমাদের ওপর ব্যাপক চাপ দেওয়া হয়েছিল।'
পরপর দেওয়া এই দুই পোস্ট সামাজিক মাধ্যমে জন্ম দিয়েছে ব্যাপক আলোচনার। বিভিন্ন মহল থেকে এসব দাবির পক্ষে তথ্য-প্রমাণ প্রকাশের আহ্বান জানানো হয়েছে। কেউ কেউ মনে করছেন, বিষয়টি নিয়ে আরও তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। আবার অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই পোস্টগুলোর তাৎপর্য কী?
ওসমান হাদির হত্যার বিচার ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে রয়েছে নানা বিতর্ক। ওমর হাদির সাম্প্রতিক পোস্টগুলো সেই বিতর্ককে উসকে দিয়েছে আরও। ওসমান হাদীর ভাই হত্যার পরপরই তড়িঘড়ি করে ইউনূস সরকারের বিশেষ নিয়োগে একলাফে ট্রাভেল এজেন্সির কর্মচারী থেকে সরাসরি যুক্তরাজ্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ দেশে ডেপুটি হাইকমিশনারের মর্যাদায় সম্মানজনক ও লাভজনক পদে চলে গিয়েছিলেন।
প্রশ্ন উঠতে পারে ওসমান হাদীর ভাই কোন গোপন তথ্য জনগণের সামনে উন্মোচন না করার শর্তে এত সুযোগ সুবিধা পেয়েছিল? ইউনূস সরকার কাদেরকে রক্ষা করতে চাইছিল? কেন হামলার কয়েক মিনিটের মাঝে এক শ্রেণির ছাত্রনেতারা মির্জা আব্বাসকে দোষী করতে উঠেপড়ে লেগেছিল?
সবকিছু এখন সরকারের কোর্টে। অভিযুক্ত খুনিদের ভারত আগে গ্রেফতার করেছে। যদি বাংলাদেশ সরকারের কাছে হস্তান্তর না করে তাহলে এটি আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও কূটনৈতিক বিশ্বাসের প্রশ্ন উঠবে। আর করলে বোঝা যাবে, দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক হচ্ছে, যা বৈরিতায় পূর্ণ ছিল ড. ইউনুসের আমলে।
হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত সত্য বের করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি শুধু একটি হত্যার বিচার নয়-বরং একটি সময়ের রাজনৈতিক সংস্কৃতি উন্মোচন করতে পারে।
Comments